কয়েকমাস গুপির ব্যবসা ভালোভাবে চলার পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। এরপরই তার ব্যবসা গোঁত খেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করে। দু-একজন তাকে পরামর্শ দিল, ঘিয়ের সঙ্গে চর্বি মেশাতে। গুপি রাজি হয়নি। তার কপাল এমনই মন্দ যে শম্ভুচরণও এই সময় সন্ন্যাসরোগে মারা গেলেন। আর গুপিকেও বিছানায় ফেলে দিল অত্যাচারে বিধ্বস্ত শরীর। পাকস্থলী, লিভার এবং ফুসফুস একসঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তার স্বাস্থ্য এবং ব্যবসাটাকে ধসিয়ে দিল। ভাই বিষ্ণুচরণ তখন সদ্য কলেজে ঢুকেছে আই এ পড়ার জন্য। ব্যবসা দেখার ভার তার উপর ছেড়ে দিয়েছিল গুপি। বিষ্ণুর পক্ষে উত্তরপ্রদেশি আড়তদারদের অসাধুতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যবসা ডুবে গিয়ে গুপির ঘাড়ে হাজার সাতেক টাকার দেনা চাপল। মোটরবাইক, সোনার হার, আংটি বিক্রি করেও অনেক টাকার দেনা বাকি রয়ে গেল। তখন রতন আর তার দিদি মানসী নেহাতই শিশু।
বাড়িটা ছিল গুপিনাথের মায়ের নামে। মা এবং ভাইকে বুঝিয়ে সে বাড়িটা বিক্রি করাল। তখন জাপানিরা রেঙ্গুনের কাছাকাছি এসে পড়েছে। বর্মা থেকে মানুষজন হেঁটে হেঁটে ভারতে পালিয়ে আসছে। কলকাতায় ব্ল্যাকআউট। সন্ধ্যার পর জামার হাতায় লাল পটি জড়ানো সিভিক গার্ড রাস্তায় টহল দিয়ে ফেরে। জানলা দিয়ে একটু আলো বেরোলেই কড়া নাড়ে। ফাঁকা জমিতে ইংরেজি ‘জেড’ অক্ষরের মতো স্লিট ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। মাঝে মধ্যে সাইরেন দিনের বেলায় বাজে, রাতে তো বাজেই…। কলকাতার লোকেরা বোমার ভয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে পালাচ্ছে। বাড়ি কেনার খদ্দের কোনোক্রমে জোটানো গেল। অর্ধেকেরও কম মাত্র কুড়ি হাজার টাকায় বাড়িটা বিক্রি করতে হল।
দেনা শোধ করে গুপিনাথ খুঁজেপেতে দর্জিপাড়ায় এক বুড়ি বিধবাকে বার করল যার তিনকুলে কেউ নেই। অলিগলিতে তখন বাড়ির সদর দরজায় ‘টু লেট’ লেখা টিনের প্লেট আঁটা। সস্তায় ঘর বা বাড়ি ভাড়া প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে। বিধবা বুড়ি থাকে ছোটো একটা ছাদ নিয়ে দোতলার একখানা ঘরে। নীচের দুটো ঘর ভাড়া দেওয়া ছিল। ভাড়াটে সপরিবারে পালিয়ে গেছে ভদ্রেশ্বরে। বুড়ির একমাত্র আয় বন্ধ। এমন সময় গুপিনাথকে পেয়ে বুড়ি বেঁচে গেল। গোটা একতলাটা সে কুড়ি টাকা ভাড়ায় পায়। তেরোর-এক নম্বর নব মিত্তির লেনের এই বাড়িতে এসে রতন প্রথম ভরতি হল স্কুলে-সরস্বতী পাঠশালায় ইনফ্যান্ট ক্লাসে।
দুই
