‘গোলকের বউ নিল?’
‘নাঃ।’
বাচ্চচা ছেলেটির হাতে রজনীগন্ধার একটি ডাঁটি। সেটা নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকছে। চোখ দেখে মনে হচ্ছে পুলকিত। এধার ওধার তাকিয়ে গুটিগুটি হাত বাড়াল আর একটি ডাঁটি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।
তারকের বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। মরবে জানার পর ছেলেকে পরিমল কাছে কাছে রাখত। ছ-সাত মাস মাত্র সময় পেয়েছিল। মা প্রায়ই বলত, তারু অত বাইরে বাইরে থাকিস কেন? পরিমল কবিতা পড়তে গেলেও ছেলেকে নিয়ে যেত। নিশ্চয় ছেলেকে জানায়নি যে সে পিতৃহীন হতে চলেছে। লুকিয়ে পরিমল নিশ্চয় কাঁদত, আর কোনোদিন ছেলেকে দেখতে পাবেনা ভেবে।
তারকের মনে পড়ল কাল ইঞ্জেকশন নেবার সময় তার ভয় করেছিল। তখন কি অমুর কথা ভেবেছিলুম? মনে করতে পারল না। হয়তো অমুকে ভালোবাসি না কিংবা মরার ভয়টা সত্যিকারের ছিল না। তারক বক্তৃতামঞ্চের কিনারে বসা পরিমলের ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকল। এখন একটা কবিতা পড়া হচ্ছে, পরিমলেরই লেখা। ছেলেটি কিছু শুনছে না। পিটপিট করে এধার ওধার তাকাচ্ছে আর হাতটা বাড়িয়ে রেখেছে ফুলের দিকে। তাল বুঝে একটা হাতিয়ে নেবার জন্য। ও জানে না, আজ কেউ ওকে বকবে না। সবাই আহা বলার জন্য তৈরি হয়েই এসেছে। বাবার মৃত্যুটা ও চোখে দেখেছে কিনা কে জানে। হয়তো ঘুমিয়েছিল পাশের ঘরে। পরিমল মরার সময় নিশ্চয় চেয়েছিল ওকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে। কাল মরে গেলে অমুর জন্য কিছু ভাববার সময়ই পেতুম না। কারোর জন্যই না। শীতের ভোরে ঘুম ভাঙিয়ে মায়ের জন্য ডাক্তারের বাড়ি যেতে বলায় বাবার উপর ভীষণ বিরক্তি লেগেছিল। এই ছেলেটা তিরিশ বছর পর কতটুকু আর বাবাকে মনে করতে পারবে! তিন-চার খানা বই আর ছবি ছাড়া পরিমলের আর কী থাকবে! অটোগ্রাফ ব্যাটটা আলমারির পিছনে রাখা আছে। ওটা দিয়েই শেষ সেঞ্চুরি করেছিলাম, মহামেডানের সঙ্গে লিগের খেলায়। অমু বড়ো হয়ে ছবিটা দেখবে। ওর কি কখনো মনে পড়বে ডাক্তারখানায় কে একজন গাল টিপে বলেছিল-টেস্ট খেলতে হবে, বুঝেছ?
