হপ্তায় আড়াই হাজার টাকা দিয়ে গৌর করে কী? বাড়িতে নিশ্চয় টাকা পাঠায়। সেও পাঠাবে। নিশ্চয় গাড়ি কিনেছে। ছ মাস থাকলেই নাকি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার পয়সা জমানো যায়। টাকা জমিয়ে কিংবা ধার করে প্রথমে বম্বে যেতে হবে, ওখান থেকেই জাহাজ ছাড়ে, টাকা আর কী করে জমাবে, চাকরিবাকরি তো আর সে করে না, শ’খানেক টাকা ধারই করতে হবে। কার কাছে ধার পাওয়া যাবে? …কাকা?
রতন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। কাকার কাছে কি একশো টাকা এখন চাওয়া যায়? সামনেই শ্রাদ্ধ, দিদির বিয়ের জন্য ছেলে খোঁজা হচ্ছে, খরচ তো কাকারই। কত টাকাই বা মাইনে পায়! সে জানে না, তবে আন্দাজে মনে হয় দেড়শোর মতো। যদি কাকা বিয়ে করত তা হলে দাদার সংসারের জন্য কি টাকা দিত? এখনও বিয়ে করতে পারে যদি করার ইচ্ছে হয়! পাড়ার তারক দত্ত তো তৃতীয়বার বিয়ে করল। প্রথম বউ গায়ে আগুন দিয়ে মরল, দ্বিতীয় বউ কার সঙ্গে পালিয়ে গেল। তারক আর কাকা একই বয়সি। রতন অস্বস্তি বোধ করল এই ভেবে যে সে একটা অনুচিত চিন্তা করছে। কাকা যেন বিয়ে না করে।
বাড়িতে এসে রতন মা ছাড়া কাকা বা দিদিকে দেখতে পেল না। উমা রান্নাঘরে চুপ করে বসে, উনুনে কী একটা ফুটছে। রতন জিজ্ঞাসা করল, ‘দিদি কোথায় মা?’
‘মানু ওপরে।’
রতন উঠোনে দাঁড়িয়ে দোতলার দিকে তাকিয়ে দেখল ঘরের দরজা বন্ধ, জানালাটাও। ঘরে আলো জ্বললে কপাটের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়। তার মনে হল আলো জ্বলছে না। অন্ধকার ঘরে দিদি কী করছে? কৌতূহলী হয়ে সে পা টিপে টিপে দোতলায় উঠল। ঘরে রেডিয়োতে নাটক হচ্ছে, কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না। সে নেমে এল। বাড়িতে একজন মারা গেছে, শোকের বাড়ি। তাই নাটক শুনছে দরজা-জানলা বন্ধ করে, কেউ যেন না জানতে পারে। দুলাল চাটুজ্জেদের শোক হবার কথা নয় কিন্তু দিদির তো হবার কথা।
ইংরিজি বই নিয়ে রতন পড়তে বসল। মিনিট খানেক পরই সে বুঝে গেল সে কিছুই পড়ছে না। তার চোখে ভেসে রয়েছে জার্মানির মিউনিখ শহরের একটা ছবি। জার্মান কনসুলেট থেকে লাইব্রেরিতে পাঠায় পত্রিকা, ইস্তাহার। তারই একটায় দেখেছিল রাজপথের ছবি, বড়ো বড়ো বাড়ি, চকচকে মোটরগাড়ি, দু-ধারে ঝলমলে দোকানে কাচের দরজা, তকতকে চওড়া ফুটপাথে হেঁটে যাচ্ছে এক তরুণের বাহু ধরে এক তরুণী, পেরাম্বুলেটরে বসিয়ে মা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বাচ্চচাকে যার গাল দুটো আপেলের মতো। ওদের দু-ধার দিয়ে হেঁটে চলেছে ব্যস্ত নরনারী। তার মধ্যে রয়েছে-ছড়ি হাতে টুপি মাথায় এক বুড়ো আর মাথায় রুমাল বাঁধা এক বুড়ি। দুজনে হাত ধরে রয়েছে দুজনের। রতনের ইচ্ছে করছে অমন একটা জায়গায় গিয়ে বাস করতে। বইটা চোখের সামনে ধরে রেখে সে নিজেকে দেখল মিউনিখের ওই রাজপথে হেঁটে চলেছে। একটা ক্ষীণ সুখের হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়ল। তখনই বাইরে কাকার গলার আওয়াজ পেল।
‘রতু পড়তে বসেছে বউদি?’
