‘ওগুলো তোলো।’ নীচু স্বরে বললেন, পরীক্ষা ঘরের পাহারাদার, এই স্কুলেরই শিক্ষক। রতন পাশের ছেলেটির দিকে তাকাল। ছেলেটি তার দিকেই তাকিয়েছিল। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে রাখল নিজের খাতায়। রতন মুখ তুলে তাকাবার চেষ্টা করল। শান্ত, অনুত্তেজিত চোখ পাহারাদারের, যেন ব্যথিতও।
‘তোলো।’
রতন নীচু হয়ে ভূগোল বইয়ের ছেঁড়া চারটে পাতা তুলল। সেগুলো, প্রশ্নপত্র এবং খাতাটা হাতে নিয়ে পাহারাদার বললেন, ‘এসো আমার সঙ্গে।’
সারা ঘরের পরীক্ষার্থীদের চোখ তাকে অনুসরণ করছে শুধু এইটুকুই সে বুঝতে পারল। ঘর থেকে বারান্দা তারপর একতলায় নামার সিঁড়ি। খটখট শব্দটার পিছন পিছন রতন হেডমাস্টারের ঘরে ঢোকার আগে একবার ভেবেছিল পা জড়িয়ে ধরবে কি না। টেবিলে রাখা চশমাটা চোখে দিয়ে স্থূলকায় গোল মুখ হেডমাস্টার জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। ছেঁড়া পাতাগুলো আর প্রশ্নপত্র আর খাতা টেবিলে রেখে পাহারাদার শুধু বললেন, ‘টুকছিল’।
ভ্রূ তুলে হেডমাস্টার রতনের মুখের দিকে তাকালেন। ছেঁড়া পাতাগুলো তুলে নিয়ে খাতাটা খুলে মেলাতে লাগলেন। মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
‘টুকতে গেছলে?’
কণ্ঠস্বরে এবং বলার ভঙ্গিতে রতনের মনে হল লোকটি স্নেহপরায়ণ। তার সর্বনাশ করবে না।
‘আমি টুকিনি স্যার।’
‘এগুলো তাহলে এনেছ কেন, টোকার জন্যই তো?’
রতন চুপ করে রইল।
‘বইয়ের পাতা এনে কোনো লাভ তো হয়নি। এতে যা রয়েছে তার ওপর তো প্রশ্ন আসেনি।’ হেডমাস্টার চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা অপ্রিয় কর্তব্য থেকে রেহাই পাওয়ার হাসি হাসলেন। রতনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে গালে নামল। ‘মিছিমিছি বইটা নষ্ট করলে, সামনের বছর তো দরকার হবে।’ ঝুঁকে খাতাটা তুলে পাতা উলটে পড়তে লাগলেন রতনের লেখা উত্তর। পড়তে পড়তে ঠোঁট বেঁকে উঠল।
‘যাও পরীক্ষা দাও।’ পাহারাদার শিক্ষকটিকে বললেন। ‘নিয়ে যান… দিক পরীক্ষা।’ প্রশ্নপত্র আর খাতাটা এগিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা শব্দ নাক থেকে বার করে নিশ্চিত গলায় বললেন, ‘পাশ করতে পারবে না।’
ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসে রতন মাথা নীচু করে রইল। ঘরে অন্তত জনাকুড়ি ছেলে, অর্ধেকই অন্য স্কুলের, অচেনা। কোনোদিন দেখা হলে তাকে চিনতে পারবে। তার নিজের স্কুলের ছেলেরা বলাবলি করবে, টিচাররা জানতে পারবে। স্যার তো জানবেনই। পাড়ার লোকেরা যদি জানতে পারে! বাড়িতে খবরটা পৌঁছবেই। কাকা কী বলবে? রতনের বুকের মধ্যে থরথর করে উঠল। তার মনে হচ্ছে গরম বাষ্প নাক দিয়ে ঢুকে চোখ দিয়ে বেরোতে চাইছে, সে কিছু আর দেখতে পাচ্ছে না।
তার বাঁ কবজিতে কাকার ঘড়ি, পরীক্ষার জন্য পরতে দিয়েছে। জীবনে এই প্রথম তার ঘড়ি পরা। প্রশ্নের উত্তর লিখতে সময়ের হিসেব রাখার জন্য ঘড়ির দরকার, তাই কাকা নিজে থেকেই দিয়েছে। ‘কোয়েশ্চন পেপার পেয়ে প্রথমে মন দিয়ে সবগুলো পড়বি। যেগুলো সহজ মনে হবে আগে সেগুলোর উত্তর লিখবি।’ রতন শূন্য দৃষ্টিতে খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পিঠে হাত পড়ল। পরীক্ষার পাহারদার ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘বসে থেকো না…লেখো।’
