দিন দুয়েক পর বিষ্ণু অফিস থেকে ফিরে উমাকে বলল, ‘বউদি আজ একটা পাত্রের খোঁজ পেলুম।’
‘এখনই? অশৌচের একটা বছর যাক।’
রতন তখন ঘরে বসে পড়ছে। মানসী বালিসের ওয়াড় খুলছিল সাবান জলে সিদ্ধ করার জন্য। উমা তাকে বলল, ‘পরে খুলবি, আগে আটাটা মেখে রাখ।’ বালিশ রেখে মানসী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
খাটে পা ঝুলিয়ে বসে বিষ্ণু শার্টটা খুলল। রতন আর উমা তার মুখের দিকে তাকিয়ে।
এক বছর তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে। খোঁজাখুঁজি এখন থেকেই শুরু করতে হবে। কথা পাকা হতে হতে বছর ঘুরে যাবে। আমারই কলিগ প্রমথর পাড়ায় ওরা থাকে বেহালায় ঢালিপাড়ায়। নিজেদের বাড়ি, বনেদি পরিবার, খুলনায় বাড়ি ছিল।’
‘পূর্ববঙ্গের!’ উমার গলায় ধাক্কা পাওয়ার সুর ক্ষীণভাবে ফুটল।
‘তাতে কী হয়েছে?’ বিষ্ণুর স্বরে বিরক্তি। ‘যশোর খুলনা আবার পূর্ববঙ্গ হল কবে? বাঙাল তো পদ্মার ওপারের লোকেরা। …বাঙাল-ঘটি সেন্টিমেন্ট নিয়ে এখন আর চলবে না।’ শেষের কথাটা ধমকের মতো শোনাল। ‘শিক্ষিত ঘর, চার ভাই, পাত্তর ছোটো ছেলে, বাবা নেই। মেজোভাই রাইটার্সে বড়ো পোস্টে আছে হোম ট্রান্সপোর্টে। বড়ো ভাই দিল্লিতে সেন্ট্রাল গভরমেন্টে, সেও বড়ো পোস্টে। আর সেজ ভাই বেহালাতেই ওষুধের দোকান করেছে, ভালো চলে। তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘বোন-টোন নেই?’ উমা জানতে চাইল। রতন ব্যগ্র পাত্র কেমন জানার জন্য। বয়স কত, দেখতে কেমন, করে কী? কাকার উচিত তো গোড়াতেই সে কথা বলা। তা নয়, নিজের বাড়ি, বনেদি পরিবার, এই সব কথা শুরু করল।
‘দুই বোন, বড়োর বিয়ে হয়েছে জামসেদপুরে, স্বামী সুপারভাইজার। ছোটো বি.এ পড়ে। খুবই শিক্ষিত পরিবার শুধু এই ছেলেটিরই লেখাপড়া তেমন হয়নি।’ বিষ্ণু চুপ করে গেল। ওরা দুজন অপেক্ষায় রইল আবার বিষ্ণুর মুখ খোলার জন্য।
‘ক্লাস নাইনের পর আর পড়েনি। মেজোভাই ভেতর থেকে ধরে টরে স্টেট ট্রান্সপোর্টে চাকরি করে দিয়েছে। চাকরিটা এমন কিছু নয় তবে ওর মেজদা চেষ্টা চরিত্তির করে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাবে।’
‘এখন কী চাকরি করে?’ রতন কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। বিষ্ণু বিরক্ত চোখে তাকাল। ‘কন্ডাক্টারি।’
‘কন্ডাক্টারি!’ রতনের স্বরে হতাশা। উমা স্থির চোখে বিষ্ণুর দিকে তাকিয়ে।
‘ঠিক জানি না কত পায়, একশো পাঁচ-দশ হবে বোধহয়। খারাপ কী এমন? চাকরির বাজারের যে কী অবস্থা আমি তো জানি। কত বিএ, এমএ এই কন্ডাক্টারির চাকরির জন্যই জুতোর সুখতলা খইয়ে ফেলছে। …ভেতরে দাদা রয়েছে দু-বছরের মধ্যেই টিকিট চেকার হয়ে যাবে।’ বিষ্ণু দুজনের মুখের দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফেলল প্রতিক্রিয়া জানতে। ওরা চোখ সরিয়ে রাখল।
‘এর থেকে ভালো পাত্তর পেতে হলে বিশ-পঁচিশ হাজার খরচ করতে হবে,…টাকা কোথায়? আর আমার আনা সম্বন্ধ যদি পছন্দ না হয় নিজেরা তা হলে দ্যাখো।’ ঝাঁঝালো গলায় বলে বিষ্ণু উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মানসী বলল, ‘মা কটা রুটি হবে?’
