‘কে রে?’
‘চেনা মেয়ে, পাড়ায় থাকে।’
‘কতটা চেনা?’ অমিয় মৌরি চিবোতে চিবোতে চোখের কোণ দিয়ে তাকাল।
‘সামান্যই।’
‘কালো হলেও দেখতে বেশ, গড়নটাও ভালো। …তা সামান্য চেনা মেয়ে এখানে কেন?’
অমিয়র বলার ভঙ্গি রতনকে বিব্রত করল। প্রায় কৈফিয়ত দেবার মতো স্বরে সে বলল, ‘রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল অমিয়দা। বলল কোথায় কাজ করো দেখব। তাই-।’
‘তাই… ওরে মুখ দেখে সব বুঝতে পারি। তোকে তো নিরীহ গোবেচারা বলেই জানি! থাক থাক আর সাফাই গাইতে হবে না। …মুখে কী গদগদ ভাব! চলনের কী ভঙ্গি এই বুঝি গায়ের ওপর পড়ে! …ওরে প্রেম আমিও করেছি বিয়ের আগে। লজ্জা পাচ্ছিস কেন, য়্যা, প্রেম করার বয়স হয়েছে, করছিস, এতে লজ্জার কী আছে?’ অমিয় সবজান্তার হাসি হেসে রতনের পিঠে চাপড় দিল।
অমিয়র কথাগুলো রতনকে ব্যস্ত রাখল অবসর সময়ে। তার মুখে কী ফুটে উঠেছিল যা দেখে অমিয়দার মনে হল সে শিবির প্রেমে পড়েছে! আট বছর পর আচমকা দেখা, বড়োজোর মিনিট পনেরো তারা পাশাপাশি রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, হেঁটেছে। তার মধ্যেই সে প্রেমে পড়ে গেল! তাই কখনো হয় নাকি? কিন্তু অমিয়দার চোখ বড়ো সাংঘাতিক। বছরপাঁচেক আগে বলেছিল, ‘ওই রবি লোকটা সুবিধের নয়, সাবধানে থাকিস। তোকে পছন্দ করে না।’ পরে সে জেনেছে, রবি তার নামে জ্যাঠামশাইয়ের কাছে চুকলি কাটে।
রাতে অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে রতন ভেবেছে রাস্তায় আটা কুড়োনো থেকেই শিবির জন্য প্রথম তার দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল। তারপর ওর চোখে নিজেকে তালেবর বানাবার জন্য জার্মানি যাব বলায় শিবির প্রতিক্রিয়াটা তাকে আরও দুর্বল করে দেয়-আচমকা গালে চুমু আর ‘বিয়ে করে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু’ কথাটা মাথার মধ্যে ইলেকট্রিক শক দিয়েছিল। নয়তো সেদিন কাদের সঙ্গে শিবি চিত্রলেখায় সিনেমা দেখতে যাচ্ছে জানতে কেন সে সিনেমা হলের কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। সাজগোজ করা শিবিকে ভেলোদা নামের লোকটার সঙ্গে দেখে তার অভিমানের মতো হয়েছিল কেন? আট বছর পরও সে সেদিনের শিবির হাসি, কপট রাগ নিয়ে তাকানো ছবির মতো আজও দেখতে পাচ্ছে কেন? সেদিন বুকের মধ্যে একটা ফোঁপানি উথলে উঠছিল, কেন? এতগুলো কেন-র কারণ খুঁজতে খুঁজতে সে অনুভব করল তার জীবনে অনেক কিছুই হয়নি। তার বয়সি একটা ছেলের ভালো লাগে একটি মেয়ের সঙ্গ, যা পাওয়ার সুযোগ কখনো হয়নি। শিবির সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে অনুভব করেছিল তার একটা চাহিদা আছে। এই একবগ্গা জীবনটা আর ভালো লাগছে না, এটাকে একটু অন্যরকম পথে নিয়ে ফেলা দরকার।
