পাড়ায় একটা লাইব্রেরি আছে, ‘তরুণ পাঠাগার’। তিন-চারজন তরুণ মিলে, তিরিশটি বই দিয়ে শুরু করেছিল। পনেরো বছরে বই-সংখ্যা প্রায় হাজারে দাঁড়িয়েছে। বাড়ি বাড়ি থেকে বই চেয়ে, সরকারের শিক্ষা বিভাগ আর কলকাতা কর্পোরেশনের বাৎসরিক দান থেকে বই কিনে এখন পাঠাগার মোটামুটিভাবে চলে। তবে এত কম বই থাকায় পড়ুয়া মেম্বাররা মাস কয়েক পরই সম্পর্ক ত্যাগ করে। যারা উদ্যোগী হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা এখন কাজকর্মে ব্যস্ত, সংসারী। পাঠাগারে রোজ এসে কাজকর্ম দেখা তাদের পক্ষে আর সম্ভব না হওয়ায়, দায়িত্ব এসে পড়েছে অল্পবয়সিদের উপরে। সপ্তাহে তিন দিন সন্ধ্যায় পাঠাগার দু ঘণ্টার জন্য খোলা, বই লেনদেনের আর চাঁদা নেওয়ার কাজ একাই করে রতন। অবৈতনিক কাজ।
বিকেলে সে বাড়ি থেকে বেরোল। তরুণ পাঠাগারে যাওয়ার আগে এক টাকা ছ-আনা ফেরত দিয়ে আসার জন্য। স্যারের বাড়ির আগের গলিটার দিকে পলকের জন্য সে তাকাল, কয়েকটা বাচ্চচা ছেলেমেয়ে জল-কুমির খেলছে। যদি ওকে দেখতে পেত তাহলে কী করত? রতন ভাবল, একটু হেসে চলে যেতুম। কিংবা বলতুম, ‘ফেরত পয়সাটা দিতে যাচ্ছি।’ শুনে হয়তো হাসত, খই ছড়িয়ে পড়ত ঠোঁট দুটোর মাঝখানে। কিংবা গোল গোল চোখদুটো বড়ো করে ও হয়তো বলত, ‘সকালের রেশনের পয়সাটা দিতে যাচ্ছ বুঝি?’
অনাথের বউ বীণা কিছু বলার আগেই রতন বলল, ‘বাবা ভালো আছে কাকিমা। হাঁটুতে একটু লেগেছে, কনুইটা ছড়ে গেছে-‘
‘থাম হতভাগা।’ বীণা চেঁচিয়ে উঠল। ‘মিথ্যে কথা বলার আর লোক পেলি না, আমি কিছু জানি না ভেবেছিস?’
রতন হতভম্ব হয়ে গেল। কাকিমা জেনে ফেলেছে। কী করে?
‘শিবি আমায় সব বলে দিয়েছে।’
‘শিবি! শিবি কে?’
‘আর ন্যাকামি করতে হবে না। আমার অতটা আটা তুই রাস্তায় ফেলে আবার রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে থলিতে ভরেছিস? সেই আটা আমাদের খাওয়াবি?’
পাথর হয়ে গেল রতন। তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। এখন আর মিথ্যা কথা বলে লাভ নেই। ‘ওই মেয়েটাই আমাকে নিজে থেকে বলল পৌঁছে দিয়ে আসব আমাকে দাও, তাই দিলুম। ওই আমাকে গল্প বানিয়ে মিথ্যে কথা বলেছে।’
‘হ্যাঁ, এখন তো এইসব বলবি। এই তো বললি বাবার হাঁটুতে লেগেছে, কনুই ছড়ে গেছে, এসবও কি শিবির বানানো। দ্যাখ রতন, ধম্মের কল বাতাসে নড়ে। তোকে দেখতেই ভালোমানুষ, আসলে তুই মিটমিটে শয়তান। সব আটা আমায় ফেলে দিতে হল। এক পয়সা মাইনে তো দিস না আর এতগুলো পয়সা ক্ষতি করে দিলি!’
