বেশি ঘষা আর ছাপ না পড়া অক্ষরগুলো সে কলম দিয়ে ঠিক করে দিতে লাগল দাঁড়িয়েই।
‘ঘণ্টা খানেক আগে দিয়ে গেল, এক্ষুনি চাই।’ গুপি বলল।
‘কী বই?’
‘কে জানে। কলেজে পড়ায়, পড়ার বই-টই হবে।’ গুপি কি বোর্ডে চোখ রেখে দায়সারা উত্তর দিল। রতন বুঝল, বাবার পক্ষে এই বইয়ের ইংরিজি পড়া সম্ভব নয়। তার নিজের পক্ষেও সম্ভব নয়। বেশ শক্ত শক্ত বানান আর মানে করাও শক্ত। সে কিছু চেনা শব্দ থেকে বুঝছে এটা আর্য সভ্যতার ব্যাপার নিয়ে লেখা।
‘কে টাইপ করতে দিল?’
‘এই দুটো বাড়ি পরে বারান্দাওলা বাড়িটায় থাকে, প্রফেসার… মেয়েছেলে, বিধবা। আমার কাছ থেকেই বারো টাকা পাউন্ডের চা নেয়। বলল, বইটা আজই ফেরত দিতে হবে।’
বিড়বিড় করে বই থেকে শব্দগুলো বানান করে করে গুপি টাইপ করছে। রতনের মনে হল, এত অশিক্ষিতের পক্ষে টাইপিস্ট হওয়া চলে না। চাকরির দরখাস্ত পর্যন্ত ঠিক আছে। তার থেকে অন্যরকম কিছু হলে, যেমন এই বইটা, তাহলেই মুশকিলে পড়ে বাবা।
‘রতু, এগুলো দিয়ে আসতে পারবি?’ গুপী টাইপ শেষ করে কাগজটা রতনের দিকে এগিয়ে দিল। ‘ভুলটুল কিছু হয়েছে?’ উদবেগ নিয়ে বলল।
‘হয়েছে কি না জানি না। … রিবনটা বদলাবে তো, এত খারাপ টাইপ দেখলে কী বলবে!’
গুপি অবসাদগ্রস্তের মতো চোখ নিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে লজ্জার আভাস। ‘রিবন কিনে আনব ভাবছিলুম, কিন্তু এমন ব্যস্ত হয়ে বলল এক্ষুনি চাই… পড়তে তো অসুবিধে হচ্ছে না, হচ্ছে?’
রতন জবাব না দিয়ে পাঁচটা পাতা জড়ো করে গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘কিছু বলতে হবে?’
‘কী আর বলবি। বইটা সঙ্গে নে।’
বারান্দাওলা বাড়ির সদর দরজাটা খোলা রয়েছে। ভিতরে ঢুকে রতন চাকরের মতো একজনকে দেখে বলল, ‘এখানে প্রফেসর কে আছেন?’
লোকটার মুখ ভরতি পান। গাল দুটো ফুলে রয়েছে। মুখটা উঁচু করে যাতে পিক না বেরিয়ে আসে, কোনোক্রমে বলল, ‘এই থিড়ি দিয়ে ওপরে থলে যাও, ডানদিকে ঘর।’
পুরোনো বাড়ি, বেলে পাথরের সিঁড়ি। রতন দোতলায় উঠে এসে ডানদিকে একটা ঘর দেখল। দরজায় নীল পর্দা ঝুলছে। জানান না দিয়ে ঘরে ঢোকা ঠিক নয়। কিছু বলে ঢোকা উচিত কিন্তু কী বলবে, সে তো প্রফেসরের নাম জানে না। ইতস্তত করে পর্দার একটা ধার সরিয়ে সে ভিতরে উঁকি দিল। প্রথমেই চোখে পড়ল কয়েকটি বই ভরা আলমারি। পর্দাটা আর একটু সরাতে দেখতে পেল একটা টেবিল তার উপর ছড়ানো বই আর খাতা। একটি মেয়ে মাথাটা হেলিয়ে একমনে কী লিখছে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল। ধবধবে রং। কানে ইয়ার রিং। আঙুল দিয়ে নাকের পাশ চুলকে মুখটা তুলে অন্যমনস্কের মতো তাকাল।
