এক টাকা নোটটা দেখে রতন বলল, ‘আমার কাছে তো ভাঙানি নেই।’ বলেই মনে পড়ল তার পকেটে রেশন ফেরত এক টাকা ছ-আনা রয়েছে। সে পকেটে হাত ঢোকাল। ‘আছে আমার কাছে।’
‘থাক এক আনা আর ফেরত দিতে হবে না। তুমি দোকানে কী করো?’
রতন থতমত হল। তাকে বোধহয় কর্মচারী ভেবেছে। ভাবলে দোষ দেওয়া যাবে না। তার চেহারায় এমন কিছু বিশেষত্ব নেই চোখে পড়ার মতো, যেমন রয়েছে এই দুজনের মধ্যে। গায়ের রঙের মতোই তার হাফ প্যান্ট, শার্ট, চটি সবই ময়লা আর কমদামি, চুলও রুক্ষ ঝাঁকড়া। শুনেছে তার চোখ-মুখ মিষ্টি আর নিরীহ। কিন্তু তাই দিয়ে তো কাউকে বোঝা যায় না সে মালিক, না চাকর। অনেক চাকরই মনিবের থেকে দেখতে সুন্দর হয়। দোকানটা এত ছোটো আর দরিদ্র যে মালিকের ছেলে বললে এরা তাকে পাত্তা দেবে না।
‘যিনি টাইপ করছেন তিনি আমার বাবা।’ রতন আত্মসমর্পণের মতো স্বরে বলল। কেন বলল তা সে জানে না। আপনা থেকেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। এদের সামনে নিজেকে ক্ষুদ্র বিবেচনা করতে তার লজ্জা হচ্ছে না। ‘টাইপরাইটারটা খুব পুরোনো।’
‘তোমার বাবা?…আচ্ছা। তুমি কী করো, পড়ো?’
‘এবার ম্যাট্রিক দোব।’ রতন দেখল রমলা মুখ তুলে তাকাল। কৌতূহলী চোখ।
‘কোন স্কুলে পড়ো?’
‘সত্য শ্রীমানী বিদ্যালয়ে।’
রমলার মা ভ্রূ তুললেন। নামটা কখনো শুনেছেন কি না মনে করার একটা চেষ্টা চোখে ফুটে উঠল। রতন মনে মনে কুঁকড়ে এল। কৈফিয়ত দেবার মতো স্বরে বলল, ‘খুব ছোটো স্কুল, নিমতলায়।’
‘ভালো করে প্রিপারেশন করছ তো।’ তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন। রমলা মাথা নীচু করে নিল। ‘তখন তোমাদের দোকানে গিয়ে বলতে ভুলে গেলাম এক পাউন্ড চা চাই। রমু গদাকে বলো তো চা আনতে।’
‘আমি এনে দেবো?’ ব্যগ্র হয়ে রতন বলল।
‘না না তুমি আনবে কেন? …আচ্ছা, এবার আমাকে তো এখুনি কলেজ যেতে হবে। বইটা একদিনের জন্য এনেছি। ফেরত দিতে হবে আজই’ খুবই মিষ্টি করে তিনি রতনকে বিদায় জানালেন।
রতন ফিরে এল দোকানে, গুপিনাথ টেবিলে কপাল ঠেকিয়ে কুঁজো হয়ে রয়েছে। রতন ‘বাবা’ বলে ডাকতে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। মুখে অসুস্থ অবসন্ন ভাব, চোখ বসে গেছে। প্রায়ই বুকে ব্যথা হয়। কোবরেজ মশাইকে দেখিয়েছিল। তার দেওয়া ওষুধই খাচ্ছে। ‘শরীরটা ভালো ঠেকছে না…দিয়ে এলি? কপি দেখে কিছু বলল?’
