‘কী বলেছ কাকিমাকে?’ মেয়েটি দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই রতন বাইরে দাঁড়িয়ে বলল। সে অধৈর্য হয়ে পড়ছে। অস্বস্তির চাপ আর সে নিতে পারছে না। খুব ভুল করেছে মেয়েটির কথা শুনে, ওর হাত দিয়ে রেশন পাঠিয়ে। ও মিথ্যা কথা বলতে পারে, সে পারে না। ওর সাহস আছে, তার নেই। ভয় না পেলে সে এভাবে ওর খপ্পরে পড়ত না। রতনের রাগ ধরল নিজের উপর। সব ব্যাপারেই তার ভয়। কত ছেলে পরীক্ষায় টুকল, সে যদি পারত, তাহলে অঙ্কে ফেল করত না।
‘বলেছি ছেলেটার কথা শুনে তুমি আমার হাতে থলিগুলো দিয়ে বললে, ‘এগুলো স্যারের বাড়িতে পৌঁছে দেবে?’ আমি বললুম, ‘হ্যাঁ দেব।’ তারপর তুমি ছুটতে ছুটতে চলে গেলে। এতগুলো জিনিস একা বয়ে আনতে গিয়ে খানিকটা আটা পড়ে গেছে। …এই দ্যাখো।’ মেয়েটি তার বুকের বাঁ দিক আঙুল দিয়ে দেখাল। রতন দেখল সত্যিই ফ্রকের উপর আটা গুঁড়ো লেগে রয়েছে। চটপট বেশ তো মিথ্যা কথা তৈরি করে ফেলতে পারে।
‘বাড়ির ভেতর ঢোকার আগে খানিকটা আটা লাগিয়ে নিয়েছি।’ মেয়েটি খুক খুক করে হাসল। ‘এই সরে এসো, সরে এসো।’
‘কেন।’ রতন ভ্রূ কুঁচকে পিছন দিকে তাকিয়ে দ্রুত বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার পিছনেই অনাথ ঘোষের বাড়ির খিড়কি। শোবার ঘরের একটা জানলা সে দেখতে পেল। জানলাটা বন্ধ।
‘আমাদের ঘরের জানলায় দাঁড়ালে ও ঘরটার অনেকখানি দেখা যায়।’
রতন কথাটা গ্রাহ্য না করে জানতে চাইল, ‘কাকিমা শুনে কী বলল?’
‘বলল কতটা আটা পড়েছে? বললাম চার খানা রুটির মতো হবে। শুনেই মুখটা প্যাঁচার মতো হয়ে গেল। মহা কিপ্টে তো, চারখানা রুটি সোজা কথা! আমাকে আর কিছু বলল না, ছোটোবেলা থেকে দেখছে তো।’
‘বাবার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে শুনে কিছু বলল?’
‘বলল, ‘অজ্ঞান যখন হয়ে গেছে তা হলে রতন আজ আর এখানে আসতে পারবে না, রেশন ফেরত পয়সা তোর হাতে দিয়েছে নাকি?’….তোমার নাম রতন?’
‘হ্যাঁ। এক টাকা ছ-আনা ফিরেছে। আমি বরং আজ সন্ধেবেলা গিয়ে দিয়ে আসব আর বলব বাবার জ্ঞান সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছিল, হাসপাতালে নিয়ে যাবার মতো কিছু হয়নি। এখন হেঁটে বেড়াচ্ছে।’ সে উৎকণ্ঠিত চোখে মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল। ব্যাপারটা ঠিকমতো সাজানো গেছে কি? মেয়েটি মাথা হেলিয়ে হাসল। ঠোঁটের মাঝে খই ছড়িয়ে গেল।
‘তোমার বুদ্ধি আছে দেখছি…এখন এসো, আমার কাজ আছে।’
রতন কথা না বলে মাথা বাঁচিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। হাফ প্যান্ট পরলেও এখন সে যথেষ্ট লম্বা। পিছনে দরজা বন্ধ করার শব্দ হল। ‘তারও বুদ্ধি আছে’ এমন কথা সে এই প্রথম শুনল।
