‘কে?…দাঁড়াও।’ ভিতর থেকে শিবির গলা শোনা গেল।
মিনিট দুই পর দরজার খিল খোলার শব্দ হল। রতন দরজার সামনে থেকে পাশে সরে দাঁড়াল। দরজার পাল্লা অল্প ফাঁক করে শিবির মুখ বেরিয়ে এল, ভেজা চুল লেপটে রয়েছে মাথায়, গালে।
‘ওমমা, তুমি!’ বলেই হি হি করে শিবি হেসে উঠল। ‘নেড়ু!…ন্যাড়া হলে কেমন যেন দেখতে লাগে। চান কচ্ছি, ভেতরে এসো।’ শিবি দরজা খুলে রেখে বাড়ির ভিতরে চলল। রতন দেখল শুধুমাত্র একটা ভিজে সপসপে গামছা শিবির শরীরে জড়ানো গলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আব্রু রক্ষা করতে শরীরে আর কোনো বস্ত্র নেই। তার মাথার মধ্যে কৈশোর ও যৌবনের সংযোগ রাখা অদৃশ্য যোগাযোগটি ভস্ম হয়ে তার স্বার্থহীন নিষ্পাপ সারল্যকে বিচ্ছিন্ন করে দিল মুহূর্তে। সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এখন শিবির কাছাকাছি হতে তার সংকোচ হচ্ছে। তার স্বাভাবিক বোধ থেকে মনে হল ওর শরীরের দিকে তাকানো উচিত নয়। কিন্তু সে তাকাল।
‘আরে এসো…দু-মিনিট, আমার হয়ে এসেছে।’ শিবি ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। চোখ নামিয়ে রতন ভিতরে পা বাড়াল।
‘দরজাটা বন্ধ করে দাও’, শিবি চৌবাচ্চচার দিকে এগোল। রতন ছোটো উঠোনের একধারে দাঁড়িয়ে দেখল শিবি দু-মগ জল মাথায় ঢালল। জলের ধারা মাথা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত নামছে। গামছাটা চামড়ার মতো পিঠের আর পাছার সঙ্গে সেঁটে। এভাবে সে মেয়েদের শরীর কখনো দেখেনি। বাড়িতে তার মা দিদি বা উপরের বউদি আর তার ননদ রয়েছে কিন্তু কেউই শরীরকে এমন অবহেলায় পুরুষদের চোখের সামনে খোলামেলা করে না।
‘হয়ে গেছে। বাববাঃ জল যা ঠান্ডা।’ শিবি তারে ঝোলানো শুকনো ফ্রক আর ইজের টেনে নামিয়ে ছুটে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। একটু পরে বেরিয়ে এসে ভিজে গামছাটা নিংড়ে মাথা ঘষতে ঘষতে বলল, ‘ছেরাদ্দ চুকে গেল? কত লোক খাওয়ালে?’
‘দুশো।’
‘দুউউশোওও!’ শিবির চোখ কাচের মার্বেলের মতো গোল হয়ে উঠল। ‘এই পাশের বাড়ির বুড়ির ছেরাদ্দে খেয়েছিলুম একবার। বেশি লোককে খেতে বলেনি, বারো-চোদ্দোজন হয়েছিল। …ন্যাড়া হয়ে তোমাকে কেমন যেন দ্যাখাচ্ছে, বোকাবোকা, ক্যাবলা-ক্যাবলা।’ গামছাটা শিবি তারে মেলে দিল।
‘দু-মাসের মধ্যেই আবার আগের মতো চুল হয়ে যাবে।’ রতন বোকা-বোকা দেখাচ্ছে কথাটা পছন্দ করেনি। ‘মাথা কামালে চুল আরও ভালো হয়।’
‘ছোটোবেলায় মা বছরে দু-বার আমার মাথা কামিয়ে দিত। তাই তো আমার চুল এতো ঘন।’
‘তোমার মাকে দেখছি না, বাড়িতে তুমি একা?’
