‘আজই।’
‘অ।’ লাইনের কী বোর্ডে আঙুল টিপতে টিপতে অমিয় বলল, ‘অনেক পণ্ডিতের পণ্ডিতি তো দেখেছি। সব ধরা পড়ে এখানে। কেউ ইস্কুলে ভালো করে ব্যাকরণটাও পড়েনি আর বি.এ., এম এ পাশ করে বসে আছে। কী করে যে করে! তুমি এসব নিয়ে বেশি ভেবো না, তোমার কারেকশন নিয়ে ট্যাঁ ফোঁ করবে তো নাই বরং তা খাইয়ে দেবে।’
‘আমি বরং কপিতে ‘তা’-টা বসিয়ে দিই।’
অক্ষয় দুপুরে বাড়ি গিয়ে ভাত খেয়ে, ঘুমিয়ে আবার বিকেলে আসে। তার আসার আগেই রবি উদয়াচলের ঠিকানা দিয়ে, রতনকে পাঠিয়ে দিল। বেশি দূরে নয়, বৌবাজারে একটা বাড়ির দোতলায় উদয়াচলের দফতর। হেঁটে পনেরো মিনিটের পথ; সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কেও লেখা থাকে এই মাসিক পত্রিকায়।
একটা লম্বা ঘরে দুটো টেবিল, একটা বেঞ্চ আর ছড়ানো চেয়ারে পাঁচ-ছজন লোক বসে কথা বলছে। সকলেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা। একজনের কাঁধে পাট করা চাদর। সবাই বয়স্ক, গম্ভীরদর্শন। দেখে রতনের সমীহ জাগল। মৃদুস্বরে সে বলল, ‘প্রুফ এনেছি।’
কোণের টেবিলে বসা লোকটি শুধু হাত বাড়াল। রতন তার হাতে কপি সমেত প্রুফ তুলে দিল। কপি খুলেই ভ্রূ কোঁচকাল। কয়েক লাইন পড়ে রতনকে বলল, ‘কে কপি করেছে?’
‘আমি।’ রতন ভয় পেল গম্ভীর গলা শুনে। এই লোকটিই বোধহয় যোগেনবাবু!
‘বসো।’ লোকটি বেঞ্চের দিকে আঙুল দেখিয়ে প্রুফ সংশোধন শুরু করল। একটু পরে মুখ তুলে বলল, ‘প্রুফে দেখছি কৃচ্ছ্র আর কপিতে তার সঙ্গে একটা ‘তা’ জুড়ে দেওয়া, ব্যাপার কী?’
রতনের কপাল ঘেমে উঠল। গলা শুকিয়ে আসছে। প্রথম দিনেই সে নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে বসেছে। কী দরকার ছিল পাকামো করার। মাছি মারা কেরানির মতো কপি করলে এই ঝঞ্ঝাটে পড়তে হত না।
‘লেখায় কৃচ্ছ্রতা ছিল কপি করার সময় মনে হল ‘তা’-টা ভুল তাই বাদ দিয়েছিলুম। পরে মালিক বললেন, লেখায় যেমন যেমন আছে তেমনি কপি করতে। ততক্ষণে কম্পোজ হয়ে গেছে তাই কপিতে ‘তা’ জুড়ে দিয়েছি।’ রতন ক্ষমাপ্রার্থীর মতো তাকিয়ে রইল।
‘ও ভূপেশবাবু, কৃচ্ছ্র না কৃচ্ছ্রতা কোনটা কারেক্ট?’
‘কৃচ্ছ্রতা ভুল। বেশির ভাগ লোকই এই ভুলটা করে।’ কাঁধে পাট করা চাদর রাখা লোকটি বলল। ‘জিজ্ঞেস করলেন যে, ভুল করেছেন নাকি?’
