রতন লাইব্রেরিতে বসে পড়েছিল যে প্রবন্ধটি তার শিরোনাম : ‘জীবনানন্দ ও প্রকৃতি’। কে এই জীবনানন্দ জানার জন্য রতন যখন অমলেন্দুকে প্রশ্ন করবে বলে মুখ তুলল, তখন সে একজন মেম্বারের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। রতন শুনল অমলেন্দু ঈষৎ গদগদ করে বলছে, ‘গৌর তা হলে শিগগিরি ফিরছে না?’
‘এই তো সবে এক বছর হল গেছে। হামবুর্গ কি ভবানীপুর যে এ বেলা-ও বেলা যাতায়াত করা যায়? প্লেন তাড়াই তো পাঁচ হাজার টাকা।’
‘চিঠিপত্তর দেয়?’
‘দেবে না কেন! আগে হপ্তায়-হপ্তায় দিত এখন মাসে একটা দেয়। প্রচণ্ড কাজের চাপ। আমেরিকানরা বোমা ফেলে তো আর কিছু আস্ত রাখেনি। সব তৈরি করতে হচ্ছে। রাস্তাঘাট, বাড়ি, কলকারখানা নতুন করে তৈরি হচ্ছে, লাখ লাখ লোক ওদের দরকার, ইটালি থেকে গ্রিস থেকে, টার্কি থেকে ঝেঁটিয়ে লোক গেছে। জার্মানিতে ইয়াং বলে তো আর কিছু নেই, তারা তো সব যুদ্ধেই মারা গেছে!…আচ্ছা চলি।’
‘নিতাইদা একটা কথা।’ অমলেন্দু কাতর গলায় বলল, ‘গৌরের কাছ থেকে চিঠি দিয়ে একটা খবর জেনে নেবে, ওখানে এখন চাকরি দেওয়া হচ্ছে কি না? …ছোটো ভাইটা আই এস সি পড়ছে, ওকে তা হলে পাঠিয়ে দোব, এখানে থেকে কতদূর আর কী করতে পারবে? তবু জার্মানি থেকে কিছু শিখেটিখে এলে একটা ভালো চাকরি পাবে, এখন তো অনেক বড়ো বড়ো কলকারখানা হচ্ছে, বাঁধ হচ্ছে, ইলেকট্রিসিটি-‘
‘আরে রেখে দাও ও সব বড়ো বড়ো কলকারখানা। মাইনে কত দেবে? সেই তো পাঁচশো-বারোশো স্কেলে! গৌর কত পাচ্ছে জানো?…হপ্তায় আড়াই হাজার টাকা!’
রতন লোকটার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। হপ্তায় এত টাকা মাইনের কথা কারুর মুখ থেকে সে এই প্রথম শুনল। অমলেন্দুর দুটো চোখ ছলছল করছে। গাঢ় স্বরে বলল, ‘জানি এ দেশে কিছু হবে না, কোনো প্রসপেক্ট নেই। আই এ পড়তে চেয়েছিল জোর করে আই এস সি-তে ভরতি করিয়েছি। সায়েন্স পড়লে তবু…এখন তো সায়েন্সেরই যুগ!’
‘তা তো বটেই। তবে গৌর তো কলেজে পড়েনি। স্বাস্থ্য ভালো, ওয়েট লিফটিং করত, খুবই ড্যাশিং, জার্মানরা তো এটাই চায়। ওরা খাটিয়ে জাত তাই খাটিয়ে লোক পছন্দ করে…আচ্ছা চলি।’
‘আমার ভাইও খুব খাটিয়ে…নিতাইদা ওর কথাটা গৌরকে কিন্তু মনে করে লিখবেন?’
‘লিখব। …চলি।’
লোকটি চলে যাবার পর রতন বলল, ‘অমলেন্দুদা, এই গৌর কে?’
‘কে আবার, একটা বখাটে ছেলে। স্বাস্থ্য সমিতিতে একসারসাইজ করত আর খোকার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিত। কী করে যে জার্মানি চলে গেল সেটাই ভাবি। …হপ্তায় আড়াই হাজার কামাচ্ছে, একটা আকাট মুখ্যুকে জার্মানরা অত টাকা দেবে, বিশ্বাস করতে হবে?’