‘দাঁড়া আমি যাচ্ছি।’ উমা ঘর থেকে বেরোল। রতন দিদির মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। প্রতিবেশীরা, চেনাশোনা লোকেরা যখন জানতে চাইবে ভগ্নীপতি কী করে, তখন বলতে হবে, বাস কন্ডাক্টর। হোক না স্টেট বাসের, তবু কন্ডাক্টর তো। ময়লা খাকি ঘামে ভেজা জামা পরা, প্রায় ছেঁড়া চটি পায়ে একটা ভিড় ঠাসা বাসের মধ্যে কোনোক্রমে ঠেলেঠুলে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে, মুখের কাছে হাত বাড়িয়ে ‘টিকিট’, ঘণ্টা বাজিয়ে বাস থামাচ্ছে, কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ ঝাঁকিয়ে রেজগি গুনে পয়সা ফেরত দিচ্ছে-রতনের চোখে এমন একটা ছবি ভেসে উঠল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুকের ভিতর থেকে। সে জানে বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা তাদের নেই, কেউ তাদের ধারও দেবে না। কাকা কত আর করবে! দাদার সংসার টানার কথা তো ওর নয়। রতন কাকার কোনো দোষ খুঁজে পেল না কন্ডাক্টর পাত্রের খবর আনার জন্য। বাবা তো একটা অচল দোকান রেখে গেছে। মারা যাবার পর থেকে সেটা তালা বন্ধই রয়েছে। কে চালাবে দোকান? ওটা বিক্রিই করে দিতে হবে। দিদির বিয়ের খরচ তাতে খানিকটা মিটবে। রতন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভেবে চলল। পাশের ঘরে বিষ্ণুর সঙ্গে উমা কথা বলছে। কথার অস্পষ্ট শব্দ তার কানে আসছে।
একটু পরে উমা ঘরে এল।
‘আমি হ্যাঁ বলে দিলুম। এর থেকে ভালো আর কী জুটবে। তুই লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়ে দিদির বিয়ে দিতে দিতে মানু তদ্দিনে বুড়ি হয়ে যাবে।’
‘দিদিকে লেখাপড়া করালে একটা চাকরিবাকরি করতে পারত, নিজে দেখেশুনে বিয়েও করতে পারত।’
‘ঠাকুরপোই তো পড়তে দিল না। বাড়ি থেকে বেরোনো পর্যন্ত বন্ধ দিল।’ উমার গলায় ক্ষোভ উঠে এল। ‘যেমন কপাল করেছে তেমনই তো হবে।’
কপাল! রতনের মনে হল শব্দটা যেন সে এই প্রথম শুনল। মায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে সে বলল, ‘কপাল কেন!’
‘কপাল নয়তো কী। কপালে যার যা থাকে তেমনই তার হয়। তোর কপালে যা আছে তাই হবে।’
‘কী আছে আমার কপালে, মা?’
উমা কয়েক লহমা ভেবে নিয়ে বলল, ‘জানি না।’
পাশের ঘর থেকে কাকার ডাক শোনা গেল, ‘রতু একবার শুনে যা।’
রতন ঘরে ঢুকে দেখল কাকা বিছানায় শোয়া। মাথার পিছনে দুই হাত, চোখ বন্ধ।
