‘কীসের খাতা, দেখি।’ শিবি খাতাটা রতনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পাতা ওলটাল। ‘ওরে বাবা কী বড়ো বড়ো অঙ্ক…এগুলো তুমি করেছ?…ইংরিজিতে করতে হয়!’ শিবির স্বরে সমীহ এবং বিস্ময়। রতনের বুকের মধ্যে ছলাৎ করে উঠল।
‘অ্যালজ্যাব্রা বলে ওগুলোকে, তুমি বুঝবে না।’
‘পাশ করে কী করবে?’ …দাঁড়িয়ে কেন, খাটে বসো না।’
রতন পা ঝুলিয়ে খাটে বসল। জানলা দিয়ে স্যারের বাড়ির জানলাটা দেখা যাচ্ছে। সে সরে বসল।
‘ভাবছি জার্মানি যাব। ওখানে প্রচুর চাকরি আছে। আমার পাড়ার গৌর বলে একজন গেছে, ওর দাদা বলল হপ্তায় আড়াই হাজার টাকা মাইনে পায়। …হয়তো বাড়িয়ে বলল, তা হলেও দু-হাজার তো নিশ্চয় পায়। তাই বলে ভেবো না খুব বড়োলোক, ওখানে জিনিসপত্রের দামও খুব।’
‘কীসে করে জার্মানি যাবে, উড়োজাহাজে?’ শিবি খাটে বসল রতনের গা ঘেঁষে। ওর মাথা থেকে সে নারকেল তেলের গন্ধ পেল।
‘হ্যাঁ, প্লেনে।’
‘আমার খুব উড়োজাহাজে চাপতে ইচ্ছে করে।’
হঠাৎই, রতনের ভিতর থেকে কে যেন ঠেলে কথাটা তার মুখ দিয়ে বার করে দিল। ‘ওখানে যদি চাকরি পাই, তোমাকে প্লেনে করে নিয়ে যাব, যাবে?’ সে অধীর আগ্রহ নিয়ে শিবির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘ঠিক?’
‘ঠিক।’
শিবি এবার অদ্ভুত একটা ব্যাপার করে বসল। পাশে ঝুঁকে শব্দ করে রতনের গালে চুমু দিল। একটা হালকা রতনের মাথার মধ্য দিয়ে বয়ে গেল।
‘এমনি এমনি যাব না, বিয়ে করে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।’ চোখ দুটো আধবোজা করে মাথা হেলিয়ে শিবি বলল। রতন বোকার মতো হাসতে শুরু করল।
‘অ্যাই শিবি।’ জানালার বাইরে থেকে মেয়ে গলার ডাক শোনা গেল।
‘কে রে, মংলা?’ শিবি জানালার ধারে গেল।
‘ভেলোদা বলল, চিত্রলেখায় দেবানন্দের বই এসেছে, যাবি তুই?’
রতন দেখল শিবিরই বয়সি বা বছর দুয়েকের বড়ো একটি মেয়ে। রুগণ ফ্যাকাসে রং, সামনের দাঁত দুটো ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে। পরনে মিলের রঙিন ডুরে শাড়ি।
‘কবে?’
‘আজ আড়াইটের শো। যাস তো টিকিট কাটবে, আমিও যাচ্ছি। তুই না গেলে ভেলোদা যাবে না বলেছে।’ মেয়েটি এক চোখ বন্ধ করে ঠোঁট টিপে হাসল।
‘আ হা হা আমি না গেলে যাবে না!’ আদুরে গলা শিবির। ‘তুই তো আছিস, ভেলোদার আর ভাবনা কী?’
‘মেলা দিক করিস না তো, যাবি কি না বল। ভেলোদা দাঁড়িয়ে রয়েছে।’
‘আর কে যাবে?’
‘সোনা আর বাবলু।’
‘বই শেষ হলেই কিন্তু বাড়ি চলে আসব, কোথাও খেতে ঢুকব না।’
মংলা আর দাঁড়াল না। শিবি জানলা থেকে ফিরে খাটে বসল।
‘কে?’
‘আমার বন্ধু, পাড়াতেই থাকে।’
অনেকগুলো কৌতূহল রতনের বুকের মধ্যে থেকে উঠে আসতে চাইছে কিন্তু সে চেপে রাখল। শিবি গায়ে পড়া হতে পারে তাই বলে সে কেন গায়ে পড়ে প্রশ্ন করবে?
