রতন আকাশ থেকে পড়ার ধাক্কাটা মুখ থেকে কোনোক্রমে সামলালো। কাকা বলেছে কি! বউ ছেলেমেয়ে সংসার আছে! করুণা জাগাবার জন্য আর কী কী মিথ্যা বলেছে কে জানে! কাকার উচিত ছিল তাকে সব বলে তৈরি করে দেওয়া।
‘কিন্তু তোমাকে এখানে কী কাজ দোব।’ অক্ষয় চিন্তায় পড়ল এবং রতনের উৎকণ্ঠা বাড়ল। ‘আচ্ছা বসো, রবিবাবু আসুক।’
টেবলের সামনে দুটো চেয়ার। চেয়ার গণ্যমান্যদের জন্য, অফিসে আসা বাইরের বড়ো বড়ো কাজের লোকেদের বা অফিসের পদস্থদের জন্য। রতন জানে সে ভিক্ষার্থীর মতো এসেছে। মালিকের সামনে বসাটা উচিত হবে কি না ঠিক করতে পারল না। রবির টেবিলের পাশে একটা টুল রয়েছে দেখে সেটায় গিয়ে বসল আর তখনই রবি ফিরে এল। হাতে একটা পাণ্ডুলিপি।
‘এই দেখুন, অমিয় বলছে হাতের লেখা পড়া যাচ্ছে না। কম্পোজ করতে সময় লাগবে।’ রবি কাগজগুলো অক্ষয়ের টেবিলে রাখল।
‘তাই তো! এ তো দেখছি পড়া মুশকিল। লেখাপড়া জানা লোকেদের হাতের লেখা এত খারাপ হয় কী করে!’ অক্ষয় কাগজগুলো থেকে মুখ তুলে রতনের দিকেই তাকালেন, উত্তরটা যেন ওর কাছেই চান। রতন দূর থেকে তাকিয়ে হাতের লেখার কিছুই বুঝল না।
‘অমিয়কে বলুন না একটু চেষ্টা করতে। অত বড়ো একটা ম্যাগাজিন যোগেশবাবুর মতো নামি সম্পাদক, ওর কাছে তো আমার কথার একটা দাম আছে। বলেছি বিকেলেই প্রুফ পেয়ে যাবেন… বলুন না। আচ্ছা আপনি অমিয়কে ডেকে আনুন, আমি ওকে বলছি।’
রবি বেরিয়ে গেল। অক্ষয় বিব্রত চিন্তিত স্বরে বলল, ‘কী কাণ্ড দ্যাখো তো। একটা সামান্য ব্যাপার অথচ কাজটা আটকে রইল… হাতের লেখা পড়তে পারছি না। আরে কম্পোজিটরের কাজ করতে হলে সব রকমের হাতের লেখার সঙ্গে রপ্ত থাকতে হবে। ডেঁয়ো পিঁপড়েকে কালিতে চুবিয়ে সাদা কাগজে ছেড়ে দিলে ভালো কম্পোজিটর সেই আঁচড় থেকে রবিঠাকুরের পদ্য বার করে নেবে… আরে এ আর এমনকী নোংরা কপি।’ অক্ষয় পাণ্ডুলিপিটা তুলে টেবিলে আছড়ে রেখে দিল।
রতন নিছকই কৌতূহলের বশে বলে ফেলল, ‘আমি একটু দেখব?’
‘দ্যাখো।’
উঠে গিয়ে রতন প্যাডের কাগজে লেখা গোটা দশেক পাতার পাণ্ডুলিপিটা তুলে নিল। অক্ষরগুলো অতি খুদে তাও জড়িয়ে লেখা। প্রচুর কাটাকুটি। মার্জিনে লাইন টেনে বসানো হয়েছে একটার উপরে আর একটা নতুন বাক্য। দুই লাইনের মাঝে নতুন কথা বসানো, যা প্রায় পড়া যায় না। নোংরা করে লেখা হলেও রতন পড়তে পারছে। ‘পূর্বাচল’ লিখতে গিয়ে সে এমন পাণ্ডুলিপি পেয়েছে।
‘এই যে অমিয়, কী ব্যাপার!’
