এরপর তারক বক্তৃতা শোনার চেষ্টা করল। বক্তার চেহারাটা প্রায় দেবুর মতো কিন্তু গলার স্বরে হুবহু হিরণ্ময়। মাইক্রোফোনটায় গোলমাল আছে তাই মাঝে মাঝে বঙ্কুবিহারীর মতো হয়ে যাচ্ছে।
পরিমলের কবিতায় কী কী ব্যাপার আছে বক্তা তাই বোঝাচ্ছে।
তারক মনোযোগে বক্তৃতা শুনল :
‘সমাজ ও জীবনের অন্ধকার দিক অথবা প্রেম থেকে প্রেমহীনতার নিবিড় চেতনার ধ্যানধারণা, ভাবনাচিন্তা, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে পরিমলের কাব্যে। কবিহৃদয়ের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহ, বিক্ষোভ তাঁর কবিতায় সোচ্চচার। মনীষার ব্যবহারে, ভাষার নিজস্ব শৈলীর সাহায্যে, বিচিত্র অপ্রচলিত বিষয়ে প্রচুর অধ্যয়নের উপকরণ ব্যবহার করে, প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে অব্যবস্থিত বিপরীতকে আবিষ্কার করার বিদ্রোহী কৌতুকের সাহায্যে পরিমল তাঁর কাব্যের পরিমণ্ডল রচনা করেছে-যে পরিমণ্ডলের স্বল্প আয়তনের মধ্যে ধরা পড়েছে ক্লান্তপ্রাণ নাগরিক হৃদয় থেকে ক্ষরিত বিবর্ণ শোনিতে আঁকা এক নিঃসঙ্গ পৃথিবীর ছবি।’
শুনতে শুনতে তারক যৎপরোনাস্তি বিস্মিত হল। কোনো লেখা থেকে না পড়ে, গড়গড়িয়ে এইসব কথা কী করে বলা সম্ভব! যা শুনল, সেগুলো মনে করার চেষ্টা করতে গিয়ে তারক বেকুব বনে গেল। ‘বিদ্রোহী কৌতুক’ আর ‘নিঃসঙ্গ পৃথিবীর ছবি’ ছাড়া, একটি কথাও তার মনে নেই। এর মধ্যেই ভুলে গেছে। অথচ টানা পনেরো মিনিট ধরে লোকটা বলে গেল, একবার বগলও চুলকোল না! প্রত্যেকটা শব্দের উচ্চচারণে মটর ভাজা চিবোনোর শব্দ। তারকের ধারণা জন্মাল, এই বক্তাটি খুবই পণ্ডিত এবং পরিমল হেঁজিপেজি কবি ছিল না।
তারক দেখতে পেল প্রণবকে। একটা খাতা নিয়ে প্রত্যেকের কাছে যাচ্ছে। খাতাটা এবং কলম বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকেরা ইতস্তত করে কী যেন লিখছে।
তারকের পিছনে তখন কথা হল দুজন লোকের মধ্যে :
‘চল বাইরে যাই, অনেকক্ষণ সিগারেট খাইনি।’
‘কেন, আর একটু পরে গেলেইতো হয়?’
তারক দেখল খাতা নিয়ে প্রণব ক্রমশ তাদের দিকেই আসছে।
‘আজ শেয়ালদায় নাকি স্টেট বাস পুড়িয়েছে।’
‘তাই নাকি, কখন?’
‘বিকেলের দিকে। ট্রাম-বাস এতক্ষণে বন্ধ হয়ে গেল কি না কে জানে। তুই বোস আমি বরং দেখে আসি।’
খাতাটা প্রণব এগিয়ে ধরল।
‘কীসের!’ তারক দ্বিধাগ্রস্ত হাতে খাতাটা নিল।
‘বাঃ, শুনলি কী তাহলে? পরিমলের প্রবন্ধ আর কবিতার একটা কালেকসান বার করা হবে, হাজারখানেক টাকার ব্যাপার।’
‘গেছলি ডাক্তারের কাছে?’
প্রণব এমনভাবে তাকাল যেন বলতে চায়, এখন এই পরিবেশে ওইসব কথা, ছিঃ। তারক লজ্জা পেয়ে তাড়াতাড়ি খাতায় নিজের নামটা লিখে ফেলল। টাকার অঙ্ক বসাবার আগে অন্যরা কত দিয়েছে দেখল। পাঁচ টাকার কম কেউ নয়। এর কম দেওয়াটা খুবই খারাপ দেখায়, কিন্তু পাঁচ টাকা এখন কোথায় পাব? তা ছাড়া আমার কী দায় পড়েছে পরিমলের বই বার করায়!