রতন মাথা নাড়ল। সে আর লেখার কথা ভাবতে পারছে না। …’পাশ করতে পারবে না।’…না পারলে তার কী হবে! কারুর কাছে মুখ দেখাতে পারবে না। ‘আমি কলেজে পড়ব’… ‘আগে পাশ কর।’ ‘সেকেন্ড ডিভিশন হবে?’ কাকা শুনলে কী করবে? স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করার জন্য একটা কঞ্চি দিয়ে পিটিয়েছিল। বাবা বলেছিল, ‘মারুক, মারুক…মার খেলে মানুষ হবে।’ দিদি ঘরের জানলা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল যাতে মারের শব্দ কেউ না শুনতে পায়। সে কিন্তু চেঁচায়নি, কাঁদেনি। রাতে দুলাল এসে বাবাকে বলেছিল, ‘মারলে কি লেখাপড়ার মাথা তৈরি হয়? আমার বাবা হপ্তায় একটা করে বেত ভাঙত আমার পিঠে, তাতে কিছু হয়েছে কি!’
‘স্যার পাতা চাই।’
রতনের পিছনের ছেলেটির খাতা শেষ হয়ে গেছে, আরও লেখার জন্য তার কাগজের পাতা চাই। রতনের খাতায় এখনও ছটা সাদা পাতা রয়ে গেছে। কাগজের বাক্সে ভরা দোয়াত তার সামনে রাখা। লিখতে লিখতে কলমের কালি ফুরিয়ে গেলে দরকার হবে তাই সঙ্গে করে আনা। চার দিন পরীক্ষা হয়ে গেছে, একবারও কলমের কালি ফুরোয়নি। চারটে পেপারেই বোধহয় পাশ করে যাবে, ভয় ছিল ভূগোল আর সংস্কৃতে। এখন সে সব ভয়ভাবনার ঊর্ধ্বে। একটা হাসি রতনের মুখটাকে বিকৃত করে দিল। মুখটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠার আগেই সে স্থির করে ফেলল, যা হবার হোক সে বাকি বিষয়গুলোর পরীক্ষা দেবে।
খাতা জমা দিয়ে সবার আগে সে পরীক্ষার ঘর থেকে বেরোলো। স্কুলের যে ক-জন তার সঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছে তাদের মুখোমুখি সে হতে চায় না। বাড়িতে স্বাভাবিকই রইল তার কথাবার্তা আচরণ। সে জানে ঘটনাটা বাড়িতে জানাজানি হবেই। তবু যে ক-দিন সবার দিকে মুখ তুলে কথা বলার ভরসাটুকু পাওয়া যায়।
ভরসাটুকু দিন সাতেক পরই শেষ হয়ে গেল। অনাথ ঘোষ সকালে রতনদের বাড়ি এসে টুকতে গিয়ে ধরা পড়ার কথাটা জানিয়ে দিল। বাড়ির ভিতর ঢোকেনি, সদর দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই বিষ্ণুর সঙ্গে মিনিট তিন কথা বলে চলে যায় ব্যস্ত হয়ে। বাড়িতে ছাত্ররা তার অপেক্ষায় রয়েছে।
রতন ঘরে বসে রয়েছে। সে আন্দাজ করতে পারছে না কাকার প্রতিক্রিয়া কী ধরনের হবে। স্যার চলে যাবার পর কাকা নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। সাড়াশব্দ নেই। এখন অফিস যাবার জন্য চান করার কথা, তারপর খেতে বসা। রতন টের পাচ্ছে কাকা চান করতে গেল। ‘ভাত দাও’ বলল। খেয়ে উঠে অফিস গেল, একবারের জন্যও এ ঘরে এল না, তাকে ডাকলও না। রতনের বুকের মধ্যে জমতে শুরু করল কংক্রিটের চাঙড়। দিদি আর মাকে স্বাভাবিক দেখে সে বুঝল কাকা কাউকে কিছু বলেনি। তার বুকের ভারের সঙ্গে যুক্ত হল আতঙ্ক। কাকা কী করতে চায়?