‘কী আবার বলবে,’ রতন এক টাকার নোটটা টেবিলে রাখল। ‘এবার এই টাইপ রাইটারকে সের দরে বেচে যাও….লোকে হাসে।’
‘বেচব কেন, অসুবিধে তো করছে না।…তুই টাইপিংটা শেখ না। রোজ কিছুক্ষণ প্র্যাকটিস কর আমি দেখিয়ে দেব। আর সেই সঙ্গে শর্ট হ্যান্ডটাও যদি শিখে নিতে পারিস চাকরি বাকরি পেতে সুবিধে হবে, বিষ্টু বলছিল ওদের অপিসে টাইপিস্ট নেবার কথা হচ্ছে। রেগুলার প্র্যাকটিস করলে-‘
‘না।’ রুক্ষ স্বরে রতন বাবাকে থামিয়ে দিল। ‘চাকরিবাকরি পরে হবে, বি এ পাশ করার পর। তাছাড়া কাকার অফিসে আমি চাকরি করব না।’
‘কেন!’ গুপি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
‘কেন আবার কী? কাকার আচার-ব্যবহার দেখো না? আমাদের তো মানুষ বলেই গ্রাহ্য করে না। কথায় কথায় খোঁটা দেয়। …সংসারে কটা টাকা দিয়ে যেন সবার মাথা কিনে নিয়েছে।’
‘এভাবে কথা বলিসনি, রতু, বিষ্টু আমাদের জন্য অনেক করে। সংসার তো ওই চালায়, আমার আর রোজগার কী? বাড়ির বিক্রির আদ্দেক টাকা তো ওর পাওয়ার কথা কিন্তু কোনোদিন ভাগ চায়নি। আমি নিজের দেনা শো করেছি তাই দিয়ে, এই দোকানটা কিনেছি, অবশ্য মায়ের শ্রাদ্ধও সেই টাকায় করেছি। তাহলেও বি এস পাশ করানো ছাড়া ওকে আমি কিছুই দিইনি, উলটে সংসারটাই ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছি… বিয়ে থা করেনি, সে তো তোদেরই জন্য।’ একটানা কথাগুলোকে প্রায় আবেদন জানানোর মতো ভঙ্গিতে বলে গুপি হাঁফাতে লাগল। বুকের ব্যথাটা বাড়ছে।
রতন মুখ নামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘দোকানটা বিক্রি করে দাও, তোমার পক্ষে আর চালানো সম্ভব নয়।’
‘সে কী রে, তুই দোকানে বসবি না?’
‘না। এইটুকু জায়গায় দশ-বারো ঘণ্টা বসে জীবন কাটাতে পারব না।’ কথাটা বলে উত্তরের অপেক্ষায় সে আর দাঁড়াল না। বাড়ি ফিরে সে সুখতলা খয়ে যাওয়া জীর্ণ চটিটা খুলে উমারানিকে বলল, ‘মা, কাকাকে বলো না একজোড়া কাবলি শ্যু কিনে দিতে। এই চটিটা দিয়ে আর হাঁটা যায় না।’
‘তুই নিজে বল না।’
‘না।’
বিষ্ণুচরণ, মা মারা যাওয়ার পর ঘরটায় একাই থাকে। ট্রাম কোম্পানিতে চাকরি করে ক্যাশ বিভাগে। অফিস যাবার সময় ঘরে তালা দিয়ে যায়। সে কাউকে বিশ্বাস করে না। কাঠখোট্টা, সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলা হিসেবি লোক। কোনো নেশা নেই। খবরের কাগজ ছাড়া কিছু পড়ে না। কারুর সঙ্গে ঝগড়া করে না। খুব ভোরে ওঠে, থলি নিয়ে বাজার যায়। প্রতি মাসে ইলেকট্রিক বিলের টাকা দেয়, রতনকে জমা দিয়ে আসার জন্য-আর স্কুলের মাইনে। বাড়িভাড়া কুড়ি টাকা থেকে বাইশ টাকা হয়েছে বাড়িউলি বেঁচে থাকতেই। ভাড়ার টাকা বিষ্ণু দেয় এবং রেশনেরও। এখন সে ব্যস্ত ভাইঝি মানসীর জন্য পাত্র খোঁজায়। উনিশ পার হতে যাচ্ছে আর ওকে ঘরে রাখা ঠিক নয়। একমাত্র এই ভাইঝির সঙ্গেই সে নরম স্বরে কথা বলে, আবদার করে কিছু চাইলে প্রত্যাখ্যান করে না। ক্লাস এইটের পর মানসীকে বিষ্ণুই স্কুল ছাড়িয়েছে। বাড়ন্ত গড়ন, দেখতেও সুশ্রী, অতটা হেঁটে স্কুলে যাওয়াটাকে বিষ্ণু বিপজ্জনক মনে করে। এতে অবশ্য কেউ আপত্তি তোলেনি শুধু রতন ছাড়া। তবে সেই ভাবেই বলেছিল যাতে আপত্তিটা কাকার কানে না পৌঁছয়। বাড়ির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নষ্ট হওয়ায় মানসী কান্নাকাটি করেছিল কিন্তু বিষ্ণু টলেনি। একটা পুরোনো হারমোনিয়াম কিনে দিয়ে বলেছিল, ‘ঘরে বসে গান শেখ।’
