কখনো তার বন্ধুবান্ধব ছিল না, এখনও নেই। অনেকের সঙ্গেই তার আলাপ, ভালো সম্পর্কও; তবে ঘনিষ্ঠতা নেই কারুর সঙ্গে। এক এক সময় সে ক্লান্ত বোধ করে। ইচ্ছে করে হইচই করতে। একদিন সে সন্ধ্যাবেলা দেখেছিল তারই বয়সি একদল ছেলে নাচতে নাচতে শেয়ালদা স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। কয়েকজনের খালি গা, জামায় বোতাম নেই অনেকের, পায়ের চটি খুইয়েছে দু-তিনজন। একজনের গায়ে জড়ানো লাল-হলুদ রঙের ক্লাবের পতাকা। ওরা কলজে ফাটিয়ে চিৎকার করে জয়ধ্বনি দিচ্ছে ক্লাবের নামে। রতনের শরীর শিরশির করে উঠেছিল উত্তেজিত তরুণদের দেখে। প্রাণ-মন দিয়ে জড়িয়ে পড়লে তবেই এমনভাবে প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। সেদিন রতন কয়েক মিনিটের জন্য বিষণ্ণ হয়েছিল, গভীরভাবে কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে না পারায়। জড়িয়ে না পড়লে জীবনে অনেক ফাঁক থেকে যায়। সেই ফাঁকগুলো দিয়ে ব্যর্থ হওয়ার বোধ ঢুকে পড়ে মনে জমা হয়। কিন্তু সে ব্যর্থ কোথায়? মাইনে দুশো টাকায় পৌঁছেছে, সংসারে অশান্তি নেই, তার নিজের কাজে সে সন্তুষ্ট, বড়ো ধরনের অসুখবিসুখ হয়নি। বরাতে যেমন আছে তাই হয়েছে!
ছয়
বোধহয় বরাতে ছিল বলেই দেখা হয়ে গেল শিবির সঙ্গে, আট বছর পর।
রতন শেয়ালদা স্টেশনে ঢোকার বড়ো ফটকের কাছে বসা পেয়ারাওলার ঝুড়ির উপর ঝুঁকে পেয়ারা বাছছিল। তার পাশে একজন এসে পেয়ারা তুলে বলল, ‘কত করে জোড়া দিচ্ছ?’
রতন শুনল মেয়ের গলা আর দেখল হাতের চামড়ার রং কালো।
‘দু-আনা জোড়া।’
‘ইসস এইটুকু টুকু কিনা দু-আনা জোড়া, ছ পয়সা জোড়া করো, তাহলে দু-জোড়া নোব।’
‘দু-আনা জোড়া কি বেশি বললাম নাকি? অন্য পেয়ারাওলার কাছে যান দশ পয়সার কম দেবে না।’
রতন একজোড়া বেছেছে। দরাদরিতে যদি ছ পয়সা হয়, এই আশায় পাশে দাঁড়ানো মেয়েটিকে উসকে দিতে বলল, ‘ছ পয়সাই দাম হওয়া উচিত। আপনি ঠিকই-।’
চিনতে তার ভুল হয়নি। অমন কাচের মার্বেল গুলির মতো ঝকঝকে গোল গোল চোখ কখনো ভোলা যায়।
‘ওই দ্যাখো, উনিও ছ পয়সা-।’ শিবি পাশের লোকটির দিকে তাকিয়েই চোখ কুঁচকোল।
‘চিনতে পারছ?’
হাসি ছড়িয়ে পড়ল শিবির মুখে। ‘কেন চিনতে পারব না। শেষ দেখেছিলুম ন্যাড়া আর এখন কত চুল!…একটু ভারী হয়েছ।’
‘বাবা মারা যাওয়ার পর আট বছর কেটে গেছে। ভারী হতেই পারি।’
‘আট বছর! সময় কীরকম দেখতে দেখতে কেটে যায়…কি গো ছ পয়সায় দেবে?’
‘দু জোড়া নেবেন?’