উমা কী যেন বলল। রতনের চোখ থেকে মুছে গেল মিউনিখ। পলকের জন্য তার মনে হল, বাবার মৃত্যুর জন্য কোথায় শোক? গত ছ-সাত ঘণ্টায় একবারও তো তার বাবাকে মনে পড়েনি। দিদিরও বোধহয় মনে করে রাখার আর দরকার হয় না। মার মনের মধ্যে কী হচ্ছে সে বুঝতে পারে না। কথা এমনিতেই কম বলে, একই নির্বিকার মুখ নিয়ে সংসারের কাজ করে যাচ্ছে। কাকা আগের মতোই রয়ে গেছে শুধু কপালের কোঁচকানিটা বেড়েছে।
মানসী উপর থেকে নেমে এল বিষ্ণুর গলার আওয়াজ পেয়ে। তাকে দেখে রতন বলল, ‘নাটক শুনছিলি? কী নাটক ?’
‘শাজাহান।’
‘গুরুদশার সময় কেউ নাটক শোনে না।’
‘তোকে ডেঁপোমো করতে হবে না, নিজের পড়া পড়, কদিন পরেই পরীক্ষা।’
রতন বইয়ে চোখ রাখল। কথাটার উত্তর দিলে ঝগড়ার মতো একটা ব্যাপার তৈরি হবে। সেটা সে চায় না। সবার মতো সেও তো কোনোরকম শোক বোধ করছে না। বেঁচে থাকতেই তারা বাবাকে তো একটা লোক ছাড়া আর কিছুই ভাবত না। এমন অনেক দিন গেছে, বাবার সঙ্গে কথা বলার কোনো দরকার বোধ করেনি। বাবাকে ভালোবাসত কি না সেটা এখনও সে জানে না। শ্মশানের পুরুতের নির্দেশে বাবার মুখে যখন সে ঘি মাখিয়ে দিচ্ছিল তখন ঘিনঘিন করে উঠেছিল তার ভিতরটা। হতে পারে ঘিয়ের গন্ধ তার ভালো লাগছিল না।
‘দিদি, বাবাকে ভালোবাসতিস? বুকে হাত দিয়ে বল।’ রতনের মুখ থেকে অজান্তেই যেন কথাটা বেরিয়ে এল।
মানসী অবাক হল প্রশ্নটা শুনে। মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল। ‘হঠাৎ এমন কথা?’
‘এমনিই।’
‘নাটক শুনতে গেছি বলে?’
‘না, না, এমনিই মনে হল। ফাঁকা ফাঁকা লাগার কথা। কিন্তু লাগছে না। তোর লাগছে?’
‘একটু একটু লাগছে। একসঙ্গে জন্ম থেকেই রয়েছি তো। …ছিলুম তো। ছেলেরা অন্যরকম হয়।’
‘কেন হয়!’ রতনের স্বরে জিজ্ঞাসা নেই।
চার
শ্রাদ্ধ চুকে গেল। কোনো সমারোহ ছিল না। উমা একবার মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘একটু কেত্তন হলে ভালো হয়।’ কথাটা কেউ কানে নেয়নি। শ্রাদ্ধবাসরে সকাল থেকে কীর্তন হতে দেখেছে রতন। মৃতের ছবি মালা পরিয়ে সেখানে রাখা হয়। রজনিগন্ধার ছড় আর বেলফুলের মালায়, ডেকরেটরের পর্দায় আসর সাদা হয়ে থাকে। রতনের একবার মনে হয়েছিল, তোরঙ্গে রাখা বাবার ছবিটা শ্রাদ্ধের সময় দানসামগ্রীর মাঝে বসিয়ে রাখবে। পরে মনে হয়, সাঁতারের কস্টুম পরা লালচে হয়ে যাওয়া ছবিটা ভীষণ বেমানান হবে। কাচ বাঁধানো, চন্দনের ফোঁটা দেওয়া ছবি ছাড়া মানায় না। সরু সরু দুটো পা আর দুটো হাত ছাড়া ছবিটায় আর কিছু দেখার নেই। বারাসাত থেকে রতনের মামা আসেনি, হাঁপানিটা বেড়ে যাওয়ায়। মামি আর তার বয়সি ধুতি পরা মামাতো ভাই এসেছিল। ছেলেটি এগারো ক্লাসে পড়ে। রতনেরও ওই ক্লাসে পড়ার কথা কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে ফেল করায় তা হয়নি। তবে স্কুলে এক বছর বয়স কমানো আছে। মামা একশো টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে উমাকে। জনা কুড়ি লোক নিয়মভঙ্গের পর দুপুরে খায়।