‘লেখাটা আমার নয়।’
সংশোধিত প্রুফ নিয়ে সন্ধ্যাবেলায় রতন ফিরে এল বর্ধন প্রেসে। অক্ষয় যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ‘যোগেনবাবু একটু আগে ফোন করেছিলেন। তোর খুব প্রশংসা করলেন। আমি বললুম আমার বন্ধুর ছেলে, এবার ম্যাট্রিক দিয়েছে। বাবা মারা গিয়ে খুবই দুরবস্থায় পড়ে আমার কাছে এসেছে। শুনে বললেন, চাকরি না করে ওর কলেজে পড়া উচিত।’
রতনের ‘তোর’ শব্দটা ভালো লাগল। সকালে ‘তুমি’ বলেছে অক্ষয়। বোধ হয় যোগেনবাবুর প্রশংসা খুশি করেছে। রতনের মনে হচ্ছে এখানে তার চাকরি হবে। ‘তুই’ করে বলাটা সেই রকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘শোন, কাল থেকে কাজে আয়। তোকে মেশিনে লাগাব না। বাইরে এখানে ওখানে যাওয়ার, বিলের তাগিদ দেওয়ার, আদায় করার ছোটোখাটো অনেক রকমের কাজ আছে। প্রুফ দেখাটাও শিখে নিস।’
রতন উৎসুক হয়ে পড়ল আসল কথাটা জানার জন্য, কত মাইনে দেবে? সংকোচবশত জিজ্ঞাসা করতে তার বাধল।
‘তোর ঘাড়ে তো এখন অনেক দায়। মায়ের যা রোগ তাতে চিকিচ্ছেতে অনেক টাকা লাগবে। ক্ষয় রোগ বড়ো মারাত্মক, ক্যাম্বেলে আমার এক চেনা চেস্ট স্পেশালিস্ট আছে ডাক্তার মাইতি, চিঠি লিখে দোব, মাকে দেখিয়ে আনিস।’ অক্ষয় বলে যাচ্ছে আর রতন হতভম্ব হয়ে শুনছে। নিশ্চয় কাকার চালাকি। মায়ের রোগ হয়েছে বলে সহানুভূতি আদায়ের ফিকির। আরও কী কী বলেছে কে জানে!
‘দুখ্যু হল শুনে তোর দিদির কথা। মায়ের দয়ায় মুখটা তো গেছে একটা চোখও গেল! য়্যা, বিয়ে হবে কী করে? ওকে তো সারা জীবন তোকেই দেখতে হবে।’
দিদিকে ওপরের অন্ন পিসি ভাবতে রতনের কষ্ট হল। রাগও হল কাকার উপর। তার দিদি মায়ের মতোই সুন্দরী আর তাকে কিনা কুচ্ছিত বানিয়ে দিল একটা কাজ পাওয়ার আশায়।
‘এখন আশি টাকা দোব। তোর কাজকম্মো দেখি আগে, পরে বাড়াব। এত টাকা এই বাজারে কেউ দেবে না, খোঁজ নিয়ে দেখিস।…খুশি তো?’
রতন অভিভূত। সে চট করে অক্ষয়কে প্রণাম করে বলল, ‘হ্যাঁ জ্যাঠামশাই।’
‘জ্যাঠামশাই’ সম্বোধনে অক্ষয়ের মুখে আপত্তি ফুটল না। বন্ধুর ছেলে, ভদ্র, শান্ত বুদ্ধিমানও এবং মুখটি আকর্ষণীয় রকমের মিষ্টি। পণ্ডিত লোকের ভুল ধরেছে! তার মনে হয়েছে ছেলেটা সৎ। এমন ছেলেই তার দরকার, প্রেসে বড্ড চুরিচামারি হয়। সংসারের বোঝাটা বড়ো অল্প বয়সে ঘাড়ে নিতে হল বলে অক্ষয় কিছুক্ষণের জন্য বিষণ্ণ বোধ করে রতনের জন্য।
বারো আনা খরচ হয়েছে মাছ-ভাত খেতে, পকেটে চার আনা রয়েছে। রতন হেঁটে না ফিরে বাসে উঠল শেয়ালদা থেকে। এক আনার টিকিট কেটে নামল হরিশা-র বাজারের সামনে। সেখান থেকে গ্রে-স্ট্রিট ধরে দশ-বারো মিনিট হাঁটলেই বাড়ি। সে ঠিক করল রোজ হেঁটেই যাতায়াত করবে। এক-দু মাইল হাঁটা কিছুই নয় তার কাছে। তাতে রোজ দু আনা বাঁচবে। মাসে তিন টাকার উপর। তাতে একজোড়া চটি কেনা যাবে। কাকার কাছে চাওয়া এবার বন্ধ হবে। এই বন্ধ হওয়ার কথাটা মনে আসতেই রতনের শরীর থেকে শ্রান্তির ভাবটা উবে যেতে শুরু করল। হালকা লাগল নিজেকে। কীসের যেন অদৃশ্য একটা বাঁধনে সে বাঁধা ছিল, সেটা এবার খুলে যাবে। আশি টাকা অবশ্যই তার নিজের জন্য খরচ করা হবে না, টাকাটা কাকার হাতেই তুলে দিতে হবে। অক্ষয় বর্ধনকে মিথ্যে কথা বলে ওর মন ভিজিয়ে দিয়েছিল বলেই হয়তো চাকরিটা সে পেল। কাকার এইসব বুদ্ধি খুব মাথায় খেলে-নিজে বিয়ে করেছে আলাদা সংসার আছে, মায়ের ক্ষয় রোগ, দিদির কুচ্ছিত মুখ বিয়ে হবে না। রতনের এখন আর রাগ হল না, বরং মজাই পেল। জ্যাঠামশাই যদি এইসব মিথ্যে কথা ধরে ফেলে? সে এতক্ষণ যে স্বাধীনতার আস্বাদ পাচ্ছিল তার খানিকটা তেতো হয়ে গেল।
