‘বাবা বটঠাকুরকে দেখুন।’
নগেন্দ্রর আগে শোভা ঝুঁকে পড়ল। যতীনের কাঁধটা ধরে নাড়া দিয়ে বলল, ‘ও বউদি আমার যেন কেমন লাগছে, তুমি দ্যাখো তো।’
রেবা ভয়ে ভয়ে কাছে এসে যতীনের ঘাড়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের ক্ষীণ ধারাটি দেখে কেঁপে উঠল।
‘বাবা ভয়ে ভয়ে কাছে এসে যতীনের ঘাড়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের ক্ষীণ ধারাটি দেখে কেঁপে উঠল।
‘বাবা আপনি দেখুন তো, আমি বুঝতে পারছি না।’
নগেন্দ্র মুখ নীচু করে তাকালেন। ঝাপসা ভাবে দেখলেন একটা মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে। কে ওটা? চোখ সরু করে চেনার চেষ্টা করলেন। রমেন? না, এ তো রমেন নয়, তা হলে হাতে পায়ে ঝলসানো মাংস দেখা যেত, নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসত, মুখে কালি মাখা থাকত। এর তো পরিষ্কার জামাপ্যান্ট। নগেন্দ্রর মাথার মধ্যেটা গুলিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তিনি সোফায় বসে পড়লেন।
জল এনে শোভা ছিটোচ্ছে টুনির মুখে। রেবা টেলিফোনের বোতাম টিপে বিরক্ত হয়ে রিসিভার রেখে বলল, ‘এনগেজড!’ একটু পরে আবার রিসিভার তুলে বোতাম টিপে পেয়ে গেল অতীনকে।
‘শিগ্গিরি বাড়িতে এসো। ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। ডিটেলে এখন বলতে পারব না, সব কাজ ফেলে চলে এসো। বটঠাকুর বোধ হয় মারা গেছেন।’
ক্যাসেটে ফিতে জড়িয়ে যাওয়া ভিডিও ফিল্মের মতো তিনজন স্থির অনড় হয়ে বসে। কেউ মুখ দিয়ে শব্দ বার করছে না। শুধু টুনি জ্ঞান ফিরে আসার পর থেকে যন্ত্রণায় চাপা গোঙানির মতো আওয়াজ মাঝে মাঝে করে যাচ্ছে।
মিনিট কুড়ি পর গেটের সামনে মোটর থামার শব্দ পেয়ে শোভা চাপা গলায় বলল, ‘দাদা এলেন।’
ঘরে পা দিয়েই অতীন প্রথম তাকাল মেঝেয় পড়ে থাকা যতীন তারপর রেবার দিকে। দ্রুত এগিয়ে এসে যতীনের হাত তুলে নিয়ে নাড়ি দেখল, কণ্ঠনালি দু-আঙুলে ধরে আবার হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা করল, চোখের মণি দেখল। তারপর রেবাকে বলল, ‘কী করে হল?’
রেবা যতীনের ঘাড়ের দিকে আঙুল তুলল। তারপর আঙুলটা ঘুরিয়ে দিল টেবলে রাখা ইস্ত্রিটার দিকে, শেষবার আঙুল ঘুরে এল নগেন্দ্রকে লক্ষ করে।
‘কেন?’
‘বটঠাকুর অকথ্যভাবে মারছিলেন টুনিকে, কারণটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। টুনি মরেই যেত। ওকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা ইস্ত্রিটা দিয়ে মারেন। টুনিকে হসপিটালে এখুনি নিয়ে যেতে হবে। ওর পা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বটঠাকুর।’
অতীন আঙুল দিয়ে টুনির পায়ের পাতায় আলতো চাপ দিতেই সে তীক্ষ্ন স্বরে কাতরে উঠল। ‘ওকে পরে দেখছি, হসপিটালে নয় ডক্টর দস্তিদারের কাছে আগে নিয়ে যাব তারপর নার্সিংহোমে। তার আগে পুলিশকে খবর দিতে হবে।’
নগেন্দ্র কথা না বলে অতীনের গতিবিধি আর কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এবার বললেন, ‘পুলিশকে কেন! যতীন কি মরে গেছে?’
