বরং থাক। পরে যখন দেখা হবে কোথাও তখনই নয় কথাটা বলবে। রতন ফিরে যাবে ঠিক করেছে তখনই একজন স্ত্রীলোক এসে কল বন্ধ করে বালতিটা তুলে ঘুরে দাঁড়িয়েই রতনকে দেখতে পেল। ভ্রূ কুঁচকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কে? কাকে চাই?’
‘শিবিকে।’
‘শিবি?’ অবাক হয়ে স্ত্রীলোকটি এগিয়ে এল। ‘শিবির তো পান বসন্ত হয়েছে, শুয়ে আছে। কী দরকার ওকে?’
গলার স্বর নরম, বোধহয় তার অশৌচের চেহারাটা দেখেই। রতন ভরসা পেয়ে বলল, ‘এমনিই এসেছি, ওকে একটা কথা বলব বলে।’
‘দাঁড়াও। …কী নাম তোমার ?’
নাম শুনে নিয়ে সে ঘরের দিকে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর ফিরে এসে বলল, ‘এসো। ঘরের ভেতর ঢোকো।’
রতন আন্দাজ করল ইনি শিবির মা। বাড়িতে আর কোনো লোক সে দেখতে পেল না। একখানি শোবার ঘর, তার বাইরে টালিতে ঢাকা চাতাল, পাশে ক্ষুদ্র একটা টালির চালের ঘর, বোধহয় রান্নাঘর, চাতালে কুটনো কোটা ফেলে জলের বালতি আনতে গেছল শিবির মা, ফিরে এসে বঁটি নিয়ে আবার বসল। রতন শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়াল। মশারি বেঁধে গুটিয়ে তুলে রাখা ছত্রি লাগানো খাটে শিবি শুয়ে, সারা শরীর ঢাকা সাদা বিছানার চাদরে, মুখ দরজার দিকে ফেরানো। রতনকে দেখে শুকনো হাসল। ঘরের দুটো জানলাই বন্ধ, রতনের মনে হল ওর হাসিতে ঘরের আবছা ভাবটা যেন কেটে গেল।
‘সেদিন বানিয়ে যা বলেছিলে তাই সত্যি হল।’ রতন নীচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘বাবা এইভাবেই মারা গেল। রাস্তায় পড়ে যায় অজ্ঞান হয়ে। …সেইদিনই।’
শিবির চোখ ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠল শুনতে শুনতে। বিছানায় সে ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই চাদরটা পড়ে গেল বুক থেকে। একটা ব্লাউজ পরে আছে, বোধহয় মায়ের, সামনের সব কটা বোতাম খোলা। সঙ্গে সঙ্গে রতন মুখ ঘুরিয়ে কুলুঙ্গির দিকে তাকাল। তার কান দুটো গরম হয়ে চোখে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্ত পরই শিবি তাড়াতাড়ি চাদরটা বুকের সামনে তুলে ধরল।
‘আমি!’ শিবি আর কিছু বলতে পারল না, চোখে উদভ্রান্ত অসহায় চাহনি। মুখ হাঁ হয়ে গেছে।
‘তোমার কোনো দোষ নেই। এ রকম তো মিলে যেতেই পারে।’ রতন ওকে আশ্বস্ত করতে চাইল।
‘পরদিন সকাল থেকেই আমার জ্বর হল।’
‘বাবা মারা গেছে পরদিনই ভোরে, হার্ট ফেল করে।’
শোনা মাত্র অস্ফুট শব্দ করে শিবি চাদর দিয়ে মুখ ঢাকল। রতনের মনে হল একটা হেঁচকি তোলার মতো শব্দও সে শুনল। মা আর দিদি ছাড়া বাড়ির বাইরে এই প্রথম সে বাবার জন্য একটা শব্দ কাউকে করতে শুনল।
‘আমি সত্যি সত্যি এ রকম কিছু ভেবে বলিনি, বিশ্বাস করো। মা কালীর দিব্যি…মজা করার জন্য বানিয়েছিলুম।’ শিবির চোখে মুখে, কণ্ঠস্বরে মাপ চাওয়ার মতো করুণ আবেদন। দু-চোখে অনুতাপ।
‘মজা করতে তুমি দেখছি খুব ভালোবাসো। কাকিমাকে গিয়ে সব বলে দিয়ে এসেছ? আমি মিথ্যেবাদী বনে গেলুম।’
শিবির চোখে লজ্জা ফুটে উঠল। সেটা ঢাকতে কথা ঘোরাল, ‘এখন তুমি কী করবে?’
