সেটা জানতে পারল দিন দশেক পর, সন্ধ্যায় কাকা যখন ডেকে পাঠাল।
‘অক্ষয় বর্ধনের নাম শুনেছিস, দাদার বন্ধু ছিল?’ বিষ্ণু খাটে ঠেস দেওয়া উঁচু বালিশে পিঠ রেখে পা ছড়িয়ে শুয়ে শান্ত ধীর গলায় বলল। রতন মাথা নেড়ে জানাল নামটা শোনেনি।
‘তোর বাবার সঙ্গে গঙ্গায় সাঁতার কাটত, একসঙ্গে গাঁজা ভাং খেত, বিদ্যা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত। সেই অক্ষয় এখন বৈঠকখানায় বিরাট প্রেসের মালিক। বাপের ছোটো প্রেস ছিল সেটাকেই বড়ো করেছে খেটেখুটে নিজের চেষ্টায়। লক্ষ লক্ষ টাকার কাজকম্মো করে। অক্ষয়ের কাছে গেছলুম, তোকে একটা কিছু কাজটাজ যদি দেয়। যদি বন্ধুর কথা মনে রেখে তার ছেলের জন্য কিছু করে। প্রেসে তো লোকজন লাগেই। লোকটা ভালো, বলল পাঠিয়ে দিতে।’ একটানা কথা বলে বিষ্ণু দশ সেকেন্ডের মতো নীরবতা ঘরে ছড়িয়ে দিল।
‘কাল সকালে যাবি।… বর্ধন প্রেস, বৈঠকখানায় যাকে জিজ্ঞেস করবি দেখিয়ে দেবে, বৈঠকখানা চিনিস?’
‘শেয়ালদায়।’
‘হ্যাঁ। কাল ঠিক দশটায় যাবি, হেঁটে। গাড়িভাড়ার পয়সা আমি দেব না। …গিয়ে বলবি আমি গুপিনাথ রায়ের ছেলে। …হাফ প্যান্ট পরে যাবি না। বাবার যে ধুতি রয়েছে তাই পরে যাবি। আর… যে কাজ দেবে, ঘর ঝাড় দেবার কাজ হলেও নিবি। …যাহ।’
ছোটো ‘যাহ’ শব্দটা রতনকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বার করে দিল আর সেই সঙ্গে তার কলেজে পড়ার স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেল। কাকার কঠিন শান্ত বরফের মতো ঠান্ডা গলা তাকে জানিয়ে দিল এবার তার জীবন কোন পথে যাবে। কাকার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কোনো সামর্থ্য, সাহস বা ক্ষমতা তার নেই। এই সংসার এখন এই একটা লোকেরই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভর দিয়ে চলছে। নির্মমভাবে ব্যর্থতার বোঝা কাকা তার কাঁধে তুলে দেবার ব্যবস্থা করেছে ঠান্ডা মাথায়। প্রতিবাদ করে সে বিপদ ডেকে আনতে চাইল না।
পরের দিন রতন প্রায় আধঘণ্টা হেঁটে দুজন লোককে জিজ্ঞাসা করে বৈঠকখানায় অক্ষয় বর্ধনের প্রেসে পৌঁছল। একতলায় উঠোনের মতো বড়ো একটা জায়গায় বড়ো বড়ো মেশিন। মাথায় অ্যাসবেসটসের ছাউনি। তেল, মোবিলের সঙ্গে লোহা ঘষার গন্ধে একতলা ম ম করছে। রতন কালিমাখা জামা পরা একজনকে জিজ্ঞাসা করে দোতলায় উঠল। ধুতিটা সে ছোটুদার মতো মালকোঁচা করে পরেছে। আলমারি থেকে মা বার করে দিয়েছে, এটা পরে বাবা নিমন্ত্রণ বাড়িতে কি বিজয়ার দিন আত্মীয় বাড়িতে যেত। ধাক্কা দেওয়া চওড়া পাড়, ন্যাপথালিনের গন্ধ লেগে রয়েছে। ধুতিটা উঠে গেছে, টেনেটুনে নামিয়ে সে সিঁড়ির পাশের দরজা দিয়ে ঢুকল।
