‘কীর্তি বারান্দার আলোটা জ্বেলে দে তো।’
তখনই পুলিশের জিপ এসে গেটের সামনে থামল।
শিবি
এক
এমনভাবে, কাউকে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে রতন আগে কখনো দেখেনি। ব্যাপারটা অতি সামান্য, ঝগড়া করার মতোই নয়। তবু মেয়েটা গলায় ঝাঁঝ দিয়ে লোকটিকে বলল, ‘একি, একি বালতিটা সামনে বাড়াচ্ছেন কেন?’
রেশন দোকানে তারা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। রতনের পিছনে একজন, তার পিছনেই মেয়েটি। মাঝারি গড়ন, চোয়াল চওড়া। কালি মাখিয়ে বুরুশ করা কালো জুতোর মতো উজ্জ্বল গায়ের রং। ঘটিহাতা ফ্রকটার হাঁটু পর্যন্ত ঝুল, বুকের কাছে ফ্রিল দেওয়া। চাপা নাকের ডগাটা উঁচু। মুখের মতোই চোখ দুটো গোল। চোখের কালো মণি এত বড়ো যে সাদা অংশ প্রায় নেইই। রেগে যাওয়ার জন্য জ্বলজ্বল করছে মণি দুটো। রতন মুখ পিছনে ঘুরিয়ে ওর চোখের দিকেই তাকিয়ে রইল। চোখে চোখ পড়তে মেয়েটি বলল, ‘দ্যাখো না, আমার আগে বালতিটা ঠেলে দিল। কেন হাতে করে রাখতে পারে না?’ রতন চোখ সরিয়ে নিল। এই সব ব্যাপারে সে মাথা গলাতে চায় না।
লোকটি বলল, ‘রেখেছি তো কী হয়েছে, আমি তো তোমার পেছনে রয়েছি। তোমার পরেই রেশন নোব।’
‘ওসব চালাকি জানা আছে। হাটান বালতি, নিজের পাশে রাখুন।’ এই বলে মেয়েটি বালতিটা তুলে তার পিছনে ঠকাস করে রেখে দিল। লোকটিকে রতন আগেও দেখেছে। সামনের কালি কুণ্ডু লেনে থাকে। হাতিবাগানে দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ওকে গেঞ্জি বিক্রি করতে সে দেখেছে। শান্ত নিরীহ দেখতে লোকটি অপ্রতিভ মুখে চুপ করে রইল। মেয়েটির কথা আর ভাবভঙ্গি রতনের ভালো লাগল না। ছোটো-বড়ো জ্ঞান নেই, বয়স্কদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না, তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বেঁকিয়ে মেয়েটি খোঁপা খুলে হাতে প্যাঁচ দিয়ে আবার খোঁপা বাঁধল।
‘লাইন যে আর চলে না। ও বদ্রিপ্রসাদজি, একটু তাড়াতাড়ি বিল লেখো না গো।’ মেয়েটি দোকানের মালিককে তাড়া দিল। তাড়া রতনেরও রয়েছে। রেশন পৌঁছে দিলে ভাত রান্না হবে, তাই খেয়ে স্যার স্কুলে যাবে। সত্য শ্রীমানী বিদ্যালয়ের শিক্ষক অনাথ ঘোষের রেশন তুলতে এসেছে রতন। সে স্যারের কাছে সকালে অঙ্ক শিখতে যায়। বিনা বেতনে। আরও তিনটি ছেলে পড়ে। তারা মাসে দশ টাকা করে দেয়। স্যারের বউ বীণা তাকে দিয়ে ছোটোখাটো কাজ করিয়ে উশুল করে নেয় দশ টাকা।
বদ্রিপ্রসাদকে টাকা দিয়ে বিল আর রেশন কার্ডগুলো নিয়ে পাশেই দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে মাল দিচ্ছে যে কর্মচারীটি তার হাতে রতন বিলটা দিল। আড়চোখে সে একবার পাশে তাকাল। মেয়েটি সাজানো দাঁতগুলো খইয়ের মতো সাদা। ব্ল্যাকবোর্ডে যেন চকের দাগ। হাতে দুখানা কার্ড। বাড়িতে তাহলে মাত্র দুজন লোক!
‘আগের হপ্তায় চালে কাঁকর ছিল, এবারেও কাঁকরমণি চাল হবে না তো?’
