ট্রাম পরের স্টপ হ্যারিসন রোডের মুখে এল। নর্থ স্টেশনে যাবার জন্য নামল কিছু লোক। কিছু লোক ঠেলে উঠল। ট্রাম ছাড়ার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল রতনের। শিবি দাঁড়িয়ে রয়েছে স্টপে। দেখামাত্র সে ভিড় ঠেলে নামতে এগোল। বিরক্ত ক্রুদ্ধ মন্তব্য হল, ‘এতক্ষণ কী ঘুমোচ্ছিলেন নাকি মশাই? ‘যত্তোসব পাড়াগাঁইয়া, ওঠে কেন ট্রামে!’ রতন যার পা মাড়াল সে পাঁজরে ঘুঁষির মতো ধাক্কা দিল, ট্র্যাফিকের ভিড়ের জন্য ট্রাম মন্থর ছিল এইবার গতি বাড়াল আর তখনই রতন প্রায় ঝাঁপিয়ে নামল রাস্তায়। নিজেকে সামলাতে সামলাতে সে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ল। চটপট উঠে দাঁড়িয়ে সে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা লোকেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লাগেনি’। তারপরই দেখল শিবি তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে।
‘দেখলুম তুমি দাঁড়িয়ে আছ তাই নামলুম।’ হাসার চেষ্টা করল রতন।
‘নামলে কোথায়, তুমি তো পড়ে গেলে।’ শিবি উৎকন্ঠিত চোখে রতনের আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে দেখল। রতন দু-হাতের তেলো থেকে রাস্তার ধুলোময়লা ঝাড়তে শুরু করল।
‘ব্যালান্সটা ঠিকমতো রাখতে পারিনি। …হঠাৎ স্পিড নিল-‘।
‘হয়েছে আর সাফাই গাইতে হবে না। ধুতিটা তো ছিঁড়েছে, লোকেও তাকিয়ে আছে, হাঁটো।’
হাঁটতে গিয়ে রতন টের পেল ডান পায়ের গোছে যন্ত্রণা হচ্ছে। প্রায় কুড়ি গজ হেঁটে সে থেমে পড়ল।
‘হাঁটতে পারছ না? লেগেছে?’
‘মচকেছে বোধহয়।’ রতনের মুখে কাতরতা ফুটে উঠল। সে হাঁটার চেষ্টায় পা ফেলেই ‘আহহ’ করে উঠতে শিবি তার বাম বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।
‘থাক আর হেঁটে কাজ নেই।’ খালি রিকশা নিয়ে যাচ্ছে এক বুড়ো রিকশাওলা। শিবি হাত তুলে ডাকল, ‘অ্যাই রিকশা, ইধার আও। …দর্জিপাড়া যায়গা? কেতনা লেগা?’
‘চার রুপৈয়া।’
‘কেয়া? চার রুপৈয়া!’ শিবি আঁতকে উঠল। ‘এইটুকু পথ চার টাকা? নেহি যায়গা। হরদম যাতা হ্যায় তিন রুপিয়ামে। দর্জিপাড়া তো কাছেই হ্যায়।’
‘মাজি, দর্জিপাড়া বহত রাস্তা, তিন রুপৈয়ামে কোই নেহি যায়েগা।’
দরাদরি রতনের ভালো লাগে না। বিশেষত গরিব লোকেদের সঙ্গে। একটা টাকা তার চার দিনের চায়ের খরচ, রিকশাওলার তাতে চার বেলা ছাতু খাওয়া হয়ে যাবে।
‘সাড়ে তিন রুপিয়া দেগা, যায়েগা?’ রতন বলল।
‘তুমি আবার কথা বলছ কেন?’ শিবি চাপাস্বরে প্রায় ধমকে উঠল। রতনের মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে গলা নামিয়ে বলল, ‘আমি ডেকেছি ভাড়া আমি দোব। তোমার মতো বড়োলোক তো নই?’ তারপর রিকশাওলাকে বলল, ‘বাবু বোলা সাড়ে তিন রুপিয়া, ব্যস, রাজি?’