‘মা তো ডিউটিতে গেল। নার্সিং করে…প্রাইভেট নার্সিং। আজ গেল ধর্মতলায় নার্সিং হোমে, একটা মাড়োয়ারি বউয়ের পেট থেকে পাথর বার করবে। মাকে ওরা রেখেছে তিন দিনের জন্য।’
‘তিনদিন তোমার মা ওখানে থাকবে?’ রতন অবাক হয়ে বলল। ‘তিনদিন তুমি একা বাড়িতে থাকবে?’
‘ন্যাড়া হয়ে তুমি সত্যিই বোকা হয়ে গেছ। বাড়িতে এত বড়ো একটা মেয়েকে রেখে কোনো মা রাতে বাইরে থাকতে পারে? তোমার মাথায় দেখছি গোবর রয়েছে, পরীক্ষায় তো ফেল করবে।’ শিবির দাঁত হাসির সঙ্গে ঝকঝকিয়ে উঠল।
‘মা শুধু মর্নিং ডিউটি নেয়, সকাল ছটা থেকে সন্ধে ছটা।’
‘ফেল করব বললে। তোমার খারাপ কথা তো সত্যি হয়ে যায়।’ রতন হাসল বটে। কিন্তু মনের কোণে একটা খোঁচা পাওয়ার ব্যথা জমে গেল।
‘য়্যা…না, না, না, এটা সত্যি হবে না।’ শিবির চোখমুখ বদলে গেল। রতন হালকা সুখ পেল ওর উদবিগ্ন মুখ দেখে। শিবি তার ভালো হোক চায়।
‘আমি যা বলি মন থেকে কিন্তু বলি না, এমনিই বলি। আচ্ছা, এবার বলি তুমি পাশ করবে। ঘরে এসো।’ শিবি তার বাহুতে একটা হালকা চাপড় দিয়ে ঘরের দিকে এগোল, রতন পিছু নিল।
‘তুমি স্কুলে যাও না?’
‘কর্পোরেশন স্কুলে পড়তুম, ছেড়ে দিয়েছি। পড়তে ভালো লাগে না।’
কর্পোরেশন স্কুল ক্লাস ফোর পর্যন্ত, ওখানে বস্তির গরিব ছেলেমেয়েরাই পড়ে। তাদের মতো ভদ্র শিক্ষিত বাড়ি নাক কোঁচকায় বিনি পয়সার স্কুলের নাম শুনলে। রতন ধরে নিল শিবি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে। সে বলল, ‘তা হলে সারাদিন কী করো?’
‘কী আর করব, টো টো কোম্পানি! বাড়ির সব কাজ, রাঁধা, বাসনমাজা, দোকানবাজার করা, ঘর মোছা, কাপড় কাচা…আমাদের তো তোমাদের মতো ঝি রাখার পয়সা নেই।’
রতনদের ঘরের কাজ করার লোক নেই। মা আর দিদিই সব করে। বাড়ির জঞ্জাল রাস্তায় ফেলত ছোটোবেলায় দিদি, এখন মা। এ ধার ও ধার তাকিয়ে ঝপ করে দরজার পাশেই আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়। রতন গলা ভারী করে বলল, ‘ঝি না এলে নিজেদেরই তো সব কাজ করতে হয়। তখন তো গরিব-বড়োলোক বলে কোনো তফাত থাকে না।’
শিবি আর তারা যে একটা সময়ে একই স্তরের মানুষ হয়ে যায়, এটাই সে জানাতে চেয়েছে। তারা পয়সাওলা, শিবির এই ধারণাটা তাকে কাঁপিয়ে দিল। দুশো লোক খাওয়ানোর কথাটা শুনেই বোধহয় ধারণাটা হয়েছে। হঠাৎ মিথ্যা কথাটা কেন যে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল! একটু ভয়ও হল, যদি কখনো শিবি জানতে পারে তাদের ঘরের খবর? সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পেরিয়ে কি ও তাদের পাড়ার দিকে যায়? কিংবা কাকিমার কাছ থেকে যদি কোনোদিন শুনে ফেলে।
‘আজ মা রান্না করে গেছে…দুটো ভাত খাবে?’
‘না না আমার খিদে নেই।’ রতন খাতা ধরা হাতটা তুলে জোরে নাড়ল।
