‘দোকানটা বিক্রি করতে হবে, তুই রাজি? এটা তোকে জিজ্ঞেস না করে করতে পারি না। মানুর বিয়েতে হাজার পাঁচেক টাকা তো লাগবেই।’
‘আমি ভেবেছি দোকান রেখে আর দরকার নেই।’
‘ভেবেছিস তাহলে, গুড। …তোর পড়াশুনো চলছে কেমন? সেকেন্ড ডিভিশন হবে?’
তার লেখাপড়ার বহর কতটা কাকা তা জানে বলেই ফার্স্ট ডিভিশানের আশা করেনি। রতন মুখ নামিয়ে বলল, ‘জানি না।’ একটু আগে মা এইভাবেই বলেছিল ‘জানি না।’
‘সেকেন্ড ডিভিশানটা হলে আমার অপিসেই চেষ্টা করে দেখতে পারি। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, সংসার খরচও বাড়ছে, আমি একা আর কত চালাব।’
আর কত চালাব বলল কেন! বিয়ে করার ইচ্ছে হয়েছে নাকি? রতনের মনে প্রথমে এই দুর্ভাবনাটাই চমকে উঠল, তারপর মনে হল চাকরিতে ঢুকলে কলেজে পড়া হবে না। অবশ্য নাইটে কলেজে পড়া যায়। কলেজে পড়ার স্বপ্ন সে অনেকদিন ধরে দেখছে। সামনের বাড়ির ছোটুদা একদিন যখন কলেজে যাবার জন্য বাড়ি থেকে বেরোয় তখন সেও স্কুলে যাবে বলে বেরিয়েছে। খান চারেক বই আর তিনটে খাতা বুকের কাছে ধরা। পরনে হাফ প্যান্ট, ফিতেওলা জুতো। ছোটুদা হাতের একখানা মাত্র খাতা আর একটা মোটা বই দোলাতে দোলাতে চটি পরে যাচ্ছিল। মালকোঁচা দিয়ে পরা ধুতি। সে দ্রুত পায়ে ছোটুদার পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আজ এখন যাচ্ছেন যে?’
‘আজ সাড়ে দশটায় ক্লাস।’
শুনে সে অবাক হয়ে গেল। আজই শুধু সাড়ে দশটায়, রোজ নয়? ‘কখন ছুটি হয় কলেজ?’
‘আজ চারটে পিরিয়ড…পৌনে দুটোয় ছুটি হবে আমার। মাঝে একটা পিরিয়ড অফ।’
রতন তখন অফ শব্দটার মানে জানে কিন্তু চার পিরিয়ড ক্লাস। এটাই প্রথম তার কল্পনায় টোকা দেয়।
‘কোন ক্লাসে পড়ো?’
‘সেভেন।’
‘তা হলে তো তিন বছর পরই কলেজে ঢুকবে।’
‘আপনি শুধু একটা বই নিয়ে যাচ্ছেন যে?’
ছোটুদা কী রকম একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিল, ‘দরকার লাগে না। প্রফেসারের লেকচারের নোট নিলেই হয়।’
স্কুলের বাইরে আর একটা জগৎ আছে সেখানে ঢুকলে এইভাবে হাসা যায়। প্রফেসার, লেকচার, নোট এই সব শব্দ সেখানে ছড়িয়ে আছে, নব মিত্তির লেনের কটা লোকই বা তা জানে! এখন ছোটুদা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আর মালকোঁচা করে না, গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে থাকে রঙিন একটা কাপড়ের ঝোলা। রাস্তায় দেখা হলে হেসে চলে যায়। ছোটুদা সদর দরজার কড়া নাড়লে দিদি জানালায় গিয়ে দাঁড়ায়। না দাঁড়ালেও ছোটুদা আড়চোখে জানালার দিকে একবার তাকাবে। রতন এটা লক্ষ করেছে।
রতন প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘আমি কলেজে পড়ব।’
বিষ্ণু চোখ খুলে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করল। ‘আগে পাশ কর। …টেস্টে তো কোনোরকমে-।’
