‘কেমন ভদ্রঘরের তা আমার দেখা আছে। বাজারে ঝগড়া করে, রাস্তায় ছেলেদের সঙ্গে ঢলাঢলি করে সে আবার ভদ্দর ঘরের!’ বিষ্ণু ভেংচি কাটার মতো মুখটাকে বিকৃত করল।
‘মাসিমা,’ দরজার কাছে শিবি। শান্ত স্বরে বলল, ‘হলুদ বেটে গেলুম, চুনের সঙ্গে মিশিয়ে গরম করে লাগিয়ে দেবেন। আমি চললুম।’
ঘরের ভিতর এসে খাটের উপর রাখা প্যাকেটটা তুলে বেরিয়ে যেতে গিয়ে শিবি থমকে দাঁড়াল। ভারী মুখ চোখে আগুন, শিবি তীক্ষ্নস্বরে বিষ্ণুকে বলল, ‘আপনি জানেন আমি ভদ্দর না ছোটোলোকের ঘরের মেয়ে? শুনিয়ে শুনিয়ে ঠেশ দিয়ে অনেক কথা তো বললেন, এখন আমি যদি বলি আপনি বিয়ে করেননি…মাগিবাড়ি যান।’ শিবির ঠোঁট থরথর করছে উত্তেজনায়।
‘কী বললে? কী বললে?’ বিষ্ণু ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। উমা আর রতন বিস্ফারিত চোখে শিবির দিকে তাকিয়ে। শিবির দু চোখ দিয়ে হলকা বেরোচ্ছে।
‘যা বলেছি তা ঠিকই কানে ঢুকেছে। উপকার করতে রিকশা করে বাড়ি পৌঁছে দিলুম, বরফ আনলুম, হলুদ বেটে দিলুম আর তার বদলে শুনতে হল আমি মুচি ডোমের মেয়ে?’ বলতে বলতে শিবির গলা চড়ে উঠল। ‘এটা কি ভদ্দরলোকের বাড়ি? আমি মেয়ে বলে তাই বলতে সাহস পেলেন, ছেলে হলে এক চড়ে দাঁতগুলো ফেলে দিত। …অভদ্দর ছোটোলোক ঘাটের মড়া কোথাকার।’
‘শিবি কী বলছ?’ রতন উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে শিবিকে দরজার দিকে ঠেলে দিল। ‘যাও তুমি এখন।’
‘যাব না তো কি থাকতে এসেছি? বাইরের একটা মেয়েকে গায়ে পড়ে অপমান করল, তার বেলা চুপ করে আছ কেন? মেনিমুখো, মিচকেপোড়া।’ ক্রুদ্ধ শিবির গলা এবার কান্নায় ভিজে উঠেছে। দু-চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামল।
বিষ্ণু বলল, ‘আর নাটক করতে হবে না। ছেলে হলে আমিও-‘
‘কাকা!’ রতন চেঁচিয়ে উঠল। ‘অনেক ছোটলোকমি করেছ, এবার চুপ করো।’
রতন যে এভাবে কাকার মুখোমুখি হবে সেটা বিষ্ণু কখনো কল্পনাতেও ভাবতে পারে না। সে স্তম্ভিত হয়ে ভাইপোর দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। শিবি পরিস্থিতি দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বলল, ‘জেনে রাখুন আমি সোনার বেনের মেয়ে, ছোটো জাত নই।’ রতন জ্বলন্ত চোখে বিষ্ণুর দিকে তাকাল, বলার মতো কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
‘তুই আমাকে অপমান করলি! ছোটোলোক বললি? খাইয়ে পরিয়ে এত বড়ো করলুম, চাকরিটাও জোগাড় করে দিলুম আর কি না … তুই একটা বেইমান, একটা কালসাপ … আমাকে বলল কি না মাগিবাড়ি যাই! আর তুই মুখ বুজে অমন কথা শুনে গেলি? তোর নিজের কাকার থেকে ওই হারামজাদিটা বেশি আপন হল?’
‘তুমিই তো গায়ে পড়ে শুরু করেছিলে। আমিই ওকে নিয়ে এসেছি। কাউকে কি বাড়িতে আনার অধিকার আমার নেই? চিরকাল কি তোমার তাঁবেদার হয়ে থাকতে হবে?’ রতন উত্তেজনা চেপে ক্ষোভ জানানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘লেখাপড়া শিখে জাত তুলে কথা বলো!’
