‘ওভাবে নয়, ওভাবে নয়।’ বলতে বলতে মেয়েটি তার হাতের দুটো থলি এক হাতে ধরে রতনের পাশে উবু হয়ে বসল।
‘এইভাবে…এই দ্যাখো, মুখটা ফাঁক করে ধরো।’
রতন দু-হাতে ওয়াড়ের মুখ খুলে ধরে রইল। মেয়েটি সন্তর্পণে হালকাভাবে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে যতটা সম্ভব আটা তুলে দিল। একটি লোক বাজারের থলি হাতে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘রাস্তা থেকে আটা তুলছ, ছি ছি। ফেলে দাও, ফেলে দাও।’
মুখ তুলে মেয়েটি চোখ কুঁচকে বলল, ‘কে আমার বড়োলাট এল রে, যেখানে যাচ্ছেন যান… আমরা রাস্তা কুড়োনিই খাই।’
লোকটি কটমট করে তাকিয়ে তিক্ত মুখে চলে গেল। আটা ভরা ওয়াড়টা তুলে মেয়েটি নিজের কাঁখালে রাখল কলসির মতো। ‘পোয়াটাক পড়ে রইল, যাকগে। আর তুললে ধুলো উঠে আসবে, বাড়িতে ধরা পড়ে যাবে।’
‘দাও আমায় ওটা।’ রতন হাত বাড়াল।
‘পারবে নিয়ে যেতে?’
কথা না বলে সে মেয়েটির হাত থেকে ওয়াড়টা নিল।
‘কদ্দুরে বাড়ি?’ মেয়েটি নিজের থলি দুটো দু-হাতে তুলে নিল।
‘কাছেই, গোলাপ দত্ত লেনে।’
‘য়্যাঁ, গোলাপ দত্ত লেনে! আমিও তো ওখানে থাকি, কোন বাড়ি তোমাদের?’ মেয়েটি অবাক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘আমাদের বাড়ি নয়, স্যারের বাড়ি, ছয়ের-বি।’
‘গ্যাসওলা বাড়ির উলটোদিকে সরু গলিতে? বুড়িদের বাড়ি?’ হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটি বলল। অনাথ ঘোষের বড়ো মেয়ে বুড়ি।
‘হ্যাঁ, আমি ওখানে পড়তে যাই।’
‘পড়তে যাও তো রেশন আনতে গেছ কেন?’
রতন জবাব দিতে সংকোচ বোধ করল। বিনা পয়সায় পড়তে গেলে এই সব কাজ করতে হয়, অপরিচিত একটা প্রায় সমবয়সি মেয়েকে সে কথা বলতে তার লজ্জা করল। সে বলল, ‘রেশন না এনে দিলে স্যারকে আজ ভাত না খেয়ে স্কুলে যেতে হবে। গুরুর জন্য ছাত্রদের এটা করা কর্তব্য।’ কথাটা বলে সে থুতনিটা তুলল ভারিক্কি দেখাবার জন্য।
‘বুড়ির মা ভীষণ দজ্জাল। কম আটা ঠিক চোখে পড়বে। জিজ্ঞেস করলে কী বলবে?’