‘তাড়াতাড়ি কর। টাকা পরে দিবি, এখন অ্যামাউন্টটা লিখে দে।’
প্রণব বিরক্ত হয়ে বলল কেন? ও বিরক্ত হয় এমন কাজ এখন কোনোমতেই করা উচিত নয়। এই ভেবে তারক লিখে দিল পাঁচ টাকা। প্রণব চোখ বুলিয়ে পাশের লোককে খাতাটা এগিয়ে দিল হাসিহাসি মুখে।
তারক ভয়ে-ভয়ে ভাবল পাঁচ টাকা দেখে প্রণব খুশি হল কি না কে জানে! হয়তো ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে কিংবা এখনও হয়তো যায়নি। পাঁচ টাকা দেখে ওর মনেই পড়বে না আমার কথা। সবাই যা দিচ্ছে তা না দিয়ে অদ্ভুত কিছু, পৌনে চার টাকা বা এগারো টাকা আট পয়সার মতো কিছু লিখলেও ওর মনে থাকত তারক সিংহ নামটা। তাহলে কালকেই যেত ডাক্তারের কাছে।
একবার তারকের ইচ্ছে করল খাতাটা চেয়ে নিয়ে, টাকার পরিমাণ শুধরে দেয়। তারপর ভাবল, এভাবে হয়তো, ওকে মনে পড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যদি অনীতা থাকত আলাপ করিয়ে দিতুম। অনীতাকে দেখলে সহজে কেউ ভুলতে পারবে না। ছেলেদের মতো ওর শরীর। পাঁচটা টাকা ওর জন্যই গচ্চচা গেল, গুহর উচিত এটা দিয়ে দেওয়া। তবে পরিমল পড়ত আমাদের সময়, আমার ছবি ছাপিয়েছিল, লিখে নাম করেছে, ওর শোকসভায় জনা চল্লিশ লোকও হয়েছে।
তারকের হঠাৎ গর্ব হল পরিমলের জন্য। আমার বন্ধু, ষোলো বছর আগের আলাপ, এখানে ক-জন আছে সে কথা বলতে পারে? ঘাড় ফিরিয়ে তারক লোকেদের দিকে তাকাল। কারোর মুখ দেখেই তার মনে হল না, এরা পরিমলের বন্ধু। গুহকে পাঁচ টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কথাটা বললে নিশ্চয়ই দিতে চাইবে। বলবে, আমার কাজেই তো গিয়ে পাঁচ টাকা গচ্চচা দিলেন। কিন্তু পরিমল আমার বন্ধু, একই ইয়ারে আমরা পড়েছি! গচ্চচা শব্দটা এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না।
‘কীরে ট্রাম-বাস চলছে দেখলি?’
‘হ্যাঁ, লোকে যে কী প্যানিকি হয়েছে আজকাল। বাস-ট্রাম কিছু পোড়েনি। বাইরে গোলোকের সঙ্গে দেখা হল, বলল ছেলেটা পরিমলেরই।’
‘যাঃ, আমি যে দেখলুম ওকে বাপের সঙ্গে, এইতো ছ-সাত মাস আগেই। সবে তখন ক্যানসারটা ধরা পড়েছে। ছেলেকে সব সময়ই কাছে কাছে রাখত।’
‘গোলোকটা তো এতক্ষণ ধরে ক্যানসারেরই গল্প শোনাল। ওর বউ নাকি কিছুতেই লুপ নেবেনা, নিলে নাকি ক্যানসার হবে। গোলক বলল, আরে কিছুতেই বোঝাতে পারলুম না। ওসব ডাক্তারদের বাজে কথা, ছেলেপুলে হওয়া বন্ধ হলে ওদের আয় কমে যাবে বলে ভয় দেখাচ্ছে। রোগের কারণটা জানলে তো তার ওষুধ বার করা সোজা। ক্যানসারের ওষুধ বেরোলনা শুধু এইজন্যই। লুপ নেওয়ার কারণে ক্যানসার হয়, জানলে তো বিরাট আবিষ্কার হয়ে যেত।’
