বই লেনদেনের ফাঁকে সে মেঝেয় পড়ে থাকা বইগুলো থেকে বাছাবাছি করতে করতে একটা অভিধান পেল, বাংলা থেকে বাংলা। কার লেখা জানার উপায় নেই। প্রথম দিকের উনিশটা আর শেষের আটটা পাতা উইয়ে খাওয়া। এটা রেখে লাভ নেই, কোনো মেম্বারের অভিধান দরকার হবে না তাও আবার এমন নষ্ট হওয়া বই। বাড়িতে অভিধান নেই, রতন বইটা আলাদা করে রাখল। এটা সে নিয়ে যাবে। হোক ছেঁড়াখোঁড়া, অভিধান পড়তে তার ভালো লাগে। নতুন নতুন শব্দ জানা যায়, বানান ঠিক করে নেওয়া যায়। পরীক্ষার খাতায় তার বাংলা বানানের ভুল ধরে লাল কালির দাগ কোনো পরীক্ষক দিতে পারে না। আর সে সরিয়ে রাখল আধছেঁড়া একটা পৌরাণিক উপন্যাসের বই।
নিয়ম আছে পড়ার জন্য সাত দিনের বেশি বই রাখলে এক আনা জরিমানা দিতে হবে। বাচ্চচা কাজের মেয়ের হাত দিয়ে বই বদলাতে পাঠিয়েছে পাড়ারই এক গৃহিণী। দশ দিন পর। রতন জরিমানা চাইতে মেয়েটি বাড়ি ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর এক প্রৌঢ় এসে হাজির হল রাগে থমথমে মুখ নিয়ে।
‘এই লাইব্রেরির যখন জন্মো হয় তখন দশ টাকা ডোনেট করেছি আর কি না আমার কাছ থেকেই ফাইন চাইছ? তুমি তো সেদিনের ছেলে হে, জানো কবে থেকে আমি মেম্বার?’ লোকটি চেঁচিয়ে ঝগড়ার সুরে বলল। জরিমানা চাওয়ায় অপমানিত বোধ করেছে।
রতন বাকবিতণ্ডা এড়িয়ে চলতে চায়। মিনমিন করে বলল, ‘লাইব্রেরির যা নিয়ম আমি তাই বলেছি।’
‘নিকুচি করেছে নিয়মের, দাও দাও যা বই চেয়েছে দিয়ে দাও।’ স্লিপ খোঁজা বইটা টেবিলে আছড়ে ফেলল লোকটি। রতন স্লিপটা নিয়ে র্যাক থেকে বই খুঁজছে সেই সময় সে একটা আর্তনাদ শুনল, ‘রতু।’
রতন ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল দিদিকে। আলুথালু শাড়ি, দুটো চোখে আতঙ্ক। ‘বাবা দোকান বন্ধ করে বাড়ি আসছিল। লালার চায়ের দোকানের সামনে রাস্তায় পড়ে গেছে।’
নিজের অজান্তেই রতনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল অস্ফুটে, ‘ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কায়?’
‘অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। ওখানে যারা ছিল, তারা ট্যাক্সি করে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। তুই শিগগিরি আয়, কাকা অফিস থেকে এখনও ফেরেনি।’
‘কোন হাসপাতালে, আর জি কর-এ?’
‘হ্যাঁ, একটা ছেলে এসে খবর দিল।’
রতনের থরথর করে কাঁপা হাত থেকে বইটা মেঝেতে পড়ে গেল। জরিমানা দিতে না চাওয়া লোকটি বইটি তুলে নিয়ে নীচু স্বরে নরম গলায় বলল, ‘বন্ধ করে দাও লাইব্রেরি। …তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে যাও, যাও দেরি কোরো না। আর কাকাকে বলবে সঙ্গে যেন দু-তিনশো টাকা নিয়ে হাসপাতালে যায়।’
প্রায় দেড় মাইল দূরে হাসপাতাল। ট্রামের জন্য অপেক্ষা না করে রতন ছুটতে শুরু করল। খেলাধুলো করে না, অল্প ছুটেই হাঁফিয়ে পড়ল। কিছুটা জোরে হেঁটে আবার ছোটার চেষ্টা করল। এই সময় তার মনে পড়ল সকালে শিবির বলা কথাগুলো : ‘একটা বাচ্চচা ছেলে ছুটে এসে বলল, বাবা ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে, শিগগিরি এসো।’ আর দিদি এসে বলল : ‘তুই শিগগিরি আয়, বাবা অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে গেছে, একটা ছেলে এসে খবর দিল।’ দুজনের প্রায় একই কথা, কী অদ্ভুত মিল! অনেকেরই অমঙ্গুলে কথা এইভাবে মিলে যায়, হয়তো ওদের উপর কিছুর ভর আছে।
তিন
গুপিনাথ মারা গেল ভোরবেলায়। জ্ঞান আর ফিরে আসেনি। সারারাত ওয়ার্ডের বাইরে বসে ছিল বিষ্ণুচরণ আর রতন। দুজনের মধ্যে সামান্যই কথা হয়।
‘রতু খেয়ে আয়। বাইরের গেটের সামনে একটা মিষ্টির দোকান আছে।’
‘খিদে নেই। …তুমি তো সকালে ভাত খাওয়ার পর আর কিছু খাওনি।’
‘আমারও খিদে নেই। …সকালে লোকজন ডেকে আনতে হবে।’
‘কেন? …বাঁচবে না?’
