‘অনেকদিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা হল।’ তারক কাত হয়ে ঘাড় উঁচু করল, ‘আমি অনেকদিন খেলা ছেড়ে দিয়েছি শম্ভুদা।’
‘ভালোই করেছ। আমি ষোলো বছর বয়সে প্রথম খেলি ক্যালকাটার সঙ্গে, এখন আটান্ন। কী লাভ হল! বয়স থাকতে থাকতে যদি সংসারে মন দিতুম, তাহলে কী আজ এই অবস্থা হয়? ঠিকই করেছ।’
কালকের মতো আজ আর তারকের মরার ভয় হল না। শম্ভু সরকারকে প্রায় বারো বছর পর দেখে অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। লোকটা বহুবার তাকে অকথ্য গালাগালি করেছে। ক্লাবে নতুন ছেলে দেখলেই উপদেশ দিত। একটু ফুটফুটে হলেই বাড়িতে যেতে বলত। তাই নিয়ে হাসাহাসি হত আড়ালে। তবে লোকটা চমৎকার আউট সুইং করাত ওই বয়সেও, খেলা বুঝতও ভালো। শম্ভুদাই প্রথম বলে দেয়, তোমার ভুল গ্রিপিং আর ব্যাকলিফটের জন্যই শ্লিপে অত ক্যাচ ওঠে, শুধরে নাও।
‘আপনি কি ক্রিকেট খেলতেন?’
হাত থেকে ছুঁচটা টেনে বার করেই শম্ভু সরকারের ছেলে জানতে চাইল।
‘আমরা দুজনেই অরুণাচল ক্লাবে খেলতাম। সে আজ ষোলো-সতেরো বছর আগের কথা। দেখছি শম্ভুদার শরীর খুবই ভেঙে গেছে।’
‘অত নেশা করলে শরীরের আর দোষ কী।’
যুবকটিকে খুবই বিরক্ত মনে হল তারকের। এটা তার ভালো লাগল না। গম্ভীর হয়ে সে বলল, ‘ওর হাত দিয়ে অনেক ক্রিকেটার বেরিয়েছে।’
‘বেরোতে পারে।’ যুবকটি তালা হাতে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তারক ডাক্তারখানা থেকে বেরোবার সময় বলল, ‘আমি রঞ্জি ট্রফিও ফেলেছি। ওর কাছে খেলা শিখেছিলুম বলেই তো।’
‘আপনি বেঙ্গল প্লেয়ার!’
শম্ভু সরকারের ছেলে অবিশ্বাস ভরে তাকিয়ে আছে দেখে তারক অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। ও কেন, কেউই বিশ্বাস করবে না। চেহারা বা চলাফেরা অথবা বলার মধ্যে নিশ্চয় এমন একটা কিছু ফুটে ওঠে, যা দেখলে কারোর মনেই হয়না যে একদা সে হরিণের মতো ছুটত বাউন্ডারি লাইন ধরে, ক্যাচ ধরার জন্য ব্যাটসম্যানের পায়ের উপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত সিলি মিড-অন থেকে। পপিং ক্রিজ থেকে দু-গজ বেরিয়ে হাফ-ভলি করে নিত মিডিয়াম পেসের বল। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে তার ভিতরে, অসুখের মতো, যা তাকে লক্ষ লক্ষ লোকের একজনে পরিণত করেছে। একটা কাঁকর, মনে হয় যেন সবসময় তার চেতনায় বিঁধে রয়েছে। সেটাকে খুঁটে ফেলে দিতে না পারলে দ্বাদশ ব্যক্তি হওয়া থেকে কোনোদিনই রেহাই নেই। কিন্তু সেই কাঁকরটাকে খুঁজে বার করতে যাবে কী যাবেনা, এই দ্বিধা অবিরত তাকে দোলাচ্ছে। অথচ ঘটনা ছুটে আসছে এধার-ওধার থেকে। সে যেকোনো সময় রান আউট হয়ে যেতে পারে।
‘কতদিন আগে খেলেছেন, কার এগেনস্টে?’ যুবকটি উৎসুক চোখে তাকিয়ে। তারক তাইতে উত্তেজনা বোধ করল।
‘বারো বছর আগে, এগেনস্ট সার্ভিসেস।’
‘বোলার না ব্যাটসম্যান ছিলেন?’