এই মুহূর্তে অমুকে দেখার জন্য তারকের ভীষণ ইচ্ছে করতে লাগল। সিদ্ধান্ত নিল, কালকেই দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে ওদের আনব। পরিমল ক্যানসারে মরেছে, কিন্তু আমাকে সেরে উঠতেই হবে। ঘড়ি দেখে চমকে উঠল তারক। ন-টা! প্রণবকে দেখতে পেল না। কিন্তু আর সে অপেক্ষা করল না। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল শোকসভা থেকে। ট্রামে কিংবা বাসে পৌঁছতে কম করে পঁচিশ মিনিট লাগবে। ডাক্তারখানাটা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে ততক্ষণে।
বেরিয়ে এসে দেখল চারদিক থমথম করছে। রাস্তায় কাপড়ের দোকানগুলো বন্ধ, ফলে তাদের আলোগুলো না থাকায় রাস্তা অন্ধকার। গোলদিঘির ওপারে ইউনিভার্সিটি বাড়ি, প্রেসিডেন্সি কলেজ অতিকায় জন্তুর পিঠের মতো দেখাচ্ছে। ট্রাম-বাস বন্ধ। কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে পুলিশের দুটো ভ্যান দাঁড়িয়ে। কিছু লোক, সন্তর্পণে দ্রুত চলাচল করছে। তারক একজনকে জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, ‘আধঘণ্টা আগে শেয়ালদায় ফায়ারিং হয়েছে। সাতটা ট্রাম, দুটো স্টেট বাস পুড়েছে। বাড়ি চলে যান শিগগিরি।’ হনহনিয়ে লোকটা গলির মধ্যে ঢুকে গেল।
তারক ঘড়ি দেখল এবং উদভ্রান্তের মতো রওনা হল। একটা খালি ট্যাক্সি দ্রুত যাচ্ছিল, হাত তুলতেই ড্রাইভার বলল, ‘শ্যামবাজার পর্যন্ত যাব।’
‘তার বেশি আমিও যাব না।’ বলতে বলতে দরজা খুলে উঠে পড়ল তারক। এই সময় এমন এক সহৃদয় ট্যাক্সিওলা কলকাতায় অকল্পনীয়।
ডাক্তারখানায় পৌঁছে দেখল একটা পাল্লা বন্ধ, অন্যটা আধভেজানো। তারক সন্তর্পণে ঠেলল।
‘আজ এত দেরি করলেন। বন্ধ করে চলেই যাচ্ছিলুম।’
যুবকটি উঠে দাঁড়াল নিশ্চিন্ত মুখে। তারকও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ট্যাক্সি নিয়ে তাহলে ঠিকই করেছি। অবশ্য অত তাড়াহুড়ো না করলেও চলত। গালতোবড়োনো, চওড়া চোয়াল বুড়োটা দশটা পর্যন্ত থাকে। তাহলে একটা টাকা এ ছেলেটা পায়না। সেজন্য এক টাকা তিরিশ পয়সা খরচ করেও তারকের আফশোস হচ্ছে না।
‘কিগো তারক চিনতে পাচ্ছনা?’
ঘরের কোণে বেঞ্চে যে একটা লোক বসে, তারক লক্ষই করেনি। ভ্রুকুটি করে সে তাকাল। গেরুয়া পাঞ্জাবি থেকে স্যান্ডাল পর্যন্ত লোকটা এমন একটি রেখা যা অমু ছাড়া আর কারোর পক্ষে আঁকা সম্ভব নয়। দাঁত, ঠোঁট, নাক, থুতনি, কোমর, পিঠ কোনোটাই সিধে নয়।
‘আমাকে চিনলে না? আমি শম্ভু সরকার।’
‘ওহ শম্ভুদা। আপনি এখানে যে?’ তারক ওর পাশে বসল। ‘আপনার চেহারা একী হয়েছে!’
‘আর চেহারা। মাঠে যাও?’
‘না। সময় কোথায়?’
‘মাঝে মাঝে আমি অবশ্য যাই। ওরা বলে ছেলেদের দেখিয়ে দেবার কেউ নেই, গিয়ে একটু দাঁড়াবেন, বলেটলে দেবেন। বলব আর কী! দুটো ড্রাইভ করেই ভাবে সি কে, ওয়াজির হয়ে গেছি। আজকাল তো ওদের হিরো হয়েছে সোবার্স। এখনকার ছেলেদের তো বোঝই, কেউ কথা শোনে? তোমরা ছিলে একরকম। এখন কচ্ছ কী?’
‘চাকরি করি। আপনি কি ডাক্তারের জন্য বসে?’
‘না না, এটি হচ্ছে আমার ছেলে।’
পর্দা সরিয়ে যুবকটি তখন তারককে ডাকল। তারক ভিতরে উঠে গেল।
‘টাকাটা এখনই দিন বরং তাহলে বাবাকে বিদেয় করে দি।’ যুবকটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল। তারক তক্ষুনি টাকা দিয়ে দিল।
দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকার সময় শম্ভু সরকার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল, ‘তাহলে চলি তারক।’