রতনের চোখ জলে ভরে এসেছিল। এবার টপটপ করে পড়তে শুরু করল। স্যারের কাছে অঙ্ক শেখা আর হবে না। বাবা ধরাধরি করে বিনি পয়সায় শেখার ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। সেই কোন যুগে স্যারের মা গঙ্গায় চান করতে গিয়ে ভেসে যাচ্ছিল জোয়ারে, বাবা সাঁতরে গিয়ে তাকে পাড়ে টেনে তোলে। ঘটনাটা স্যারের মনে ছিল বলেই গুপিনাথের অনুরোধে তাকে অঙ্ক শেখাচ্ছে। কিন্তু কাকিমার এই রাগের পর আর কী সে এ বাড়িতে ঢুকতে পারবে? বউয়ের কথায় স্যার তো ওঠেবসে।
‘তুই কোন আক্কেলে রাস্তার আটা আমাদের খাওয়াবি ভাবলি?’
‘আমি ভাবিনি। ওই মেয়েটাই কুড়িয়ে তুলে দিল আর ভয় দেখাল বুড়ির মা ভীষণ দজ্জাল, সত্যি কথা বললে তোমার ধুধ্বুরি ছুটিয়ে দেবে। তারপর ও নিজেই বলল রেশনটা দিয়ে আসছি। দিয়ে এসে বাবার ঘোড়ার গাড়িতে ধাক্কা লাগার গল্পটা বলল। কী সাংঘাতিক এই মেয়েটা।’ রতন দেখছিল তার কথা শুনতে শুনতে বীণার মুখের ভাব বদলাচ্ছে। ‘আর বলল আপনি মহা কিপটে।’
‘আর কী বলেছে?’ থমথমে গলায় বীণা জানতে চাইল।
‘আর কিছু না। কাকিমা বিশ্বাস করুন, গায়ে পড়ে ও আমাকে বলল রেশন পৌঁছে দেবে, এমন যে মিথ্যে বানিয়ে বলবে আমি জানতুম না। আমি ওর মজা বার করছি।’
উত্তেজিত রতন সদর দরজার দিকে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে একটা টাকা ছ-আনা বার করে বীণার হাতে দিল, ‘ফেরত পয়সা।’
‘তুই শিবিকে চিনতিস?’ রেজগি গুনতে গুনতে বীণা বলল।
‘না।’
‘খুব খারাপ মেয়ে, ওর মাটাও খারাপ। ভীষণ গায়েপড়া, খবরদার ওর সঙ্গে কথা বলবি না, বলতে এলেও বলবি না।’
বীণার রাগটা ঘুরে গেছে রতনের মনে হল, তাহলে এ বাড়ির দরজা তার জন্য বোধহয় খোলাই থাকবে। ওই শিবি মেয়েটাকে কাকিমা একদমই পছন্দ করে না। ওকে আচ্ছা করে কথা শোনালে কাকিমা নিশ্চয় খুশি হবে। কী কথা শোনাবে তাই ভাবতে ভাবতে রতন তরুণ পাঠাগারে পৌঁছল।
বড়োজোর দশ-বারোজন বই পালটাতে আসে। দু-ঘণ্টার বেশিরভাগটাই রতন বই পড়ে কাটায়। পড়ার ব্যাপারে তার বাছবিচার নেই। শরৎ গ্রন্থাবলির মতোই মোহন সিরিজও সে গোগ্রাসে পড়েছে। পথের পাঁচালী যেমন তার ভালো লেগেছে, তেমন রবার্ট ব্লেকের ডিটেকটিভ কাহিনিও। নতুন যেসব বই কেনা হয়েছে তারই একখানা, সতীনাথ ভাদুড়ী নামে নতুন এক লেখকের ‘জাগরী’ নামের উপন্যাসটার আধখানা পড়া হয়েছে। বইটা সে লুকিয়ে রেখেছে র্যাকে অন্যান্য বইয়ের পিছনে, যাতে কারুর নজরে না আসে, দেখতে পেলেই তো চেয়ে বসবে। বাড়িতে সে বই নিয়ে যায় না, কাকা নাটক-নভেল পড়া পছন্দ করে না। পাড়ারই অধীরবাবু অনেকগুলো ছেঁড়া পুরোনো বই দান করে গেছে, সেগুলো মেঝেয় পড়ে। রতনকে পাঠাগারের সেক্রেটারি বলেছে, ওর থেকে বেছে, আস্তগুলো রেখে দিয়ে, বাকি বই ফেলে দিতে।