গোলাপ দত্ত লেনে পা দেবার আগে বাড়ির ধার ঘেঁষে একচোখ বার করে দেখে দিল, স্যারের কোনো ছেলে বা মেয়ে রাস্তায় আছে কি না। নেই। সে প্রায় দৌড়ে হাইড্রেন্টের কাছে বাঁকটা ঘুরে মন্থর হল। এতক্ষণের টানটান অবস্থাটা তার ঢিলে হতে শুরু করেছে। রাস্তায় আটা পড়ে যাওয়া থেকে এখন পর্যন্ত যা ঘটল, তার কাছে সবটাই সৃষ্টিছাড়া বলে মনে হচ্ছে। মেয়েটাকে আগে কখনো দেখেনি অথচ গত দু-মাস সকালে সে গোলাপ দত্ত লেন দিয়ে হেঁটে অঙ্ক শিখতে আসছে! বুধবারে স্যারের রেশন তোলার দিন, এই নিয়ে ছ-সাতবার রেশন তুলে দিয়েছে। মেয়েটারও নিশ্চয় বুধবারই দিন, কিন্তু কখনো ওকে দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। হয়তো বিকেলে রেশন তোলে।
মাখন সরকার স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে রতনের মনে এল বাবার কথা। বাবা ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে গেছে, এমন একটা খারাপ খবর মিথ্যে বানিয়ে মেয়েটা বলে দিল তাকে কিনা একটা সামান্য বকুনি থেকে বাঁচাবার জন্য! নিশ্চয়ই মেয়েটার বাবা নেই, থাকলেও বাবাকে বোধহয় ভালোবাসে না। নয়তো ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কা দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলার মতো ব্যাপার ভাবতে পারত না। এতে তো বাবা মারাও যেতে পারে। তার মনে একটা অমঙ্গলের কাঁপন উঠে মিলিয়ে গেল। বাবাকে একবার চোখে দেখার জন্য তার মন আনচান করে উঠল।
রতনের বাবা গুপিনাথ রায় তার যৌবনকালে নামকরা সাঁতারু ছিল। রোজ ঘণ্টা দুয়েকের জন্য শোভাবাজারের জগন্নাথ ঘাটে সে গঙ্গায় নামত। ওপারে সালকিয়ার বাঁধাঘাটে লঞ্চের জেটি ছুঁয়ে আবার সাঁতরে ফিরে আসত। ইচ্ছে হলে ফেরার সময়ে লঞ্চে উঠে পড়ত। মাল্লারা দুরদুর করে তাড়া করলে জলে ঝাঁপিয়ে সাঁতরে ফিরে আসত। এটা ছিল তার আমোদ। এ ব্যাপারে তার সঙ্গীসাথী ছিল তিন-চার জন। গুপি চারবার ম্যাট্রিক পাশ করার জন্য চেষ্টা করেছিল, পারেনি। তবে গঙ্গায় ত্রিবেণী থেকে আহিরিটোলা ঘাট বা বালি ব্রিজ থেকে বাগবাজার ঘাট পর্যন্ত সাঁতার প্রতিযোগিতায় পরপর দু-বছর প্রথম হয়েছে। দশ টাকার নোটের মালা গলায় পরেছে, একটা মোটর সাইকেল পুরস্কার পেয়েছে। তাছাড়া কাপ, মেডেল, গরম শাল, ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়াও উপহার পেয়েছিল সোনার হার, আংটি।
চব্বিশ বছর বয়সে গুপি হয়ে উঠেছিল পাড়ার নায়ক। তার অনেক ইয়ারবন্ধুও জুটে গেল। মোটরবাইক ভটভটিয়ে সে ঘুরে বেড়াত। সন্ধ্যার পর ইয়ারদের আড্ডায় গাঁজা খাওয়া শুরু করল এবং মদও। বাড়িতে এই নিয়ে যা হয়, অশান্তি শুরু হল। আত্মীয়স্বজনরা পরামর্শ দিল, বিয়ে দাও শুধরে যাবে। বিয়ে দেওয়া হল বারাসাতের গরিব ঘরের সুন্দরী মেয়ে উমারানির সঙ্গে। সেই সময় গুপির বাবা শম্ভুচরণ রিটায়ার করলেন জার্ডিন হেন্ডারসনের বড়োবাবুর চাকরি থেকে। হাতে কিছু টাকা পেয়েছেন, গুপি বাবাকে বলল ব্যবসা করব। দেহাত থেকে ঘি আনিয়ে কলকাতার আড়তে বিক্রি করার ব্যবসা। টিন টিন ঘি আসতে লাগল বাড়িতে। একতলার বাইরের ঘরটা গুদাম হয়ে উঠল।