অক্ষয়ের গলা শুনে রতন চোখ তুলল। প্যান্টের মধ্যে গোঁজা শার্ট, ব্যাকব্রাশ করা চুল, স্বাস্থ্যবান, বছর পঁয়ত্রিশের একটি লোককে সে দেখল। দুনিয়াকে পরোয়া না করার চাহনি লোকটার চোখে।
‘স্যার, ওই হাতের লেখা কম্পোজ করতে রাত দশটা বেজে যাবে, তার আগে পারব না। আর নয়তো ফ্রেশ নতুন করে লিখে দিন।’
‘নতুন করে কাকে দিয়ে এখন আমি লেখাব!’ অক্ষয়ের মুখে আতান্তরে পড়ার ছাপ! ‘রবিবাবু পারবেন?’
রবির মুখ অসহায় দেখাল। ‘আমি…আমি-।’
‘আমি পারব।’
ছোটো দুটো শব্দ মুখ থেকে বার করে রতন তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য রাস্তা তৈরি করে নিল তখনই। সে যখন খালি টেবিলটায় কপি করতে বসল তখন তিনটি লোক তার পিছনে দাঁড়িয়ে। প্রথম প্যারা শেষ হতেই অক্ষয় বলল, ‘বাঃ, সুন্দর হাতের লেখা।’ শুনে শিরশির করে উঠল পিঠ। একই কথা সে শুনেছে তারাশঙ্করের মুখ থেকে।
‘কী অমিয়, পড়তে পারবে তো এবার?’ রবি বলল, চিমটি কেটে। কথাটা অমিয় কানে না তুলে বলল, ‘যেমন যেমন লেখা হবে কপি পাঠিয়ে দেবেন।’ বলেই সে ঘর ছাড়ল। রতন দ্রুত কপি করে যাচ্ছে। পাশের ঘর থেকে একজনকে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। একটা পাতা শেষ হলেই সে প্রেসে অমিয়র কাছে সেটা পৌঁছে দিয়ে আসছে। দুপুর একটায় রতন শেষ করল। ততক্ষণ অনেক লোক ঘরে এসে অক্ষয়ের সঙ্গে কাজের কথা বলে গেছে, রতন মাথা তোলেনি।
‘কত স্লিপ হল?’ অক্ষয় জানতে চাইল।
‘সাড়ে বারো পাতা।’
‘তোমার তো ভাত খাওয়া হয়নি মনে হচ্ছে।’
‘আমি ভাত খেয়েই বেরিয়েছি।’ রতন নাকেমুখে গুঁজে কোনোক্রমে খেয়েছে। এখন তার খুবই খিদে পাচ্ছে।
অক্ষয় এক টাকার নোট রতনের সামনে টেবিলে রেখে বলল, ‘পাশেই হোটেল আছে খেয়ে এসো। গুপির ছেলে তুমি, আমার কাছে কোনো লজ্জা করবে না। আজ তোমাকে দিয়ে আর একটা কাজ করাব। প্রুফ নিয়ে উদয়াচলের আপিসে যাবে, সেখানে অপেক্ষা করবে, কারেকশন করা প্রুফ নিয়ে এসে নীচে মদন বেরা নামে যে ইনচার্জ আছে তাকে দেবে। আর আমার সঙ্গে দেখা না করে বাড়ি যাবে না।’
মাথা নেড়ে রতন টাকাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে থেমে পড়ল। ‘একটা ভুল ছিল আমি কপিতে ঠিক করে দিয়েছি।’
‘ভুল ছিল! কী ভুল?’ অক্ষয় বলল।
‘লেখা ছিল ‘কৃচ্ছ্রতা সহকারে ব্রত পালন’, কিন্তু কৃচ্ছ্রর পর ‘তা’ হয় না; আমাদের ব্যাকরণ পড়ান হরসুন্দরবাবু বলেছেন। ‘তাই আমি ‘তা’-টা বাদ দিয়েছি।’
‘করেছ কী!’ অক্ষয় প্রায় আঁতকে উঠল। ‘যোগেনবাবু এম এ পাশ, নামকরা লোক, ওঁর লেখায় কলম ছোঁয়ালে আর দেখতে হবে না। উনি যা লিখবেন সেটা বিদ্যাসাগর মশাইও মেনে নেবেন…যাও যাও শিগ্গির ‘তা’ বসিয়ে দিয়ে এসো কপিতে।’
রতন ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দৌড়ে নীচে নেমে গেল। ইতিমধ্যে অমিয় ‘কৃচ্ছ্র’ কম্পোজ করে ফেলেছে। রতনের সমস্যার কথা শুনে টেরিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘কদ্দিন এসেছ?’
