‘হাসলে যে?’
‘এমনিই।’ সে রতনের হাতটা টেনে ঊরুর উপর রাখল। পাশ দিয়ে বাস যাচ্ছে। রিকশায় নারীপুরুষ যাত্রী থাকলে অনেকেই মুখ ঘুরিয়ে বাস থেকে তাকায়। রতন কিঞ্চিৎ সিঁটিয়ে রইল। বাসে যদি কোনো পরিচিত লোক থাকে! কীভাবে যেন শিবি বুঝতে পারল রতনের উদবেগ, ঠাট্টার সুরে বলল, ‘লজ্জা করছে নাকি?’
কথাটা গাঁট্টার মতো রতনের মাথায় ঘা দিল। তার যে লজ্জা করছে না সেটা বোঝাতেই হাতটা তুলে নিয়ে শিবির পিঠে বেড় দিয়ে রাখল। এইভাবে সে অনেক পুরুষকে রিকশায় চেপে যেতে দেখেছে সঙ্গিনীকে বাহু দিয়ে জড়িয়ে। জড়াবার মতো সাহস রতনের হল না, শুধু বাহুটা আলতো করে শিবির পিঠে ছুঁইয়ে রাখল।
‘ব্যথাটা কমেছে?’
‘না হাঁটলে বুঝতে পারব না।’
‘বাড়ি গিয়েই বরফ লাগাবে। রাতে চুন-হলুদ গরম করে লাগিয়ে শোবে। সকালে যদি ব্যথা থাকে তাহলে আর আপিস যেয়ো না। বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা আর কাকা, দিদির তো অনেকদিন বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘কাকিমা নেই?’
‘কাকা বিয়ে করেনি।’
‘তুমিও কী কাকার মতো বিয়ে করবে না?’
রতন চুপ করে রইল। শিবি উত্তর পাওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাল না। রতন পালটা জানতে চাইল, ‘তুমি তো এখনও বিয়ে করেনি, তোমার মা পাত্তর খুঁজছে না?’
‘না।’
‘তোমার তো অনেক বন্ধুবান্ধব আছে, একজনকে তো বিয়ে করে ফেলতে পারো। এভাবে একা কদ্দিন থাকবে!’
‘থাক, আমার জন্য তোমায় ভাবতে হবে না।’
এরপর তাদের মধ্যে খুচরো কিছু কথা ছাড়া আর বাক্যালাপ হয়নি। বাড়ির দরজায় রতনকে হাত ধরে শিবি নামাল। পা ফেলেই রতন কাতরে উঠে বলল, ‘ব্যথাটা যেন বেশি লাগছে।’
কড়া নাড়তে দরজা খুলল উমা। শিবি তখন রিকশাওলাকে ভাড়া চোকাচ্ছে। উমার অবাক চাহনি দেখে রতন বলল, ‘পড়ে গিয়ে পা মচকেছে। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। বরফ চাই।’
বলতে বলতে রতন মায়ের কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ির সদরে দাঁড়াল। শিবিকে নিয়ে এখন সে অস্বস্তিতে। রিকশায় বাড়ি ফেরার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু সঙ্গে একটি মেয়ে থাকলে প্রশ্ন উঠবেই-কে? শিবির কী পরিচয় সে দেবে!
‘বরফ এখন কে আনবে? ঠাকুরপো আসুক।’ উমা অসহায়ভাবে বলল। বাড়ি থেকে সে কখনও বেরোয় না, কোথায় বরফ পাওয়া যাবে তাও জানে না।
‘আমি এনে দিচ্ছি, বড়ো রাস্তায় পানের দোকানেই পাওয়া যায়।’ শিবির অচেনা নয় এই পাড়া। সে আর কথা না বাড়িয়ে চটপট বড়ো রাস্তার দিকে রওনা হল।
উমা বলল, ‘তোর সঙ্গেই এল, কে মেয়েটা?’
