‘ওই টেবিলে কে বসে?’
‘জ্যাঠামশাই…মালিক।’
‘তোমার জ্যাঠামশাই মালিক!’
রতনের ভালো লাগল ওর অবাক হওয়ার পরিমাণটা দেখে। বিশ্বাস করতে পারছে না সে মালিকের ভাইপো।
‘শুধু দেখতে এসেছ, না এদিকে অন্য কাজেও এসেছ?’ রতনের অস্বস্তি লাগছে কয়েকবার রবির তাকানোয়।
‘মহাজনের কাছে গেছলুম দেখা পেলুম না। তারপর ভাবলুম যাই সন্দেশ খাওয়াবে বলেছিলে খেয়ে আসি।’
‘তাহলে চলো খেয়ে আসি।’ বলেই রতন উঠে দাঁড়াল। অফিসঘরে একটা মেয়ের সঙ্গে মুখোমুখি বসে থাকলে লোকে কতরকম ভাববে। রবিবাবু ছাড়াও তো আছে অমিয়দা, যখন তখন এসে পড়ে। শিবিকে বসে থাকতে দেখলে পরে মুখ ছোটাবে। তবু রক্ষে জ্যাঠামশাই এইসময় থাকে না।
‘রবিবাবু আমি এখুনি আসছি।’
শিবিকে নিয়ে সে হ্যারিসন রোডে এল। শেয়ালদার দিকে অনেকগুলো মিষ্টির দোকান আছে। যে দোকানে ভিড় নেই রতন সেটাই বেছে নিল। এবার তারা পাশাপাশি। দোকানের বাচ্চচা ছেলেটা কাছে এসে দাঁড়াল।
‘সন্দেশ বলি?’
‘সন্দেশ ভালো লাগে না।’
‘বাহ, সন্দেশ খাবে বলে এলে আর এখন বলছ ভালো লাগে না!’
‘মিষ্টি আমার ভালো লাগে না।’
‘তাহলে কী খাবে? মিষ্টির দোকানে তো মিষ্টিই পাওয়া যাবে। আগে জানলে রেস্টুরেন্টে যাওয়া যেত।’
‘পরে যাবখন। আচ্ছা সন্দেশই বলো।’
‘পরে যাবখন’ বলল কেন? তাহলে শিবির সঙ্গে আবার দেখা হবে? রতনের মাথার মধ্যে এক ঝলক হাওয়া ঢুকে পড়ল। ছেলেটাকে সে বলল, ‘চারটে কড়াপাকের তালশাঁস, আট আনাওলা, নিয়ে আয়।’
‘এক জায়গায়?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি একাই চারটে খাব নাকি? না না, পারব না।’
‘না পারলে আমি খাব।’
একটা প্লেটে চারটে সন্দেশ দিয়ে গেল। দুজনেই সন্দেশ তুলল, শিবি তারটায় কামড় দিল, রতন হাতে ধরেই রইল।
‘খাচ্ছ না যে?’
‘খাচ্ছি।’
রতন বলল বটে কিন্তু মুখে দিল না। সে শিবির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রইল। সন্দেশটা শেষ হতে শিবি আর একটা তুলে অল্প একটু কামড়েই বলল, ‘আর খেতে ভালো লাগছে না।’
রতন অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার করে বসল। হাতের সন্দেশটা রেখে সে শিবির হাত থেকে সন্দেশটা নিয়ে নিজের মুখে পুরে দিল। চমকে শিবি বলল, ‘আমার এঁটো খেলে?’
‘খেলে কী হয়েছে?’
‘তুমি বামুনের ছেলে।’ অপ্রতিভ দেখাল শিবিকে।
‘জাতটাত আমি মানি না।’ অনেকটা এই গলাতেই একদিন সে শিবিকে বলেছিল, ‘গুরুর জন্য ছাত্রদের এটা করা কর্তব্য।’ টেবলে রাখা শিবির পুঁতির ব্যাগটা তুলে সে খুলল। রুমালটা বার করে বাকি সন্দেশ দুটো তাতে মুড়ে ব্যাগে ঢোকাল। ‘বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাবে। নাও এবার ওঠো, অফিস যেতে হবে।’
দোকান থেকে বেরিয়ে রতন বলল, ‘এখন বাড়ি যাবে তো? চলো বাসে তুলে দিয়ে আসি।’
‘মহাজনের কাছে আর একবার যাব, এসেছে কি না দেখি, রুমাল দেবার কথা আছে।’
‘ফিরবে কখন?’