‘কেউ বলল না কাঁকর ছিল আর তুমি বলছ কাঁকর ছিল।’ বদ্রিপ্রসাদ বিল লিখতে লিখতে বিরক্ত স্বরে বলল, ‘ঝগড়া করা তোমার স্বভাব আছে। প্রত্যেকবার তুমি ঝামেলা করো।’
‘করব না তো কী? ওজনে মারলে বলব না? একবার ভিজে চিনি দিয়েছিলে মনে নেই!’
বদ্রিপ্রসাদ মেয়েটির পিছনের লোকের কার্ড নেবার জন্য হাত বাড়াল কথার জবাব না দিয়ে। রেশনব্যাগে চাল নিয়ে রতন আটা নেবার জন্য এগিয়ে দিল স্যারের পাঁচ মাস বয়সি ছেলের বালিশের ওয়াড়। ওর মধ্যে তিন সের আটা চেপেচুপে কোনোক্রমে ধরল। এক হাতে চাল ও চিনির থলি অন্য হাতে ওয়াড়ে ভরা আটা বুকের কাছে কোনোক্রমে চেপে ধরে রতন রওনা হল। ঘড়িতে দেখল সওয়া-নটা।
ট্রাম লাইন পেরিয়ে সে ফুটপাথে উঠল। খানিকটা হেঁটে ডানদিকে ঘুরে মাখন সরকার স্ট্রিট ধরে কয়েক পা যেতেই দুর্ঘটনাটা ঘটল। একটা বাচ্চচা ছেলে বাড়ির ভিতর থেকে হুড়মুড় করে ছুটে বেরিয়ে এসে রতনের উপর পড়ল। ছেলেটির পিছনে একটা রুল হাতে একজন, বোধহয় বাবা।
রতনের হাত থেকে আটা ভরা ওয়াড়টা পড়ে গেল রাস্তায়। ছিটকে অনেকখানি আটা ছড়িয়ে পড়ল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাস্তার দিকে। বাচ্চচা ছেলেটা থতমত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, সেই সুযোগে লোকটি তার চুল মুঠোয় ধরে পাছায় রুলের এক ঘা দিয়ে বলল, ‘পালাবি কোথা, ভগবান ঠিক আটকিয়ে দিয়েছে।’ বলেই ছেলেটিকে টানতে টানতে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
রতনের চোখে তখন জল এসে গেছে। কাকিমা তাকে কী রকম হেনস্থা করবে ভেবে তার বুক শুকিয়ে গেছে। রাস্তা থেকে আটা কুড়িয়ে ওয়াড়ে ভরবে কি না, আটার সঙ্গে ধুলো ময়লা দেখলে কাকিমা কী ভাববে, তা ছাড়া রাস্তায় জীবাণু বীজাণুর ছড়াছড়ি, ওই আটার রুটি খেলে মানুষ মরেও যেতে পারে-রতন যখন এইসব ভাবছে তখনই পিছন থেকে সে শুনল: ‘কম্মো সেরেছে…ভোঁদার মতো দাঁড়িয়ে দেখছ কী, তোলো।’
‘তুলব? কিন্তু রাস্তায় পড়ে যাওয়া জিনিস কী খাওয়া উচিত?’ রতন করুণ চোখে তাকিয়ে মিয়নো স্বরে বলল।
‘ওপর থেকে তুলে নাও।…সেরটাক তো হবেই, নষ্ট করবে? পড়ল কী করে?’
‘এই বাড়ি থেকে একটা ছেলে ছুটে বেরিয়ে এসে ধাক্কা মারল।’
‘এই ওয়াড়ে করে কেউ আটা নেয়? কে দিয়েছে এটা?’
‘কাকিমা, স্যারের বউ।’
‘স্যারটা কে? … নাও নাও তুলে নাও, লোকে তাকিয়ে তাকিয়ে যাচ্ছে।’
রতন হাতের থলি দুটো বাড়ির দেয়ালে ঠেস দিয়ে রেখে উবু হয়ে বসে আটা কুড়িয়ে ওয়াড়ে ঢোকাল। দুমুঠো তোলার পরই মেয়েটি অধৈর্য গলায় বলল, ‘ওভাবে খামচি দিয়ে তুলছ কেন? এইভাবে আলতো করে তেলো।’ মেয়েটি হাতের চেটো বাতাসে বুলিয়ে দেখাল। রতন নির্দেশমতো হাত বুলিয়ে তুলল ধুলোসমেত।