বিষ্ণু জবাব দেয়নি। কিছুক্ষণ পর সে বলে, ‘দোকানের চাবিটা কোথায়?’
‘আমার কাছে, বাবার পকেটে ছিল।’
‘আর কী ছিল?’
‘একত্রিশ টাকা, বিক্রির, আর বাসি একটা জবা ফুল, পুজো দিয়ে মা এনেছিল।’
‘হার্টের রোগ অনেক দিনের, কাউকে কিছু বলেওনি, চিকিৎসাও করায়নি। …তোর সামনেই পরীক্ষা আর এই সময়ই।’ বিষ্ণু অন্যমনস্ক হয়ে চিন্তায় ডুবে গেল।
তিন দিন পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রতন স্যারের বাড়ি গেল। বাবার মৃত্যুর কথা সে এদের জানায়নি। তার কোরা ধুতি, কাছা, গলায় চাবি আর হাতে কম্বলের আসন দেখে বীণার হাত মুখের কাছে উঠে এল, ‘এ কী! কে মারা গেল?’
‘বাবা। হঠাৎ হার্ট ফেল করে।’
রতনের কাছে সব খুঁটিয়ে শুনল বীণা। অনাথ উদবেগ জানাল, ‘ভালো করে পড়। এ বার থেকে তুই রোজ আয়, অঙ্কে তোকে ঠিক পাশ করিয়ে দোব।’
বীণা বলল, ‘দ্যাখো তো, এতটুকু ছেলের ঘাড়ে কী বোঝা চাপল! বাপ থাকা মানে মাথার ওপর একটা চাল থাকা। যেমনই রোজগার করুক না কেন। এখন তো দিদির বিয়ে দিতে হবে, মাকে দেখতে হবে আবার পড়াশুনোও করতে হবে। কী যে দুর্ভোগে পড়লি।’
‘কাকা আছে, কাকাই তো সব দেখে।’
‘আজ আছে, বিয়ে থা করলে কী আর দেখবে? তুই তাড়াতাড়ি পাশ করে চাকরিবাকরির চেষ্টা দ্যাখ, নিজের পায়ে দাঁড়া।’
রতন নতমুখে শুনে গেল। স্যারের কাছে এক ঘণ্টা কাটিয়ে বই আর খাতা হাতে রাস্তায় বেরিয়ে এসে কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে সে ঢুকে পড়ল শিবিদের গলিতে। ওদের বাড়ির দরজাটা আধখোলা। ভিতরে ঢোকার সরু পথটা ইট বিছানো। সিমেন্টের ছোটো উঠোন, দু-তিন জায়গায় ভাঙা। উঠোনের কিনারে নর্দমা, দেয়ালে জলের কল আর একটা চৌবাচ্চচা। কলের মুখ থেকে একটা টিনের ডোঙা চৌবাচ্চচার পাড় পর্যন্ত। দেয়ালে শ্যাওলা। তারে একটা শাড়ি আর ব্লাউজ ঝুলছে। কল থেকে জল পড়ছে টিনের বালতিতে। রতন এইটুকু মাত্র দেখতে পাচ্ছে। এবার সে কী করবে? কোনো বাড়িতে গিয়ে একটা মেয়ের নাম ধরে ডাকলে সেই বাড়ির লোকেরা কী ভাববে! পিছনেই স্যারের শোবার ঘরের খোলা জানলা, কেউ যদি শুনতে পায়! তাছাড়া অপরিচিত একটা ছেলে এসে ডেকে কথা বললে শিবি বকুনিও খেতে পারে।