‘পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা তো হবে।’
‘আমারও তো ছুটি ওই সময়ে হয়। ভালোই হল, একসঙ্গে ফেরা যাবে। আমি তাহলে ওই মোড়ের ট্রাম স্টপে পাঁচটার সময় অপেক্ষা করব। একসঙ্গে যেতে আপত্তি নেই তো?’ রতন অনিশ্চিত হয়ে লক্ষ করল শিবির মুখভাব। অন্তরঙ্গ হবার ইচ্ছেটা সে অনেকটা খুলেই বলল, শিবি বোকা নয় এবার প্রশ্রয় দেয় কিনা সে দেখতে চায়।
‘যদি আটকে না পড়ি, কথা দিতে পারছি না।’ প্রশ্রয়ের কোনো চিহ্ন শিবির মুখে নেই।
‘তাহলে থাক। …কাজ রেখে এসেছি, আমি যাই?’ রতন যাওয়ার অনুমোদন পেতে শিবির ঘাড় নাড়ার জন্য অপেক্ষায় রইল।
‘পাঁচ-দশ মিনিট দাঁড়িয়ে দেখো যদি এসে পড়ি।’ এক হাত তুলে ঘাড়ের কাছে খোঁপাটা নেড়ে ঠিক করে বসিয়ে শিবি সাদামাটা গলায় বলল, ‘আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে শিবি দ্রুত পায়ে শেয়ালদার ভিড়ে মিলিয়ে গেল। রতন ফিরে আসতেই রবি ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘রতন, ডেন্টাল কলেজে এখুনি যাও। ওদের স্যুভেনিরে কী সব ছাপার গোলমাল বেরিয়েছে। প্রিন্সিপালের লেখায় থার্ড প্যারার জায়গায় অন্য ম্যাটার বসেছে…কী প্রুফ দেখেছ?’
‘আমি তো ঠিকই দেখেছি! তাহলে মেক-আপের সময় চালাচালিতে গণ্ডগোল হয়েছে।’
‘সেটা তো ওরা বুঝবে না। দোষ তো আমাদেরই। অক্ষয়বাবু শুনলে খেপে যাবেন। তুমি একবার যাও…টাকা দেবে না বলেছে।’
দু গ্যালি প্রুফ দেখা বাকি ছিল, ঝড়ের বেগে কারেকশন করে সে বেরিয়ে পড়ল। প্রায় পাঁচটা বাজে। স্যুভেনিরে যা ভুল হয়েছে তাতে মাপ চেয়ে পার পাওয়া যাবে না। কাঁচুমাচু হয়ে বোঝাতে হবে যাতে সব টাকাটা আটকে না দেয়। কীভাবে বোঝাবে তাই ভাঁজতে ভাঁজতে রতন ডেন্টাল কলেজে পৌঁছল। ঘড়িতে তখন পাঁচটা বেজে গেছে। সেখানে শুনল তাকে মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে হবে, অ্যাকাউন্ট্যান্টবাবু খুব ব্যস্ত।
রতন অনেকভাবে চেষ্টা করেও বোঝাতে পারল না। তাকে শুনতে হল, ‘লেখাটাকে হাস্যকর করে দিয়েছেন। আপনারা অন্ধের মতো কাজ করবেন আর আমরা দেব গুণাগার?… ওনার প্রবন্ধটা আলাদা করে ছেপে দেবেন বলছেন কিন্তু বিলি করব কার কাছে? যারা স্যুভেনির পেয়েছে তাদের নাম ঠিকানা কী আমরা লিখে রেখেছি।’
রতন মুখ কালো করে, তিক্ত হতাশ মনে প্রাচী সিনেমার সামনে ট্রাম স্টপে দাঁড়াল। ছ-টা বাজে। শেয়ালদার ট্রাম স্টপে শিবির এখনও আর দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হয়ে চলে গেছে। অফিস ছুটির ভিড় প্রত্যেক ট্রামে, পাদানিতে লোক ঝুলছে। বাসেরও একই অবস্থা। তবে এখানে বেশ কিছু লোক নামে শেয়ালদার সাউথ স্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য। তখন চেষ্টা করে ওঠা যায়। রতন গ্যালিফ স্ট্রিট বোর্ড দেখে একটা ট্রামের দিকে এগিয়ে গেল। পাঁচ-ছ-জন নামল, ওঠার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করল অন্তত আটজন। হ্যান্ডেল ধরতে পেরেছিল পা রাখার জায়গাও রতন পেয়ে গেল। একটু পরে এক ধাপ উঠে দাঁড়াল।