‘যখন স্যারের বাড়িতে পড়তে যেতুম তখন থেকেই আলাপ, ওই পাড়াতেই থাকে।’ এবার রতন তার জীবনের সবথেকে বৈপ্লবিক উক্তিটি করল, ‘শিবি আমার বন্ধু।’
ঘরে এসে রতন খাটে বসল। এই সংসারে দুর্ঘটনা কখনো উমা দেখেনি, পা মচকালে কী করতে হবে জানে না। গরম চুন-হলুদ লাগানোর কথা শুনেছে কিন্তু কখনো লাগাবার দরকার হয়নি। তার ছেলেমেয়েরা কেউই দুরন্ত ছিল না। উমা উৎকণ্ঠাভরে বলল, ‘বরফ লাগালেই সেরে যাবে? চুন-হলুদ লাগাতে হবে না?’
‘হবে। শিবি আগে আসুক।’
নারকেল দড়িতে বাঁধা একখণ্ড বরফ হাতে ঝুলিয়ে শিবি ফিরল মিনিট পাঁচেক পরেই। বরফখণ্ডটা গামছায় মুড়ে মেঝেয় আছড়ে চূর্ণ করে সে রতনের হাতে দিয়ে বলল, ‘পায়ে চেপে ধরে থাকো।’ উমাকে বলল, ‘মাসিমা চুন আর হলুদ আছে?’
‘হলুদ আছে কিন্তু চুন তো নেই, আমাদের ঘরে কেউ তো পান খায় না!’
‘খায় না বললে তো হবে না, জোগাড় করুন। চুন-হলুদ গরম করতে হবে, একটা কলাইয়ের কী অ্যালুমুনিমের বাটি দিন।’
উপরের নমিতা পান খায়, উমা ছুটল চুন আনতে, হলুদ বাটা নেই। শিল নোড়া পেতে শিবি হলুদ বাটতে বসল। তখন বাড়ি ফিরল বিষ্ণু। নিজের ঘরের দরজা খুলতে খুলতে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। উমা বাটি হাতে দাঁড়িয়ে আর বাটনা বাটছে সেই মেয়েটা যাকে সে বাজারে মাছওলার সঙ্গে ওজন নিয়ে ঝগড়া করতে দেখেছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তেলেভাজা খেতে দেখেছে লোচ্চচামার্কা ছেলেদের সঙ্গে। বিষ্ণু পাশের ঘরে ঢুকে দেখল রতন মেঝেয় বসে পায়ে বরফ ঘষছে।
‘কী হয়েছে?’
‘ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছি।’
‘বাটনা বাটছে মেয়েটা কে?’
কাকার গলার স্বর কড়া এবং চড়িয়ে বলা। রতন এবার বলতে পারল না ‘আমার বন্ধু’। ক্ষীণভাবে বলল, ‘হাঁটতে পারছিলুম না, ওই আমাকে রিকশায় করে নিয়ে এল।’
‘চিনিস ওকে?’ রুক্ষ গলায় বলা। বিষ্ণুর কথাগুলো রান্নাঘরে পৌঁছল।
‘হ্যাঁ, অনেকদিন। স্যারের কাছে যখন পড়তে যেতুম তখন থেকে।’
‘রাস্তা থেকে ধরে এনে রান্নাঘরে ঢুকিয়েছিস কেন? অনেকদিন চিনি বললেই কি চেনা হয়? রাস্তায় বাজারে হ্যা হ্যা করে বেড়ায়, তাকে একেবারে রান্নাঘরে তোলা! …বউদি, বউদি।’ বিষ্ণু কর্কশ স্বরে ডাকল।
উমা আসতেই সে গলা চড়িয়ে বলল, ‘রান্নাঘর থেকে বেরোতে বলো। জাতটাত এখনও মানি, তোমরা না মানলেও, আমি মানি। তুমি কী জানো ও ডোম না মুচি?’
পাংশু হয়ে গেল উমা এবং রতনের মুখ। গুপিনাথ বেঁচে থাকতেই রোজগেরে বিষ্ণু সংসারের কর্তা হয়েছিল এবং আজও রয়েছে। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর কথা বলে কেউ ওকে চটাতে চায় না। রতন চাকরি করলেও সংসারের হাল কাকার হাত থেকে নেওয়ার সাহস আজও সে অর্জন করতে পারেনি।
‘কাকা একটু আস্তে বলো, ও মুচি ডোমের মেয়ে নয়, ভদ্রঘরের মেয়ে।’ রতন অনুনয় জানাল।