‘উঠিয়ে।’
গায়ে গা লাগিয়ে কোনো তরুণীর সঙ্গে বসার সুযোগ রতনের জীবনে আগে কখনো আসেনি। রিকশায় বসার জায়গা খুব চওড়া হয় না। কিন্তু তারাও খুব চওড়া দেহের মানুষ নয়। সামান্য স্পর্শের বেশি গায়ে গা লাগার দরকার না থাকলেও দুজনের দুটি কাঁধ ও বাহু যে একটু বেশিই স্পর্শ করে রইল সে ব্যাপারে কারুর হুঁশ নেই। রাস্তার গর্তে বা উঁচু হয়ে থাকা জায়গায় চাকা পড়লে রিকশায় বেশ জোরেই দোলা লাগে। তখন দুজনের কোমরের কাছে যে ধাক্কাটা লাগছিল সেটাও তারা ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি। দুজনে প্রথমে পুতুলের মতো দুটো মিনিট কাটাল। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, রক্ত চলাচল করছে। কিন্তু বেশিক্ষণ নির্বাক থাকা শিবির স্বভাবে নেই।
‘অমন করে নামার কী দরকার ছিল? সোজা বাড়ি চলে গেলেই তো পারতে!’ শুকনো নিরাসক্ত স্বর। রতন আড়চোখে দেখল শিবি চোখ নামিয়ে হাতে ধরা একটা ছোটো প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে। প্যাকেটটা এতক্ষণ সে লক্ষ করেনি।
‘ওটা কী? যা আনতে গেছলে?’ উত্তর দেওয়ার দায় রতন এড়াতে চায়। কেন যে নামার দরকার হল সেটা এখনও তার কাছে স্পষ্ট নয়।
‘লেডিজ রুমালের কাপড়। ওরাই কেটে দেয়। চার ধারে মুড়ে হাত সেলাই করি।’
‘দিনে কটা করো?’
‘অনেক।’ অনিচ্ছুক গলায় উত্তর।
‘ইচ্ছে করল নামতে, তাই নামলুম।…কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে?’
‘বলতে পারব না। আমার হাতে তো ঘড়ি নেই।’ এবার আর শুকনো গলায় উত্তর নয়। রতনের কানে অভিমানের মতো সুর বাজল। এবার কৈফিয়ত দেওয়ার সময় হয়েছে।
‘হঠাৎই একটা খুব জরুরি কাজে যেতে হল দাঁতের হাসপাতালে। অফিসের ব্যাপার, না বলা যায় না। সেখানেও বসে থাকতে হল আধঘণ্টার মতো-‘
‘থাক, ওসব শুনে আমার চোদ্দ পুরুষের মুখে জল পড়বে না। একঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। শেয়ালদার মতো জায়গায় একটা মেয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকলে কী হয় সেটা বোঝার মতো বুদ্ধি ঘটে নেই…একটা লোক পাশে এসে দাঁড়িয়ে দর জানতে চেয়েছিল।’ রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে ছিবড়ে করে কথাগুলো শিবি মুখ থেকে ফেলে দিল।
রতনের বুকের মধ্যে দরকারের বেশি বাতাস ঢুকে পড়ে ফুসফুসটাকে কোণঠাসা করে দিল। সে বিড়বিড় করে উঠল, ‘কী বলছ তুমি!… আমার জন্য তোমাকে এই অপমান সহ্য করতে হল। …ছি ছি। আর এরকম হবে না… মাপ চাইছি।’ রতন চেপে ধরল শিবির ডান হাতের আঙুলগুলো। শিবির কঠিন হয়ে থাকা মুখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে দেখে সে তার মুঠোর চাপ বাড়াল। হাতটা অসাড় ঠান্ডা মনে হল তার। রাজাবাজারের মোড় পেরিয়ে সায়ান্স কলেজের কাছাকাছি, আধমাইলেরও বেশি পথ পেরিয়ে আসার পর রতন হাত সরিয়ে নিল। শিবি মুখ ঘুরিয়ে হাসল।