অতীন বলল, ‘হ্যাঁ।’
নগেন্দ্র বললেন, ‘পুলিশ কি আমায় ধরে নিয়ে যাবে?’
জবাব না দিয়ে অতীন ফোনের কাছে গেল। নগেন্দ্র এবার জিজ্ঞাসা করলেন রেবাকে ‘বউমা তুমি দেখেছ শোভা দেখেছে আমি ওকে মেরে ফেলার জন্য মারিনি, মেয়েটাকে শুধু বাঁচাতে চেয়েছিলুম।’
রেবা বলল, ‘হ্যাঁ।’
নগেন্দ্রর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। তখনই কীর্তির গলা শোনা গেল সিঁড়ি থেকে। ‘এ কী সব দরজা হাট করে খোলা, চোর-ছ্যাঁচোড় ঢুকে-।’ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সে হতবাক হল।
রেবা বলল, ‘এখন কোনো প্রশ্ন কোরো না। জেঠু মারা গেছেন, টুনিদিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে, তোমার সাহায্য দরকার।’
নগেন্দ্র বললেন, ‘বউমা আমি একটু বারান্দায় যাব, বড্ড গরম লাগছে।’
‘বেশিক্ষণ থাকবেন না, বাইরে বেশ ঠান্ডা।’
ঘর ছেড়ে নগেন্দ্র বারান্দায় এলেন। সত্যিই বাইরে ঠান্ডা। তিনি আরামবোধ করলেন। রাস্তায় লোকজন চলছে, রাত বেশি হয়নি। রেলিং-এ হাত রেখে অরুণোদয়ের চারতলায় তাকালেন, বারান্দাটা অন্ধকার। দেবেন এখন কী করছে? ওর পরিবার এখন কেউ নেই। ছেলেটা পালিয়ে গেছে, দেবেন একা বসে বোধহয় টিভি দেখছে।
ডানদিকে তাকালেন। রাস্তার কাছাকাছি বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে, দূরটা অন্ধকার। কয়েক ঘণ্টা আগে টুনিকে নিয়ে ওদিকে গেছলেন, ওকে দেখিয়েছেন গোশালা কোথায় ছিল। এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক হাতে যতীনের অন্য হাতে অতীনের হাত ধরে তিনি দাউ দাউ পুড়ে যেতে দেখেছেন গোশালা। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝাপসা হয়ে এল তার চোখ।
তার হঠাৎ মনে হল দূরে যেন অটো রিকশার ইঞ্জিনের শব্দ হল। তিনি বাঁদিকে পূর্ণ সরকার রোডের দিকে দৃষ্টি রাখলেন। শব্দটা এগিয়ে আসছে। একটা অটো রিকশা দেখতে পেলেন। থরথর করে উঠল তার বুক। একটা প্রচণ্ড শব্দের জন্য তিনি তৈরি হলেন, চোখ বন্ধ করে। তখন দেখলেন রমেন চিৎকার করতে করতে দোকান থেকে ছুটে বেরিয়ে আসছে। তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে পড়ল, ‘মেসোমশাই’। ওর কাছে ধার হয়ে গেল বারোটা টাকা। যাত্রীভরা অটো রিকশাটা বারান্দার সামনে দিয়ে হীরকনগরের দিকে চলে গেল।
পিঠে আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে নগেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন। কীর্তি!
‘পুনর্জন্মটা আমার আর সেলিব্রেট করা হল না রে। ভেবেছিলুম তোর বান্ধবীকে দেখব, কী কপাল দেখ। ভেবেছিলুম দেবেন নস্করকে দেখতে পাব। এসে দেখি ওর বারান্দাটা-‘
নগেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়েই বলে উঠলেন, ‘আরে আলো জ্বলছে!’ বারান্দায় কোনো লোক নেই। তিনি একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, দেবেন আসবেই, গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকবে, হয়তো তাকে দেখে হাতটা তুলবে। আজ তিনিও হাত তুলবেন। কিন্তু অন্ধকারে দেবেন কি তাকে দেখতে পাবে?
