‘আমি আসছি।’
‘আবার আসবে?’ শিবির স্বরে আন্তরিকতা রয়েছে। রতনের মনে এল ওর মার কথা বলার ভঙ্গি। ইতস্তত করে সে বলল, ‘দেখি। এখন তো শ্রাদ্ধের জন্য অনেক কাজ রয়েছে, পরীক্ষার পড়াও আছে…চলি।’ সে আর শিবির দিকে তাকাল না। শরীরের মধ্যে রক্তপ্রবাহের বেগ বদল হয়ে নতুন একটা উত্তেজনা তাকে ঝাঁঝিয়ে তুলছে।
শিবিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর তার চোখে ভেসে উঠল রমলা লাহিড়ি আর তার মা। হাবভাবে, কথায়বার্তায়, উচ্চচারণে, চেহারায়, সাজে কত তফাত। সারা পথ দু-জোড়া মা-মেয়ের মধ্যে তুলনা করতে করতে সে বাড়ি পৌঁছল। মায়ের সঙ্গে কাকা কথা বলছে। আত্মীয়কুটুম কাদের নিমন্ত্রণ করা হবে তারই তালিকা তৈরিতে ওরা ব্যস্ত। বলছে কাকা, শুনছে মা।
‘এত লোককে বললে তো খরচে কুলোতে পারব না। জ্যাঠাদের সঙ্গে তো কোনো সম্পর্কই নেই, জেঠিমা মারা যাবার দু-দিন পর খবর দিল, এই তো আত্মীয়তার নমুনা, এখান থেকে মানিকতলা আর কদ্দুর, তবু দু-দিন লাগল। দরকার কী ওদের বলে। বললেও দেখবে হয়তো কেউ আসবে না। …একটা কথা বউদি, এখন থেকে কিন্তু মেপে হিসেব করে চলতে হবে, সেন্টিমেন্টকে প্রশ্রয় তো আর দেওয়া যাবে না। বাজে খরচ একদম বন্ধ। বারাসাতে তোমার ভাইকে কি বলার দরকার আছে? রতু…তোর স্যারকে কি বলতে হবে?’
বিষ্ণুর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে রতন বলল, ‘বললে ভালো হয়।’
‘আচ্ছা।’ হাতের কাগজে বিষ্ণু নামটা লিখল। ‘শ্মশানবন্ধুদের তো বলতেই হবে। ওরা ছাড়া সামনের বলাইবাবুদের, বেঁটে কেলোদের আর শম্ভু ঘোষদের…এই তিনটে বাড়ি। পাড়ায় যাতায়াত, কথাবার্তা তো শুধু এদেরই সঙ্গে।’
ক্ষীণস্বরে উমারানি বলল, ‘বারাসাতের ওরা তো মারা যাবার খবরই পায়নি। রতু একবার যাক না।’
‘না, না, ওর সামনে পরীক্ষা এখন একটা দিনও নষ্ট করা উচিত হবে না, বরং আমি একটা পোস্টকার্ড ছেড়ে দিচ্ছি, আর হ্যাঁ, ওপরে ওদের তো বলতে হবে।’
ওপরের ওরা হল বাড়িওয়ালি বুড়ির দূরসম্পর্কের ভাইপো এবং তার পরিবার। বুড়ি যখন মরোমরো তখন কোতরং থেকে হঠাৎ এসে আবির্ভূত হয় এই ভাইপো দুলাল চাটুজ্যে। শেষের কটা দিন সেবাযত্ন করেছিল। অথচ রতনরা শুনেছিল বুড়ির তিনকুলে নাকি কেউ নেই! দুলালের সঙ্গে আসে বউ নমিতা আর স্বামী পরিত্যক্তা বোন অন্ন, ভালো নাম অন্নপূর্ণা, কৈশোরে বসন্ত রোগে অন্নর মুখখানি শুধু বাটনা বাটা শিলের মতো গর্তে ভরিয়ে দিয়েই যায়নি একটি চোখও নষ্ট করে দিয়ে গেছে। দুলালদের সন্তান নেই তবে হতে পারে, দুজনেরই বয়স অল্প। লোকটি নম্র, মিষ্ট স্বরে কথা বলে, রতনের সন্দেহ জাঁহাবাজ এবং সুযোগসন্ধানী, নয়তো পিসিমা মরতে চলেছে এই খবরটা পেল কী করে? দূর থেকে নিশ্চয় নজর রেখেছিল। জমিজমা পুকুর আছে, প্রতি শনিবার সে সব তদারক করতে যায়।