ঘরটা আকারে তাদের শোবার ঘরের মতোই। রতন দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল। লোহার রড বসানো পুরোনো জানালা। মেঝেয় ধুলো। চওড়া দেয়ালে বহুকালের একটা ঘড়ি, ঝাঁপি কোলে নিয়ে পদ্মফুলের উপর বসে থাকা লক্ষ্মীর রঙিন ছবিওলা ক্যালেন্ডার, লক্ষ্মীর পায়ের পাশে প্যাঁচা। দরজার উপরে ব্র্যাকেটে বসানো চন্দনের ছিটে লাগা গণেশ, গলায় টাটকা একটা গাঁদার মালা। মুখোমুখি দুটি টেবলের একটা খালি। শার্ট পরা, টেরিকাটা একটি লোক মোটা খাতা খুলে পেনসিল দিয়ে টিক দিচ্ছে আর বিড়বিড় করছে। বাঁদিকে একটা বড়ো টেবিল। সেখানে বসা স্থূলকায় লোকটি সাদা পাঞ্জাবি পরা, মাথায় টাক, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। ফরসা, ডান গালে আঁচিল। কাকার দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে মিলে গেল।
অক্ষয় টেলিফোনে কথা বলছে। এক পলক রতনের মুখের দিকে তাকাল। রতন ঢোঁক গিলল।
‘আজ বিকেলেই প্রুফ পেয়ে যাবেন। প্রিন্ট অর্ডার পেলেই… না না, কথা দিচ্ছি প্রুফ এবার ঠিকই পাঠাব, আর ওই সঙ্গে নতুন কপিও হাতে দিয়ে দেবেন। কী করব বলুন, নতুন লাইনো মেসিন, কম্পোজিটারও নতুন। এখনও ঠিক সড়গড় হয়নি। আজই দু ফর্মা প্রুফ পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ ফোন রেখে অক্ষয় ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘রবিবাবু দেখুন তো অমিয় এসেছে কি না। এলে উদয়াচলের কপিগুলো ওকে ধরিয়ে দিন।’ কথা শেষ করে অক্ষয় জিজ্ঞাসু চোখে রতনের দিকে তাকাল। টেরিকাটা লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‘আপনার কাছে এসেছি। আমার কাকা বিষ্ণুচরণ রায় পাঠিয়ে দিলেন।’ কোনোক্রমে কথাগুলো রতন দ্রুত বলে ফেলল।
‘কে বিষ্ণুচরণ রায়?’ অক্ষয় মনে করার চেষ্টা করছে।
‘আমার বাবা গোপীনাথ রায়।’
‘ও ও ও, গুপির ছেলে…তাই বলো। হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার কাকা তো এসেছিল। গুপিকে ছোটো ভাইয়ের মতো দেখতুম। বড়ো ভালো ছিল।’
উমা বলে দিয়েছিল, রতন টেবিল ঘুরে গিয়ে নীচু হয়ে অক্ষয়ের পায়ের দিকে হাত বাড়াল। পাম্প শু-র গোড়ালির একটা ধার ক্ষয়ে বেঁকে রয়েছে, চামড়ায় ফাটা দাগ, মাসকয়েক কালি লাগানো হয়নি। জুতোর উপর হাত বুলিয়ে রতন মাথায় ঠেকাল।
‘থাক থাক…তুমি এখন করছ কী?’
‘ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি, বসে আছি।’ রতনের মনে হল আর কিছু বোধহয় বলার দরকার হবে না। কাকা সবই বলে রেখেছে।
‘হুঁউউ… শুনলুম তো তোমাদের অবস্থা। গুপিটা উড়নচণ্ডে ছিল বটে তবে দিলও ছিল। অভাবে পড়ে কেউ হাত পাতলে ধার করেও তাকে দিত। তোমার কাকাও মনে হল লোকটি ভালো। নিজের বউ ছেলেমেয়ে সংসার সত্ত্বেও দাদার সংসারটাও চালাচ্ছে। এ রকম বড়ো একটা দেখা যায় না।’ অক্ষয়ের কণ্ঠে প্রশংসা উঠে এল।