গ্রে স্ট্রিট আর গৌরব দত্ত স্ট্রিটের মোড়ে গুপিনাথের পাতা আর গুঁড়ো চায়ের দোকান। হেঁটে বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। রতন মেপে দেখেছে দোকানটা ঠিক চার হাত চওড়া। কাউন্টার হল একটা তিন হাত চওড়া টেবিল। দোকানের ভিতরে ঢোকার পথ এক হাত চওড়া। টেবিলের উপর চারটে লাল রঙের টিনের বড়ো কৌটো। প্রতিটিতে সাদা রঙে লেখা ‘চা’। ঘরটা লম্বায় বারো হাত। তার শেষপ্রান্তে দেয়ালে ঘেঁষে একটার উপর একটা চায়ের পেটি। গুপিনাথের বসার জন্য একটা হাতলওলা কাঠের চেয়ার, তার ডান দিকে একটা কাঠের র্যাক, তাতে বসানো আছে দাঁড়িপাল্লা, বাটখারা, পেটি থেকে চা বার করার ডালা, আর একটা পুরোনো দশ-সেরি রেমিংটন টাইপ মেশিন। দোকানের মাথায় সাইনবোর্ডে লেখা ‘উমা টি স্টোর্স’। তার নীচে ছোটো অক্ষরে ‘খাঁটি দার্জিলিং ও আসাম চা পাওয়া যায়।’ দোকানের দরজায় পেরেকে ঝুলছে একটা স্লেটের কালো টিনে সাদা অক্ষরে লেখা ‘এখানে টাইপ করা হয়।’
রতন ট্রামরাস্তার ওপার থেকে দেখল চেয়ারটা ঘুরিয়ে বসে বাবা টাইপ করছে। বুকের মধ্যেকার অস্বস্তি ভাবটা কেটে গিয়ে এবার সে অবাক হল। গত এক বছরের মধ্যে বাবাকে কেউ কিছু টাইপ করতে দিয়েছে বলে তার মনে পড়ল না। টাইপ মেশিনটা ছিল তাদের বাড়িওয়ালি বুড়ির, যাকে সে নতুন ঠাকমা বলে ডাকত। তখনও বেঁচেছিলেন তার নিজের ঠাকুমা, গুপিনাথের মা। নতুন ঠাকমার কাছে একজন ওটা বাঁধা রেখে তিরিশ টাকা নিয়েছিল। কিন্তু আর ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। বছর চারেক খাটের নীচে পড়েছিল, গুপিনাথ তিরিশ টাকা দিয়ে সেটা কিনে নেয়। এক সময় সে টাইপ স্কুলে ভরতি হয়েছিল বাবার চাপে, যদি কোথাও টাইপিস্টের চাকরি পায়। টাইপ করাটা ভালোই শিখেছিল। কিন্তু টাইপিস্ট হওয়ার বদলে সে ঘিয়ের ব্যবসা শুরু করে, টাইপ করাটা প্রায় ভুলেই যায়।
টাইপ মেশিনটা গুপি যখন পেল তখন সে বাড়ি বিক্রির টাকার কিছুটা দিয়ে চা-এর দোকান খুলেছে। মেশিনটা দোকানে নিয়ে গেল এই আশায়, চা বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করেও কিছু উপরি রোজগার করবে। কিন্তু তা আর হয়নি। মেশিনের অক্ষরগুলো এমনই ঘষা যে ছাপ কাগজে ভালোমতো পড়ে না, পাঁচ-ছটা অক্ষর আধভাঙা, টাইপের পর কালি বুলোতে হয়। অক্ষরের মাঝের ফাঁকগুলোও অসমান থাকে। এইসবের জন্যই একবার যে টাইপ করিয়েছে দ্বিতীয়বার সে আর আসে না। গুপিনাথ ফুলস্ক্যাপ পাতার চার আনা রেট কমিয়ে বারো পয়সা করেছে, তবুও খদ্দের আসে না।
বাবাকে টাইপ করতে দেখে রতন রাস্তা পার হয়ে দোকানের দরজায় দাঁড়াল। গুপি ঘাড় গুঁজে টাইপ করছে একটা খোলা বই থেকে। দুটো বাটখারা বইয়ের পাতার উপর। মোটা পুরোনো বই, পাতাগুলো হলদেটে।
‘এসেছিস, ভালোই হল। এগুলো একটু ঠিক করে দে তো।’ গুপি মেশিনের পাশে রাখা টাইপ করা তিনটে পাতা হাত দিয়ে ঠেলে দিল। রতন টেবিলের ড্রয়ার খুলল ফাউন্টেন পেনটা বার করার জন্য। একটা বাটিতে খুচরো রেজগি থাকে। সেটায় কিছু দু আনি, সিকি, একটা ক্লিপে পাঁচ টাকা আর এক টাকার নোট। আজকের সকালের বিক্রি।