রতন দুপুরে ভূগোল পড়তে বসল। অঙ্ক, সংস্কৃত আর ইংরিজিতে সে কাঁচা। তাই এই তিনটি বিষয়েই সে এতদিন মন দিয়েছিল। এখন ভূগোল বই খুলে তার মনে হচ্ছে এই বিষয়টার কিছুই সে জানে না। বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগকে ভূগোলের স্যার ‘ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট’ বলেছিলেন। রতন বায়ুপ্রবাহের চারটি শ্রেণি-নিয়ত, সাময়িক, আকস্মিক ও স্থানীয়, কয়েকবার পড়েও মনে রাখতে পারছে না অথচ মুখস্থ সে ভালোই করে। দু-তিন লাইন চোখ বুজে বিড়বিড় করার পরই ছবির মতো চোখে ফুটে উঠছে চাদর ফেলে শিবির বিছানায় উঠে বসার দৃশ্যটা। সিনেমার রিপ্লের মতো বারবার ছবিটাকে এগিয়ে পিছিয়ে অবশেষে এক জায়গায় সে স্থির করিয়ে রাখে। আট-দশ সেকেন্ড পর লজ্জায় মনে মনে কুঁকড়ে গিয়ে সে মাথা ঝাঁকিয়ে ছবিটাকে মুছে দেয়। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা উচিত নয়, কেউ না জানলেও সে নিজে তো জানে সে একটা অপরাধ করছে। শিবি তো ইচ্ছে করে চাদরটা সরায়নি। অমন একটা খবর শুনে যে কেউই ধড়মড় করে উঠে বসত। সে নিজেও তো চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। দোষ কারুরই নেই। তবু ওই সামান্য সময়টুকুতেই যা সে দেখতে পেয়েছিল সেটা তার শরীরের কোষগুলোয় বিদ্যুৎ ছুঁইয়ে ঝাঁকিয়ে দেয়। সে অবশ হয়ে গিয়েছিল, সাড় ফিরে আসার পরই শরীর জ্বালা করে ওঠে। জ্বালাটা এখনও চলছে। বই বন্ধ করে সে খাটে শুয়ে পড়ল শরীরটাকে গুটিয়ে বুকের কাছে হাঁটু তুলে। চোখ বুজে সে মনে করতে চেষ্টা করল বায়ুপ্রবাহের চারটি শ্রেণি। একটু পরেই রতন ঘুমিয়ে পড়ল।
সন্ধ্যায় সে তরুণ পাঠাগারে গেল। এই কদিন লাইব্রেরির কাজ করছে অমলেন্দু, গুপিনাথের শ্রাদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত করবে। মেম্বারদের জন্য ছোটো বেঞ্চটায় বসে রতন একটা পাণ্ডুলিপি পড়ছিল। লাইব্রেরি থেকে হাতে লেখা একটা পত্রিকা বেরোয়। নাম ‘পূর্বাচল’, বছরে তিনটে বেরোত, এখন দুটো। পুরু কারটিজ কাগজে, রেক্সিন বাঁধাই, মলাটে সোনার জলে লেখা ‘পূর্বাচল’। মেম্বাররা ছাড়াও বাইরের লোকেদেরও রচনা এতে প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া বিখ্যাত লেখকদের উৎসাহ দেওয়া কয়েক লাইনের আশীর্বচনের মতো তাঁদের স্বহস্তে লেখা শুভেচ্ছাও লিখিয়ে নিয়ে আসা হয়। গত বছর তারাশঙ্করের শুভেচ্ছা আনতে তার টালার বাড়িতে যে তিনজন গেছিল তার মধ্যে রতনও ছিল। সে লাইব্রেরিতে রাখা ‘কালিন্দি’ আর ‘ধাত্রীদেবতা’ পড়েছে। তারাশঙ্কর যখন পূর্বাচলের পাতা উলটে লিপিকারের হাতের লেখার প্রশংসা করে বলেন, ‘বাঃ কী সুন্দর’, তখন রতন আনন্দে পাথর হয়ে গেছিল। ‘পূর্বাচল’ আগাগোড়া তারই হাতে লেখা। ‘মুক্তোর মতো’ অক্ষরে এবং নির্ভুল বানানে লেখার জন্যই সে নাকি পরীক্ষায় কয়েকটা নম্বর বেশি পায়, এমন একটা কথা তার সহপাঠীদের মধ্যে চালু আছে। তারাশঙ্কর সেদিন পাঁচ লাইন লিখেছিলেন, দেখে রতন বলেছিল, ‘হিরের মতো হাতের লেখা।’