রতনের মনে পড়ল, শেয়ালদা স্টেশনের দিকে উদ্দাম নেচে, উল্লাসে চিৎকার করে মুখে ফেনা তুলে খালি গায়ে খালি পায়ে এগিয়ে যাওয়া একদল তরুণকে। সে দাঁড়িয়ে দেখছিল একজনের গায়ে জড়ানো ছিল ক্লাবের পতাকা। সে ভাবল, গভীরভাবে একটা কিছুকে আঁকড়ে ধরলে জীবনের কিছু ফাঁক হয়তো ভরাট হবে। এতকাল পর শিবিকে দেখামাত্রই বুকের মধ্যে ধক করে উঠেছিল। সে কি এতদিন অনুভব না করা ব্যর্থতাকে ভরাট করার একটা আশা পেয়েছিল শিবিকে দেখে! তার অন্তরের অন্তঃস্থলে তাহলে কি তলানির মতো শিবি এত বছর ধরে ছিল? জীবনকে আত্মসাৎ করতে হলে ওই ক্লাব পতাকার মতো কিছু একটার সঙ্গে নিজেকে জড়ানো বোধহয় দরকার। তার হৃদয় নেচে উঠেছিল শিবির বলা ‘কেন চিনতে পারব না’ শুনে। বরাত দেখা করিয়ে দিয়েছে ওর সঙ্গে। আট বছরে মানুষের চেহারায় কত পরিবর্তন হয় তবু শিবি তাকে চিনতে পেরেছে! আমাকে ওর মনে আছে, রতন ঘুমিয়ে পড়ার আগে বারবার নিজেকে বলল, আমাকে ও ভোলেনি।
সাতদিন পর, দুপুরে ফোন বেজে উঠতে রবি বলল, ‘রতন ধরো।’ জ্যাঠামশাই বাড়িতে, রতন হাতের প্রুফ রেখে দিয়ে উঠে গেল। ক্যালকাটা পেপার হাউস থেকে ফোন করেছে ঠেলাগাড়ির চাকা ভেঙে গেছে লরির ধাক্কায় আজ আর কাগজ পাঠানো যাবে না।
‘কাল সকালে না পাঠালে কিন্তু ছাপা বন্ধ থাকবে, পার্টি আমাদের বাপান্ত করে ছাড়বে। অবশ্য কাল সকালেই চাই। …তা তো বুঝলুম, অ্যাক্সিডেন্টের ওপর আপনাদের হাত নেই, কিন্তু পূরবী পাবলিশার্সকে তো আমাদের বোঝাতে হবে। …আচ্ছা নমস্কার।’
ফোন রেখে ঘুরে দাঁড়িয়েই রতন থ হয়ে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শিবি আর চশমার ফাঁক দিয়ে রবিবাবু তাকিয়ে ওর দিকে।
‘তুমি!’
‘আসব?’
‘এসো এসো।’ রতন চট করে রবির মুখটা দেখে নিল। ‘বসো।’
আঁচল টেনে গায়ে জড়িয়ে শিবি তার সামনের চেয়ারে বসল। মুখে লাজুক হাসি। ‘দেখতে এলুম তোমার আপিস।’ মুখ ঘুরিয়ে ঘরের চারদিকে সে চোখ বোলাল।
কী করবে ভেবে পাচ্ছে না রতন। ঘরটা অগোছালো হয়ে রয়েছে, নোংরাও। তবু ভালো মাস কয়েক আগে কলি করা হয়েছে, দরজা-জানলা, কড়ি বরগায় রং পড়েছে। কিন্তু চেয়ার টেবিলগুলো প্রথম দিন এসে যা দেখেছিল সেইরকমই রয়ে গেছে।
‘কেমন দেখছ?’
শিবি নীচু গলায় বলল, ‘এটা তোমার টেবিল?’
‘হুঁ।’
‘তুমি ফোন করো?’
‘হুঁ।’
‘বাইরে যেতে দেয়?’
‘দেবে না কেন! বাইরে কাজ থাকলে তো যেতেই হয়।’
‘ছাপা হয় কোথায়, নীচে? বড়ো বড়ো মেশিন দেখলুম।’
‘সব নীচে হয়। নীচে গোডাউনও আছে। রাস্তার ওপারে যে বাড়িটা দেখছ ওটা কেনা হবে। ভেঙে ফেলে নতুন করে বাড়ি হবে। সেখানে নতুন অফসেট মেশিন বসবে। এই বাড়ি থেকে সব মেশিন ওই বাড়িতে উঠে যাবে।’ বলতে বলতে রতন দেখল শিবির চোখমুখে সমীহ ফুটে উঠেছে।