‘কী আর করব। সামনেই পরীক্ষা…পড়ব।’ কুলুঙ্গির পাশে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে রতন নিরাসক্ত স্বরে বলল।
ছবিতে তিনটি মানুষ। দুজনকে সে চিনতে পারছে। চেয়ারে বসে শিবির মা, যার সিঁথিতে সে প্রথমেই লক্ষ করেছে সিঁদুর নেই, বিধবা। তার কোলে বছর পাঁচ-ছয়ের শিবি, চোখ দেখেই সে চিনেছে। চেয়ারের পিছনে মাথার চুল ওঠা, কোট গায়ে ধুতি পরা লোকটা বোধহয় শিবির বাবা। দুজনের চোখের মধ্যে মিল আছে। এ রকম কোনো ছবি তাদের ঘরে নেই। সাঁতারের কস্টিউম পরা গুপিনাথের একটা ছবি ছোটোবেলায় সে দেখেছিল মায়ের তোরঙ্গে।
ছবিটার দিকে রতনকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শিবি বলল, ‘আমি মা আর বাবা। আমার আট বছর বয়সে বাবা মারা যায়, লিভার পচে গেছল।’ একটু থেমে বলল, ‘খুব মদ খেত।’
রতন অপ্রতিভ বোধ করল। মদ তো খারাপ চরিত্রের লোকেরা খায়। বাবার সম্পর্কে এমন কথা বাইরের লোককে বলা ঠিক নয়। শিবির রাখঢাকটা কম, কাকে কী বলতে হয় জানে না।
‘কর্পোরেশনে কাজ করত, খুব শৌখিনও ছিল। এই দেখো না রেডিয়ো কিনেছিল।’ বাবার কথা বলতে গিয়ে শিবির চোখে আলো ফুটে উঠল। রতন দেখল ঘরের এক পাশে ছোটো একটা টেবিলের উপর রেডিয়ো।
রতন চুপ করে রয়েছে। গুপিনাথ খুব রোজগার করত না, খুব শৌখিনও ছিল না। শিবির কথা তার ভালো লাগছে না। নিজে একাই কথা বলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে শিবি কথা বন্ধ করল। দুজনেই চুপ। সেই সময় শিবির মা ঘরে ঢুকে খাটের তলা থেকে পানের বাটা বার করল। অনেকগুলো সাজা পানের খিলি থেকে একটা মুখে দিল তারপর এক চিমটে জর্দা। সে লক্ষ করল শিবির মা বেশ কমবয়সি, মেয়ের মতো অত কালো নয়। সাদা শাড়িটা ধবধবে। গলায় সরু সোনার চেন। ঠিক বিধবার মতো দেখতে লাগছে না।
‘তোমাদের বাড়িতে আর কে কে আছে? নিজেদের বাড়ি?’ পান চিবোতে চিবোতে শিবির মা জানতে চাইল।
‘ভাড়া বাড়ি। আছে মা দিদি আর কাকা।’
‘কী জাত তোমরা?’
‘বামুন।’
‘পড়ো?’
‘হ্যাঁ, ম্যাট্রিক দোব।’
‘বাবা কী করত?’
‘চায়ের দোকান আছে।’ বলেই দ্রুত যোগ করল, ‘খুব ছোটো দোকান।’ তার মনে হল শেষের কথাটা বলার দরকার ছিল না।
‘কে এবার দোকান দেখবে, তুমি, না কাকা?’
‘জানি না।’
‘কাকা কী করে?’
‘চাকরি করে…ট্রাম কোম্পানিতে।’
‘শিবির অসুখটা ছোঁয়াচে, তুমি আর এখানে থেকো না।’ কথাটা বলে শিবির মা পিক ফেলার জন্য রতনের গা ঘেঁষে ঘর থেকে বেরোল। সে সাবানের মিষ্টি গন্ধ পেল। রতন অপ্রতিভ বোধ করল এইভাবে সোজাসুজি তাকে চলে যেতে বলায়। শিবির দিকে তাকিয়েই সে চোখ নামিয়ে নিল। বুকের সামনে তুলে ধরা চাদরটা নামিয়ে ব্লাউজের টেপা বোতাম লাগাচ্ছে শিবি।