‘বলি তো কী হয়েছে?’
‘হবে আবার কী, লজ্জায় মাথা কাটা যায়।’
‘অঅঅ বাবুর লজ্জা হয়, তায় আবার মাথাও কাটা যায়! কী দামি মাথা! পরীক্ষায় টুকতে গিয়ে ধরা পড়ে যখন ফেল করিস তখন যে বংশের মাথাকাটা যায় রতনবাবু, সেটা মনে রেখো।’
রতনের মুখ পলকের জন্য ফ্যাকাসে দেখাল। উমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে চোখ নামিয়ে সে বলল, ‘এত বছর পর ওসব কথা তুলছ কেন?’
‘তুলতে বাধ্য করলি। এই বলে রাখলুম, এই ছোটোলোক মেয়েটা আর যেন এ বাড়ির চৌকাট না মাড়ায়। যদি কোনোদিন ওকে দেখি তা হলে তোকেই ঘাড় ধরে এখান থেকে বার করে দেব আর নয় তো আমিই এখান থেকে চলে যাব। …বউদি, অনেক করেছি তোমাদের জন্য আর আমি কিছু করব না।’
উমা এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি। বিস্ময়, ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। রতনের চুল মুঠোয় ধরে ঠাসঠাস করে দু গালে চড় মেরে সে বলল, ‘মাপ চা, কাকার পায়ে ধরে মাপ চা।’
‘না।’ তার ভিতরে যে চাপ এতক্ষণ ধরে তৈরি হয়ে উঠেছে সেটা যেন বার করে দেবার চেষ্টাতেই বিকটভাবে রতন চিৎকার করে উঠল। তার চোখে উন্মাদের মতো চাহনি। বিষ্ণুর দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল, ‘ভেবেছ কী আমাকে? যা খুশি ইচ্ছে চাপিয়ে দেবে আর তাই মেনে নিতে হবে মাথা নীচু করে? ওই মেয়েকে কালকেই আমি এ বাড়িতে নিয়ে আসব, দেখি তুমি কী করো!’
বিষ্ণু অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে থাকল। নিরীহ শান্ত ভাইপোকে সে যেন আর চিনতে পারছে না। একটা যুবতী মেয়ের জন্য ছেলেটা এতদূর উদ্ধত হয়ে উঠল! মুখের উপর অপমান করার জোর পেল কোথা থেকে? সে এগোল অলসভাবে। আচমকা বিশাল থাবায় রতনের ঘাড়টা ধরে তাকে ধাক্কা দিল। হালকা দুবলা রতন হুমড়ি খেয়ে ঘরের বাইরে দালানের মেঝেয় ছিটকে পড়ল।
‘বেরো, এখনই বেরো।’ বিষ্ণু আঙুল দিয়ে সদর দরজাটা দেখাল।
‘ঠাকুরপো!’ উমা আর্তনাদ করে বিষ্ণুকে জড়িয়ে ধরল। ‘আমি ওর হয়ে মাপ চাইছি। ও ছেলেমানুষ, কাকে কী বলতে হয় জানে না। ওকে ছেড়ে দাও।’
উমার কথায় কান না দিয়ে বিষ্ণু নিজের ঘরে চলে গেল, তার পিছনে গেল উমা। রতন উঠে দাঁড়াল। ঘরে ঢুকে বরফগলা জল মাড়িয়ে খাটে বসল। এখন আর সে পায়ে ব্যথা বোধ করছে না। শরীরের মধ্যে একটা থরথরানি আর মাথার মধ্যে শক্ত করে এঁটে ধরেছে একটা সাঁড়াশি। আলতোভাবে সে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। তার চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। এলোমেলোভাবে সে হাতড়াতে লাগল একটা কোনো বিষয়কে ধরে ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে। পারল না। সে শিবির কথা ভাবল, বর্ধন প্রেসের চাকরির এবং মায়ের জন্য ভাবল। এই সংসার থেকে বেরোতে হলে কী করা দরকার তাও ভাবল। এবং সবশেষে ভাবল বরাতে যা আছে তাই হবে।