তাই তো! রতনের বুক দুরদুর করে উঠল। একটা ছেলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে, কাকিমা একথা শুনলে নিশ্চয় বলবে, ‘সাবধানে দেখেশুনে চলতে পারিস না? এতগুলো পয়সা নষ্ট করলি? কেন যে টেস্টে অঙ্কে ফেল করছিস এবার সেটা বুঝতে পারছিস? মাথায় গোবর ছাড়া আর কিছু নেই। ম্যাট্রিকটুকু পাশ করতে পারবি না।’ শেষের কথাটা অবশ্য স্যার বলে থাকেন।
মেয়েটি আড়চোখে রতনের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করছিল, বলল, ‘ওটা আমায় দাও তো, তুমি আমারগুলো ধরো। বুড়ির মাকে আমি চিনি, সত্যি কথা বললে তোমার ধুধ্বুরি ছুটিয়ে দেবে।’
গোলাপ দত্ত লেনে ঢুকে গঙ্গার জলের হাইড্রেন্টের কাছে বাঁক নিয়ে কিছুটা যাবার পর মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল। বাঁ দিকে স্যারেদের মাটির গলির মতোই সরু একটা গলি দেখিয়ে বলল, ‘এইটে দিয়ে গেলে আমাদের বাড়ি। তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি বুড়িদের রেশনটা দিয়ে আসছি।’
রতনকে আপত্তি জানাবার সময় না দিয়ে মেয়েটি এগিয়ে গেল। দুটো বাড়ি পেরিয়েই অনাথ ঘোষেদের সরু মাটির গলিটায় ঢুকে পড়ল। রতন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলল, কী অদ্ভুত মেয়ে! কোনোকালে আলাপ পরিচয় ছিল না অথচ এমনভাবে কথা বলল যেন কতদিনের চেনা। নিশ্চয়ই মাথায় ছিট আছে। গায়ে পড়ে উপকার করে যারা, বোধহয় তারা কিছুটা পাগলাটে হয়। লঘুগুরু জ্ঞান নেই। কীভাবে বলল, ‘কে আমার বড়োলাট এল রে!’ কাকিমার থেকে কম দজ্জাল নয়। এইসব মেয়েদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। কিন্তু মনটা ভালো। কী বলে রেশন দিয়ে আসছে কে জানে! এভাবে ওর হাত দিয়ে পাঠানোটা বোধহয় উচিত হল না। একটাকা ছ-আনা ফেরত হয়েছে। ওটা দিয়ে আসতে হবে। এখন দিয়ে আসার কথাই ওঠে না। মেয়েটা আসুক, কী বলেছে কাকিমাকে সেটা আগে জানা দরকার। সত্যি কথাটা নিশ্চয় বলবে না। কিন্তু বললে কী আর এমন হবে, ফাঁসি তো আর হবে না! দুটো কথা শুনতে হত, তাহলে মনের মধ্যে এই খচখচানিটা আর হত না।
মেয়েটি আসছে। চোখ দুটো আরও বড়ো আর গোল হয়ে মণিদুটো জ্বলজ্বল করছে মজা আর কাজ হাসিল হওয়ার খুশিতে। রতন উৎকণ্ঠিত চোখে বলল, ‘দিয়ে এসেছ?’
‘দোব না তো কী! বললুম, কাকিমা তোমাদের এখানে পড়ে যে ছেলেটা সে রেশন তুলছিল সেই সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে একটা বাচ্চচা ছেলে ওকে বলল ‘বাবা ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে, শিগ্গিরি এসো, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে’…তোমার বাবা আছে তো?’
‘আছে।’
‘ভাই?’
‘নেই। দিদি আর আমি…আর ভাইবোন নেই।’
‘সেরেছে।’ ঠোঁট কামড়াল মেয়েটি। ‘তবে আমি ভাই বলিনি, বলেছি একটা বাচ্চচা ছেলে… পাড়ার কোনো ছেলে হতে পারে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকো না, ওদের বাড়ির কেউ দেখে ফেলতে পারে।’
শোনামাত্র রতন প্রায় লাফ দিয়ে পাশের সরু গলিতে ঢুকে পড়ল। এই গলিতেই মেয়েটি থাকে। ‘কী বললে তুমি? আটা কম লক্ষ করেছে?’
রতনের হাত থেকে রেশনের থলি দুটো নিয়ে মেয়েটি হাঁটতে শুরু করে বলল, ‘এসো বলছি।’
গলিটা মাটির। সোজা দেখা যাচ্ছে, একটা টিনের চালের বাড়ি, যার দেওয়ালের তলার দিকটা সিমেন্টের, উপর দিকটা মাটির। কাঠের গরাদ দেওয়া একটা ছোটো জানলা। গলিটা ওই বাড়ির পাশ দিয়েই ঘুরেছে। তারপর ওই রকমেরই আর একটা একতলা ঘর। ঘরের লাগোয়া সদর দরজাটা এত নীচু যে মাথা নামিয়ে ঢুকতে হয়। দরজার পাল্লার তলার দিকের কাঠ পচে ভেঙে গেছে। সেখানে টিনের তাপ্পি দেওয়া। দরজার শিকল তোলা, তাতে একটা টেপা তালা লাগানো। থলি দুটো এক হাতে ধরে মেয়েটি অন্য হাতে ফ্রকটা একটু তুলে ভিতরে হাত ঢোকাল। পলকের জন্য তার চোখে পড়ল ময়লা সবুজ রঙের ইজের, তলার দিকে কুঁচি দেওয়া। রতন চোখ সরিয়ে নিল। মেয়েটার লজ্জাও নেই। ইজেরে গোঁজা চাবির রিং বার করে তার থেকে একটা চাবি বেছে নিয়ে সে তালা খুলল।