‘হ্যাঁ।… ওর এক জোড়া, তাহলে মোট সাড়ে চার আনা।’ শিবির হাতে একটা হাতে তৈরি পুঁতির ব্যাগ। তার থেকে রুমাল বার করে পয়সা খুঁজতে আঙুল ঢোকাল। ততক্ষণে রতন পকেট থেকে একটা আধুলি বার করে পেয়ারাওলাকে দিয়েছে। তাই দেখে শিবি কপট রাগে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘দিলে কেন? ভেবেছিলুম অ্যাদ্দিন পর দেখা হল, তোমাকে খাওয়াব।’
শিবির চোখ একই রকম রয়ে গেছে। বাবার মারা যাবার খবর শোনার সময়…’সেদিন বানিয়ে যা বলেছিলে তাই সত্যি হল’ …ওর চোখ এমন করে বড়ো হয়ে উঠেছিল। রাগে, দুঃখে, খুশিতে এই চোখ দুটো একই রকম ভাষায় কথা বলে ওঠে।
‘আমিও তো ভেবেছি তোমাকে খাওয়াব।’
‘এতদিন পর দেখা হলে আরও ভালো জিনিস খাওয়াতে হয়। আমার কাছে পয়সা থাকলে সন্দেশ খাওয়াতুম।’ শিবি তিনটে পেয়ারা ব্যাগের মধ্যে রাখল।
‘খাওয়াব, চলো।’ রতন ফেরত পয়সা হাতে নিয়ে গুনতে শুরু করল।
‘আজ নয়। আমার তাড়া আছে। তুমি এখন করছ কী?’ পেয়ারায় কামড় বসাল শিবি। রতন দাঁতগুলো দেখল খইয়ের মতোই রয়েছে। ‘বেশ ডাঁসা, খেয়ে দ্যাখো।’
‘চাকরি করছি, এই তো এখানে বর্ধন প্রেসে।’ রতন যেদিকে হাতটা তুলল শিবি মুখ ঘুরিয়ে সেই দিকে তাকাল।
‘কদ্দুরে, চলো দেখে রাখি।’
‘চলো।’
হাঁটতে হাঁটতে শিবি বলল, ‘তোমার পরীক্ষা ভালো হয়েছিল তো?’
‘হয়েছিল।’
‘আমার মন বলেছিল পরীক্ষা ভালো হবে। তারপর আর পড়োনি?’
‘না। চাকরিটা পেয়ে গেলুম।…তোমার খবর কী, এখন করছ কী?’
‘কিচ্ছু না। লেখাপড়া জানি না, জানলে চাকরি করতুম।’
‘মা?’
‘সেই একই কাজ করছে আয়াগিরি…লোককে বলে নার্সিং। আমাকেও এই কাজে ঢোকাতে চেয়েছিল। লোকের গু-মুত পরিষ্কার করা আমার দ্বারা হবে না বলে দিয়েছি।’
‘এখানে কী জন্য এসেছিলে?’
‘মহাজনের কাছে। বাড়িতে বসে রুমাল হাতে সেলাই করি। মাল দিতে এসেছিলুম বউবাজারে। বড়ো একঘেয়ে কাজ, চোখ টনটন করে।’ পেয়ারাটা শেষ হয়ে গেছে, শিবি আঁচলে হাত মুছল। রতন লক্ষ করল শাড়িটা তাঁতের, হাতের দুগাছা চুড়ি বোধহয় ব্রোঞ্জের। রুপোর আংটিতে লাল পাথর, দেখে বোঝা যায় পাথরটা নকল। নখে রং।
‘সেই বাড়িতেই আছ?’
‘তা ছাড়া আর কোথায় থাকব! পঁচিশ বছর আমরা ভাড়া আছি। এই বাড়িতেই জন্মেছি। …আর কদ্দুর?’
‘ওই তো, সাইনবোর্ডওলা বাড়িটা, ওর দোতলায়।’ রতন আঙুল দিয়ে ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডটা দেখাল। শিবির মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝে গেল পড়তে পারছে না। ‘বর্ধন প্রেস লেখা রয়েছে।’
‘তোমার নাম করলে দেখিয়ে দেবে?’
‘ওই দরজা দিয়ে ঢুকে যাকেই বলবে রতন রায়ের কাছে যাব, সেই সিঁড়ি দেখিয়ে দেবে। ছ-টা সাতটা পর্যন্ত থাকি।’
শিবি চলে যেতেই রতন প্রেসের দিকে পা বাড়িয়েছে। সেই সময় সঞ্জিতবাবুর চায়ের দোকান থেকে ‘রতন’ বলে ডেকে বেরিয়ে এল অমিয়। কানের কাছে চুল পেকেছে। পেটটা থলথল করছে চর্বিতে। তালু থেকে মৌরি মুখের মধ্যে ছুঁড়ে দিল।