‘তুমি এ পাড়ার ছেলেদের চেনো?’ শিবি জানতে চাইল। রতন জানাল, কাউকেই চেনে না তবে যাতায়াত করার জন্য কিছু মুখ চেনে।
‘ভেলোদাকে দেখেছ?…রোগা, লম্বা, সাদা প্যান্ট আর সবুজ গেঞ্জি পরে থাকে। ওদের মিষ্টির দোকান আছে, খুব বড়ো দোকান বিডন স্ট্রিটে।’
‘আমি এখন যাই।’
‘যাবে, আচ্ছা এসো।’
সদর দরজার কাছে এসে শিবি বলল, ‘মন দিয়ে পড়বে কিন্তু।’ রতন মাথা হেলালো। কী জন্যে যেন তার মন ভার হয়ে উঠেছে।
দুপুর দুটোর আগেই রতন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে চিত্রলেখা সিনেমা হলের বিপরীত ফুটপাথে দাঁড়িয়ে রইল। সিনেমা হলের সামনে ভিড়। টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি হচ্ছে। ইভনিং শোয়ের জন্য টিকিট কাউন্টারে লাইন পড়েছে। রতন একটা গলির মুখে বাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ওই দিক থেকেই ওরা আসবে। অবশেষে সে ওদের দেখতে পেল। তার চোখ আটকে রইল শিবির উপর। মংলা নামের মেয়েটা আর দুটি ছেলে, রতনের থেকে বয়সে বড়ো, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে হাঁটছে। তাদের পিছনে শিবি আর বোধহয় সেই ভেলোদা। শিবির পরনে ছাপা সিল্কের শাড়ি। চুল টেনে গোলাপি রিবনে বাঁধা, গোলাপি ব্লাউজ। তার পাশে গা লাগিয়ে হাঁটছে লম্বা রোগা লোকটা। রতন চোখ তীক্ষ্ন করল। বুকের মধ্যে তোলাপাড় হচ্ছে। শিবি সরে যাচ্ছে না, লোকটার স্পর্শ যেন পছন্দই করছে। একবার চোখ পাকিয়ে রাগের ভাব দেখাল, লোকটা দাঁত বার করে হাসল। কী কথা হচ্ছে ওদের মধ্যে? ওরা সিনেমা হলের কাছাকাছি এসে পড়েছে। শিবির কপালের টিপ দেখতে পাচ্ছে রতন। কানে পুঁতির দুল। চোখে বোধহয় সুরমা দেওয়া। পাউডার মাখার জন্য মুখের রঙ একটু ফ্যাকাসে। শিবি সেজেছে, অবশ্যই ওই লোকটার মন ভোলানোর জন্য।
রতনের বুকের মধ্যে কী যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বুকটা খালি হয়ে গেল। সে গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়ে হাঁটতে শুরু করল। এ গলি সে গলি দিয়ে হেঁটে সে পৌঁছল হেদুয়ায়। রেলিং ধরে সে জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে ধীরে তার মাথা শান্ত হয়ে এল। ভাবতে চেষ্টা করল, এত বিষণ্ণ, এত মন খারাপ সে হল কেন? প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পেল না। শিবি তার কে, যে জন্য মনে জ্বালা ধরল! ওকে একটা লোকের সঙ্গে সাজগোজ করে সিনেমা যেতে দেখে? সে উত্তর খুঁজে পেল না। যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না তাই নিয়ে মাথাব্যথা করার কোনো দরকার আছে কি? রতন এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে বাড়ির দিকে রওনা হল। বুকের মধ্যের ভারটা যেন দ্বিগুণ মনে হচ্ছে এখন।
পাঁচ
আস্তে আস্তে জুতোর খট খট শব্দটা পাশে এসে থামল। রতনের ঘাড়ের চামড়া শিরশির করে উঠল। বাঁ হাতের মুঠোয় বই ছেঁড়া পাতাগুলো কাঁপছে। মুঠো আলগা হয়ে পাতাগুলো মেঝেয় পড়ল। রতন মুখ তোলেনি।