‘অল-রাউন্ডার। আটটা উইকেট নিয়েছিলাম আর বিরাশি রানের মাথায় রান-আউট হয়ে গেলাম। কিন্তু জেতা ম্যাচটা আমরা হেরে গেলাম শুধু টুয়েলফথ ম্যানটার জন্য। হেমু অধিকারী তখন নাইনটির ঘরে, ওর একটা ড্রাইভ ধরতে গিয়ে আঙুলে চোট খেয়ে মাঠ ছেড়ে এসেছি আর টুয়েলফথ ম্যান নামল। তিনটে বল পরেই অধিকারী হুক করতে গিয়ে ব্যাটের কানায় লাগিয়ে স্কোয়্যার লেগের মাথার উপর সোজা ইজি ক্যাচ তুলল। অ্যান্ড হি ওয়াজ ড্রপড বাই আওয়ার টয়েলফথ ম্যান। সেইখানেই ম্যাচ হাতের বাইরে চলে গেল।’
‘কে ছিল টুয়েলফথ ম্যান?’
তারকের ইচ্ছে হল অরুণাভ ভটচাযের নামটা বলতে। কিন্তু মনে হল, বললে অন্যায় করা হবে। অবশ্য অরুণাভ সেই বিরাশি রানের জোরেই আরও দু-বছর খেলেছে, যতদিন অরুণ মিত্তিরের দাপট ছিল।
‘মনে পড়ছে না নামটা তবে এই একবারই দেখেছি। যা গালাগাল খেল তার চোটেই খেলা ছেড়ে দেয়। ওহ এখনও সেই ব্যারাকিং কানে লেগে আছে।’
‘আপনি কবে লাস্ট খেলেছেন?’
তারক, সালটা মনে করার ভান করতে করতে দেখল দূরে নির্জন রাস্তায় একদল ছেলে রাস্তার বালব লক্ষ করে ঢিল ছুড়ছে। কর্কশ শব্দে ডাস্টবিন টেনে আনছে রাস্তার মাঝখানে। রিকশাওয়ালারা সিনেমার নাইট-শো-ভাঙা সওয়ারি ধরার জন্য সার দিয়ে অপেক্ষা করছে বিব্রতভাবে।
‘এখানেও শুরু হবে।’ যুবকটি উৎসাহব্যঞ্জক স্বরে বলল।
তারক জবাব দেওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু উদবিগ্ন হয়ে বলল, ‘কাল তাহলে ট্রাম বাস বন্ধ। কী করে যে অফিসে যাব।’
‘অফিস-টফিস আর হবে না। তবে দোকানদার ব্যবসায়ীদের লোকসান যাবে।’ তারপর যুবকটি হেসে বলল, ‘কিন্তু ডাক্তারখানা খোলা থাকবে।’
‘থাকলেই ভালো, কাল একটু তাড়াতাড়িই আসব’খন। আজ চলি ভাই।’
বাড়ির দিকে যেতে যেতে তারকের মনে হল, এইভাবে মিথ্যে কথাগুলো বলে কী লাভ হল? বলার সময় আত্মপ্রসাদ পাচ্ছিলাম বটে, কিন্তু খানিকটা লজ্জা আর খানিকটা ভয় মিশিয়ে মনের মধ্যে চটচটে একটা কাদা যেন এখন লেপা হয়ে গেছে। ও জানতে পারবে না কে টুয়েলফথ ম্যান ছিল। ও না জানলেও, তারক ভাবল, আমি তো জানি। নিজেকে জেনে ফেলার মতো ভয়ংকর অবস্থা আর কিছুতেই হয় না।
তারকের এখন নিজেকে অক্ষম দুর্বল মনে হতে লাগল। এই ভাবটা কাটিয়ে ওঠার জন্য সে চাইল ঝাঁকুনি দেবার মতো জোরালো একটা কিছু করতে যাতে সবাই চমকে তাকাবে। বেপরোয়ার মতো একটা কিছু, তাকাতেই হবে এমন একটা কাজ। লাফিয়ে বেরিয়ে এসে ওয়েস হলকে সোজা সাইটস্ক্রিনের উপর দিয়ে ছয়! লর্ডসের মানকড়ের মতো একটা ইনিংস!
আট
গলির মুখেই বঙ্কুবিহারী দাঁড়িয়ে। তারককে দেখে এগিয়ে এসে বলল, ‘সেই মেয়েটা এসে অনেকক্ষণ বসে আছে।’
