হাঁটতে হাঁটতে সে উমা টি স্টোর্সের সামনে পৌঁছল। দোকানে তালা ঝুলছে। এই সময়ে দোকানে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকত বাবা কিংবা টাইপরাইটারে খুটখাট করত। খদ্দের খোঁজা হচ্ছে। যে কিনবে সে কি চায়ের দোকানই রাখবে? রতন কয়েক পা হেঁটে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। রমলা লাহিড়ীদের বারান্দার দিকে তাকাল। ঘরের আলো বারান্দায় পড়েছে, টবে চন্দ্রমল্লিকা দেখেছিল, এখন নেই। রমলার মা বলেছিল, ‘ভালো করে প্রিপারেশন করছ তো?’ সে কি কোনো জবাব দিয়েছিল! বোধহয় না। রমলারা কি জানতে পারবে ভূগোল পরীক্ষয়া সে টুকতে গিয়ে ধরা পড়েছে, সে খারাপ ছেলে, পরীক্ষায় ফেল করবে! তার সঙ্গে কোনোদিন যদি রমলার বা তার মায়ের দেখা হয়ে যায়! ওরা কি তাকে জিজ্ঞাসা করবে, কেমন রেজাল্ট হল?…যোগেশবাবু বলেছে, ‘ওর কলেজে পড়া উচিত।’ একটা কষ্টের হাসি রতনের মুখে ফুটে উঠল। রমলাদের দেখতে পেলেই লুকিয়ে পড়ব যেভাবে পাড়ার লোকেদের দেখলে লুকোই। তবে লোকে বেশিদিন কোনো ব্যাপারই মনে করে রাখে না। তরুণ পাঠাগারের সেক্রেটারিকে বলে দিতে হবে, আর সে লাইব্রেরিতে যেতে পারবে না।
নব মিত্র লেনের মোড়ে ডাক্তার বাড়ির রকে কয়েকটা লোক বসে। দূর থেকে তাদের দেখে রতন সিঁটিয়ে গেল। পাড়ার বয়স্ক লোক, ওদের সামনে দিয়েই তাকে যেতে হবে। ওরা নিশ্চয় জানে, বাড়ির কারুর কাছ থেকে নিশ্চয় শুনেছে। মুখটা কঠিন করে, পরোয়া করি না ভাব মুখে ফুটিয়ে সে লোকগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। তার দিকে কেউ তাকাল না দেখে স্বস্তি বোধ করল।
যা আশা করেছিল, ছুটে এল উমা আর মানসী। ওদের চোখে যে প্রশ্নটা রয়েছে রতন তা পড়ে নিয়ে জবাব দিল হাসি দিয়ে।
‘হয়ে গেছে।’
‘চাকরি হয়েছে!’ উমা এমন ভাব করল, যেন না হবারই কথা ছিল।
‘জ্যাঠামশাই কাল থেকে যেতে বলেছে।’
উমা দু-হাত কপালে ঠেকাল। ‘কাকা ওঘরে রয়েছে, গিয়ে বল।’
‘কী কাজ করতে হবে রে রতু?’ মানসীর প্রশ্ন।
‘অনেক রকমের কাজ। অফিসে বসে আবার বাইরে ঘুরেও।’ রতন জামা খোলায় ব্যস্ত থেকে বলল। সারাদিনের কাজের ফিরিস্তি দেবার ইচ্ছা তার নেই, শরীর বেশ ক্লান্ত।
‘তোকে কী জিজ্ঞেস করল? …ওনার কথা বলল?’
‘বলল। বাবার খুব প্রশংসা করল। বাবার কাছে কেউ হাত পাতলে ধার করেও নাকি তাকে টাকা দিত।’ আড়চোখে রতন দেখল মার মুখ ঝলমল করে উঠল।
‘খুব বড়ো আপিস?’ মানসীর প্রশ্ন।
‘খুব বড়ো নয়। তবে প্রেসটা বড়ো। অফিসে জ্যাঠামটাই আর রবিবাবু নামে একটা লোক। আর একটা লোকও কাজ করে, সে আজ আসেনি অসুখ হয়েছে।’
‘খেয়েছিস কিছু?’
‘একটা টাকা দিয়েছিল, ভাত খেয়েছি।’
‘কী কাজ করলি?’ মানসীর প্রশ্ন।
‘একটা লেখা কপি করলুম। সেটার প্রুফ নিয়ে উদয়াচল বলে একটা পত্রিকার অফিসে গেলুম। প্রুফটা কারেকশন করে দিল, সেটা নিয়ে আবার ফিরে এলুম।’ ধুতি খুলে রতন আন্ডারওয়ার পরা অবস্থায় খাটে বসল। তার ইচ্ছে করল কাকা তাদের সম্পর্কে যা বলে এসেছে সেগুলো বলতে। কিন্তু বলল না। শুনলে মজা নাও পেতে পারে। তা ছাড়া কাকা চটে যেতে পারে। এখনও বহুদিন তাদের কাকার দয়ার উপর নির্ভর করে থাকতে হবে।
‘কাকার সঙ্গে দেখা করে আয়। …হ্যাঁ রে কত দেবে বলল?’