‘আড়াই হাজার না হোক দু-হাজার হয় তো দেয়।’
‘তুই জানিস, দেয়?’ ধমকে উঠল অমলেন্দু।
রতন মনে মনে গুটিয়ে গেল, হাতের কাগজগুলো ভাঁজ করে বলল, ‘পরীক্ষা চুকে গেলে এগুলো নোব। রেখে দিন এখন।’
ইস্যু করা বইয়ের নাম খাতায় লিখছে অমলেন্দু। রতন দাঁড়িয়ে রইল।
‘পাস করে সায়েন্স পড়িস আর এই প্যাংলা শরীরটাকে তাগড়াই কর। অন্যের লেখা পূর্বাচলে লিখে তোর লাভটা কী হবে?…টেবিলে রেখে যা।’ অমলেন্দু আঙুল দিয়ে দেখাল। মুখে বিরক্তি।
রতন কাগজগুলো টেবিলে রাখল। সে বলতে গিয়েও বলতে পারল না, তারাশঙ্কর তার হাতের লেখা দেখে ‘বাঃ কী সুন্দর’ বলেছিলেন। এর কি কোনো মূল্য নেই? লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল নিতাইয়ের কথাটা : ‘গৌর কত পাচ্ছে জানো? হপ্তায় আড়াই হাজার টাকা!’ খোকার চায়ের দোকান সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ওপারে মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের মোড়ে। ওদিকটায় সে বিশেষ যায় না, পাড়াটা খারাপ। দু- ধারে বেশ্যাবাড়ি। খোকার দোকানের সামনে একটা বেঞ্চি পাতা। সব সময়ই তাতে লোক বসে থাকে। দোকানটা থেকে একটু গেলেই স্বাস্থ্য সমিতি। কোলাপসিবল গেট, তারপর একটা ঘর তাতে ছড়ানো রয়েছে ব্যায়ামের সরঞ্জাম। সেটা পেরিয়ে একটা স্প্রিং দেওয়া আধা-দরজা ঠেলে ঢুকলে মাটির জমি। এখানেও প্যারালাল বার, রিং ইত্যাদি। রতন কোলাপসিবল গেটের বাইরে থেকে কিছু ছেলেকে ব্যায়াম করতে দেখেছে।
অমলেন্দুর কথা থেকে সে বুঝেছে গৌর নামের লোকটা লেখাপড়া করেনি। ছিল শুধু স্বাস্থ্য আর ড্যাশিং। ড্যাশিং-পুশিং কথাটা সে শুনেছে, মানেটা ঠিকমতো জানে না। রতন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপারে খোকার চায়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে রইল। স্বাস্থ্য সমিতির কোলাপসিবল গেটটাও দেখা যাচ্ছে। ভিতরে আলো জ্বলছে। খোকার দোকানের বেঞ্চে চারটে লোক বসে, একজনের হাতে চায়ের গ্লাস। তার পাশেই একটা দোকান। সামনে দিয়ে গেলে কাচের শো-কেসে লাল লঙ্কা মাখানো ভাজা কাঁকড়া, ডিম আর আস্ত মুরগি দেখা যায়। দেখলে জিভে জল আসে। রাস্তায় কয়েকটা রিকশা, কিছু লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দোতলার বারান্দা চিক ফেলা। একটা ট্যাক্সি এসে থামল। রকে বসেছিল দুটো লোক। একজন এগিয়ে গেল ট্যাক্সির দিকে। জায়গাটা শান্ত। রাত বাড়লে লোক বাড়বে। কয়েকদিন আগে সে শুনেছে রাতে এখানে সোডার বোতল ছোড়াছুড়ি হয়েছিল।
হপ্তায় আড়াই হাজার টাকা। রতন সন্তর্পণে একটা বাসনার মধ্যে ঢুকে পড়ল-জার্মান যাওয়া যায় না? ওই বেঞ্চিতে বসে আড্ডা দেওয়া একটা ছেলে, যদি ওই স্বাস্থ্য সমিতিতে লোহার চাকা তুলে জার্মান যেতে পারে তা হলে সেও কী পারবে না? প্লেনেই যে যেতে হবে তার কি মানে আছে, কত লোক তো জাহাজে খালাসির চাকরি নিয়ে বিলেতে গেছে। সহায়সম্বলহীন হয়ে বিদেশে ভিক্ষে করে খেয়েছে, ফুটপাথে ঘুমিয়েছে। তারপর একদিন অনেক কিছু শিখে দেশে ফিরে বিরাট লোক হয়েছে। শুধু একবার কোনোভাবে গিয়ে পড়া। পরিশ্রম করতে তো হবেই, তাতে সে ভয় পায় না শুধু তাগড়াই হতে হবে। স্বাস্থ্য সমিতিতে ভরতি হলে মোটামুটি একটা চেহারা তৈরি করতে কত দিন লাগবে? রতন তার পাড়ায় ব্যায়াম করা লোক দেখেনি।