রতন মুখ নীচু করে ফিরে আসে। উমা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে সে বলল, ‘দোকান বিক্রি করবে বলল।’ উমার চোখে বিষণ্ণতা ছেয়ে এল, কিছু বলল না।
দিনে ছ-সাত ঘণ্টা বই খাতা নিয়ে রতন বসতে শুরু করল। সকালে স্যারের বাড়ি যাওয়া ছাড়া আর সে বাড়ি থেকে বেরোয় না। শিবিদের গলির কাছে পৌঁছে সে মন্থর হয়ে যায়। আড়চোখে গলির ভিতরে তাকায়। হতাশ হয়। ফেরার সময়ও একই ব্যাপার ঘটে। শিবিকে দেখতে, ওর সঙ্গে কথা বলতে তার খুবই ইচ্ছে করে। ইচ্ছেটা বাড়ে যতই সে হতাশ হয়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলির মুখে এসে যদি দাঁড়ায়, কত মেয়েই তো দাঁড়িয়ে পাড়ার অন্য মেয়েদের সঙ্গে গল্প করে। শিবির কী পাড়ায় বন্ধু নেই? তবে সকালবেলাটা গল্প করার সময় নয়। হয়তো ওর অসুখ এখনও সারেনি। গিয়ে একবার অসুখের খবর নিতেও যাওয়া যায়, কেউ কিছু মনে করবে না। তবে ওর মা বোধহয় পছন্দ করবে না। ‘তুমি আর এখানে থেকো না’…আপনজনের মতো সুরে বলাটা হলেও তার কানে ঠেকেছিল ‘এখানে তুমি আর এসো না।’ হয়তো তার চেহারায় মলিনতা দেখে, বাড়ির অবস্থা বুঝে নিয়ে শিবির মা চায়নি এমন একটা ছেলের সঙ্গে তার মেয়ের ভাব থাকুক। কিন্তু শিবিরাই বা কী এমন উঁচুদরের লোক? রমলা লাহিড়ী কি তার মায়ের মতো তো নয়, ধারেকাছেও আসে না। ‘আচ্ছা এবার আমাকে তো এখুনি কলেজ যেতে হবে’…কী সুন্দর করে বলেছিল রমলার মা! শিক্ষিত বড়ো ঘর একেই বলে, এ সব শেখার জিনিস। ওদের সঙ্গে মিশলে কথাবার্তা আচারব্যবহার শেখা যায়। কিন্তু রমলাদের বাড়িতে যাওয়ার কোনো সুযোগ তার নেই। ওই একবারই যেতে পেরেছিল আর জীবনে সুযোগ আসবে না।
স্যারের বাড়ির গলি থেকে বেরিয়েই রতন দেখতে পেল শিবির মাকে। হেঁটে চলেছে গোলাপ দত্ত লেন ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের দিকে। দেখেই সে ধীরে হাঁটতে শুরু করল ব্যবধান বাড়াবার জন্য। ধবধবে সাদা কালোপাড় শাড়ি, বগলে একটা চামড়ার ব্যাগ, পাতলা সাদা কাপড়ের ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার বেশ স্পষ্ট, পাতলা চটি। হাঁটছে দ্রুত, বোধহয় কোথাও যাবার তাড়া আছে। একবার শুধু মুখ নামিয়ে পানের পিক ফেলল রাস্তার ধারের আস্তাকুঁড়ে। রতন পিছন পিছন এল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে। শিবির মা রাস্তা পার হয়ে পেট্রলপাম্পের সামনের বাস স্টপে দাঁড়াল। রতন রাস্তা পার হল না।
শিবির মা নয় নম্বর স্টেট বাসে উঠে ধর্মতলার দিকে চলে যাবার পর রতন আবার গোলাপ দত্ত লেনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। নিশ্চয় বাড়িতে শিবি আছে, অসুখে শুয়ে থাকলে ওর মা বাড়ি ছেড়ে বেরোত না। বাসে চড়ে লোকে দূরেই যায়, শিগগিরি তা হলে ফিরে আসছে না। দরজার কড়া নাড়তে গিয়ে দেখল ঘরের জানলাটা খোলা। রতন জানলায় এসে গোড়ালি তুলে উঁকি দিল। ঘরে কেউ নেই। সে দরজার কড়া আস্তে আস্তে তিনবার নাড়ল।