‘কে? কী চাই?’ অবাক হয়ে গেছে পর্দা সরিয়ে একজনকে তাকাতে দেখে।
‘ভেতরে আসব?’ রতন কুণ্ঠিত স্বরে বলল। মেয়েটি মাথা নাড়ল।
‘টাইপ করতে দিয়েছিলেন, নিয়ে এসেছি।’ রতন টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
‘দেখি।’ হাত বাড়াল মেয়েটি। ‘মা টাইপ করতে দিয়েছিল পাশের চায়ের দোকানে।’ কাটা কাটা উচ্চচারণ, নরম গলা। রতন এমন ধীরভাবে কাউকে কথা বলতে শোনেনি।
‘হ্যাঁ আমার বাবাকে।’
পাতাগুলো একটা একটা করে দেখছে। রতন ওর মুখের ভাব তীক্ষ্ন চোখে লক্ষ করে যাচ্ছে। ভ্রূ দুটো কুঁচকে, একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে রয়েছে মুখে। কাগজগুলো রেখে উঠে দাঁড়াল। ‘মাকে ডেকে আনছি, তুমি বসো।’
ঘরের আর একটা দরজা দিয়ে মেয়েটি বেরিয়ে গেল। রতনের চোখে পড়ল ওর পায়ে লাল কাপড়ের চটি। আরও দুটো কাঠের চেয়ার রয়েছে। রতন বসল। ঘর থেকে বাইরের বারান্দায় যাওয়া যায়। বারান্দায় টবে চন্দ্রমল্লিকা ফুল ফুটে রয়েছে। দেওয়ালে দুটো বড়ো ছবি। কাঁধে পাট করা শাল, গোঁফওলা এক বৃদ্ধ চেয়ারে বসে, হাতে ছড়ি, পায়ে পাম্পশু, ধুতির পাড়টা চওড়া। অন্য ছবিটা একজন অল্পবয়সির। কোট পরা, গলায় টাই, ছবিটা বুক পর্যন্ত। ঝকঝকে চোখে হাসি ফুটে রয়েছে। কপালটা সামান্য উঁচু, অনেকটা এই মেয়েটির মতো। একটা সোফাও রয়েছে। টেবিলে ক্যালেন্ডার, কলমদানি আর ব্লটিং প্যাড।
রতন ছড়ানো খাতাগুলোর একটা মলাটে ইংরেজিতে লেখা নামটা পড়ল, ‘রমলা লাহিড়ী। বেথুন স্কুল।’ ক্লাস টেন-এ পড়ে। সেকশন আর রোল নম্বরও লেখা। সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে সে খাতাটা একটু খুলল। সুন্দর হাতের লেখা। তিন-চারটে লাইনে চোখ বুলিয়ে তার মনে হল জাজমেন্ট সিট অফ বিক্রমাদিত্য থেকে প্রশ্নের উত্তর। সেও এবার পরীক্ষা দেবে কিন্তু প্রশ্নের উত্তর লেখা এমন কোনো খাতা তার নেই। যারা ভালো রেজাল্ট করতে চায় তাদেরই এইরকম খাতা থাকে, তারা সারাদিন পড়ে। হয়তো সন্ধ্যায় মাস্টার আসে পড়াতে।
‘কই দেখি…খুব তাড়াতাড়ি হল দেখছি।’
রতন দাঁড়িয়ে পড়ল। রমলার দিদি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। সোনালি ফ্রেমের চশমা, কানে মুক্তো, হাতে দু গাছা সোনার চুড়ি, হালকা হলুদ রঙের তাঁতের শাড়ি, কবজিতে ঘড়ি, হাতে একটা ব্যাগ। এত সুন্দর স্ত্রীলোক আগে সে কখনো দেখেনি। তার মনে হল এখুনি বোধ হয় উনি বাইরে কোথাও যাবেন।
টাইপ করা পাতাগুলো উলটে পালটে দেখে হাসলেন। ‘পড়া যাচ্ছে। যাক তাড়াতাড়ি তো পেলাম।’
মন্তব্যটা শুনে রতনের মুখ গরম হয়ে উঠল। রমলার মা হাত ব্যাগ খুললেন। ‘কত দিতে হবে? তিন আনা করে তো?’