রতন জবাব দেবার আগে ভেবে নিল। মাকে বলা মানেই কাকাকেও বলা। মাইনের টাকা কাকার হাতেই তুলে দিতে হবে। এখনকার মতো তখনও প্রতি ব্যাপারে কাকার কাছে হাত পেতে চাইতে হবে। এটা আর সে চায় না। কিছু টাকা সে নিজের কাছে রাখবে।
‘বলল তো ষাট টাকা আপাতত দেবে।’ রতন কুড়ি টাকা সরিয়ে রেখে যে গ্লানিটুকু বোধ করল সেটা কাটিয়ে দিল এই ভেবে, চুরি তো করছি না, এটা নিজের পরিশ্রমের টাকা।
বিষ্ণু বিছানায় শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। কাগজটা দুলাল চাটুজ্জের। উপরে গিয়ে সে কাগজ নিয়ে আসে। মুখের সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে বিষ্ণু বলল, ‘হল কিছু?’
‘হ্যাঁ।’
‘প্রেসের কাজ?’
‘না, অফিসের।’
‘আমাদের সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেসটিজ্ঞেস করল?’
‘না।’
‘কত দেবে বলল?’
‘ষাট টাকা।’ বলার পর রতনের মনে হল কাকা যদি বর্ধন প্রেসে গিয়ে মাইনের অঙ্কটা যাচাই করে?
‘আমি এটাই ভেবে ছিলুম। আমাদের অফিসে পিওনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট হল সত্তর টাকায়।’
কাকা ভেবে রেখেছিল সে পিয়নের পর্যায়ের একটা চাকরি পাবে। রতনের বুকটা দমে গেল। তাকে পিয়নের থেকে উঁচু জায়গায় রাখার কথা কাকা ভাবতে পারে না।
‘দোকানটার একটা খদ্দের পেয়েছি। চার হাজার অফার করেছে, টেলারিং দোকান করবে। আমি বলেছি ছ-হাজার, মনে হয় পাঁচ হাজারে রফা হবে।’
রতন চুপ করে রইল। তার কিছু বলার নেই।
‘দুটো দায় ছিল আমার ওপর তার একটা আজ চুকে গেল, বাকি রইল মানুর বিয়েটা। এবার থেকে তোকে নিজেই নিজের পথ দেখে নিয়ে চলতে হবে। রোজগেরে হওয়া মানে সাবালক হওয়া। চাকরিটা যাতে থাকে সেইভাবে চলবি আর অন্য কিছু করার তো যোগ্যতা তোর নেই, এটাই তোর সম্বল। একটা যে ভুল করেছিস তার খেসারত তো দিতে হবে। আর যেন ভুল কাজ করিসনি। বি এ পাশটা করতে পারলে বলার মতো একটা চাকরি পেতিস।… বরাত।’
রতন মাথা নামিয়ে মেনে নিল কথাটা। সে এরপর থেকে বরাতের উপর নির্ভর করে সংসার ও সমাজের একধারে সরে গিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট শান্ত একটা কোণ বেছে নিজের মুখোমুখি হয়ে দিন কাটাতে শুরু করল। কলকাতা শহরে, ভারতে, বিশ্বে কত কী ঘটনা ঘটে চলেছে সে তাতে আগ্রহী হয় না, ঘটনাগুলো তার মধ্যে সাড়া জাগায় না। বর্ধন প্রেসে যায়, ফেরার পথে চৈতন্য লাইব্রেরি থেকে বই বদল করে। অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ে। মানসীর বিয়ে হয়েছে বেহালায়। এখন ঘরে তারা মাত্র দুজন, মা আর ছেলে। উমা কথা কম বলে। রতন সেজন্য মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ। যেকোনো বিষয়ের বই তাকে আগ্রহী করে। সে অক্ষরের নীরব রাজ্যে ভ্রমণ করতে ভালোবাসে। রেডিয়ো, সিনেমা বা খেলার মাঠ তাকে টানে না। যৌবনেই সে যেন প্রবীণ হয়ে পড়েছে। বাড়ি থেকে সে বেরোতে চায় না, তবু মাকে নিয়ে মাঝে মাঝে যেতে হয় দিদির বাড়ি কিংবা দক্ষিণেশ্বরে কালী দর্শন করাতে। দিদিকে তার সুখী মনে হয়, এখন সে দুই ছেলের মা।
