ছাড়াছাড়ি হবার আগে সলিল আরও কিছু বলতে চাইল। ‘জানেন, ও যখন কাঁদছিল আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ওর দুই দিদির বিয়ে হয়নি। বাবা সামান্য চাকরি করে, টাকার জোরে বিয়ে দেবে সে অবস্থাও নয়। অনীতারও বিয়ে হবার কোনো উপায় দেখছি না। আপনি কী বলেন, মানিয়ে চলা যাবে?’
শুকনো গলায় তারক বলল, ‘তোমার ব্যাপার তুমিই ঠিক কর। তবে ডাক্তারের কাছে যাওয়া নিয়ে কাল সন্ধেবেলা কথা বলতে যাব। যদি বিয়ে করবে ঠিক কর, কাল বিকেলের মধ্যেই জানিয়ে দিয়ো, তাহলে আর যাব না।’
‘আপনি যদি অনীতাকে একটু বুঝিয়ে বলেন।’
‘কী বোঝাব?’ তারক বিরক্ত হয়ে গলাটা রুক্ষ করল। ‘তার বিয়ে হওয়া দরকার আর আমি তাকে বলব বিয়ে করো না? আমার কী অধিকার আছে এ-কথা বলার?’
সলিল হতভম্বের মতো তারকের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড! তারপর ধীরে ধীরে কালো হয়ে এর ওর মুখ। বলল ‘এটা অধিকার থাকা-না-থাকার প্রশ্ন নয় সিনহাদা। অন্যায় ঘটতে দেখলে মানুষ মাত্রেই তা বন্ধ করার চেষ্টা করে। আপনি কি মনে করেন না, ওর সঙ্গে বিয়ে হলে একটা অন্যায় ঘটবে? আপনি কি মনে করেন এটা ভালোবাসার বিয়ে হবে?’ অন্যায় বলে মনে হতে লাগল। এরকম অবস্থায় পড়া আর পড়েছি বলে কল্পনা করার মধ্যে অনেক তফাত। এই তফাতটুকু হাজার যুক্তি দিয়েও জোড়া দেওয়া সম্ভব নয় জেনেও তারক প্রশ্নটার কী উত্তর হতে পারে তাই নিয়ে ভেবে চলল।
ভাবতে ভাবতে তার মনে হল, নিজেকে সলিলের জায়গায় দাঁড় করালে আমার অনীতা তাহলে কে হবে? সঙ্গে সঙ্গে রেণুর মূর্তি ভেসে উঠল তার চোখে। অমনি মাথার মধ্যে ঝনঝনানি শুনতে পেল সে। বালিশটাকে খাবলে ধরে যখন সে বলতে চাইল, সব ছেঁদা বন্ধ করে দেব দেখি তুমি কোনখান দিয়ে ঢুকতে পারো, তখন তার মনে হল দুটো উপড়ে নেওয়া চোখ অন্ধকারে তাকে খুঁজছে।
বালিশে মুখ গুঁজে তারক ভাবল, ধরা পড়লে আমাকে শেষ করে দেবে। তার আগেই আমাকে কোথাও পালাতে হবে।
সাত
ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারকের মনে পড়ল একদিন কলেজে ইউনিয়ন রুমের সামনে একটা শ্যামবর্ণ রোগা ছেলে হঠাৎ তাকে বলে, ‘আপনিই তো তারক সিংহ? এখনও আপনার ছবিটা দিলেন না যে? তাড়াতাড়ি দিন ব্লক করাতে হবে। প্রেসের কাজ তো প্রায় শেষ হয়ে এল। আর শুনুন, ব্লেজারপরা ছবি দেবেন।’ আরও কতকগুলো কথা বলেছিল মনে পড়ছে না। ছেলেটা কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক।
তারক ছবিটা দেখতে দেখতে ভাবল, এই তাহলে পরিমল ভটচার্জ্জি। একটা বিধবা, একটা ছেলে আর তিনটে কবিতার বই রেখে মারা গেছে। সেজন্য গোটা চল্লিশ লোক সভা করে শোক জানাচ্ছে। আমি মরে গেলে রেনু ছাড়া আর কেউ কাঁদবে না। ছেলে দুটোর শোক বোঝার বয়সই হয়নি। এই লোকগুলো কি এখন নিজেদের পরিমলের বউয়ের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে?
তারক ঘরের পিছনের দিকে বেঞ্চে বসে লোকেদের লক্ষ করতে লাগল। প্রণবকে তার মনে হচ্ছে উদ্যোক্তাদেরই কেউ। কাল বিমল মান্না ঠিক ওর মতো হাবভাব করেই ঘোরাফেরা করছিল। একটা টুলের উপর সাদা টেবল ক্লথ বিছিয়ে পরিমলের ফোটোটা রাখা। ফ্রেমটা নতুন। পরিমল খুব হাসছে। দেখে তারকেরও হাসি পেল। পরিমল বোধহয় ছবিটা তোলার সময়ই টের পেয়েছিল, এটা তার শোকসভায় ব্যবহৃত হবে। বেশ কিছু লোক ছবিটার দিকে তাকাবে। রজনীগন্ধার ডজন চারেক ডাঁটি টুলের পায়ের কাছে রাখা। ধূপ জ্বলছে। তারকের মনে হল ঠাকুরঘরের মতো ভক্তিপূর্ণভাব সঞ্চারের উদ্দেশ্যই যদি হয় তাহলে পরিমলের হাতে সিগারেট রয়েছে এমন ছবি উদ্যোক্তাদের নির্বাচন করা উচিত হয়নি। পরিমলেরই দোষ। ও কি কখনো শোকসভায় রাখা মৃতের ছবি দেখেনি!
সামনের দিকে জনা সাত-আট স্ত্রীলোক বসে। তারক তাদের মুখ দেখতে পাচ্ছে না, তবু মনে হল ওরা কুরূপা নয়। পরিমল তাহলে রবি ঠাকুরের মতো কিছু লিখেছে কি? ওর একটা পদ্যও পড়িনি। পাবলিকের অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ লোকের মতো আমিও পড়িনি পরিমলের পদ্য। তারক অতঃপর যথেষ্ট ভরসা পেয়ে ভাবল জনা চল্লিশ লোক যখন হয়েছে, তাহলে খুব কিছু খ্যাতনামা পরিমল নয়। বছর বছর ওর জন্ম বা মৃত্যুদিন নিশ্চয় পালন করা হবে না। রবি ঠাকুরের হয়। গগন বসুমল্লিকের দোতলার হলঘরে হত।
গৌরী গান গাইত প্রতি বছর। প্রত্যেক বছরই শুরু করত ‘হে নূতন দেখা দিক’ গানটা দিয়ে। ওর বাবা বসত সামনের চেয়ারে। সবাই যখন বলত, আর একটা আর একটা, গৌরী তাকাত বাবার দিকে। গগন বসুমল্লিক ঘাড় নাড়লে আবার গান ধরত। তারকের মনে পড়ল একবার সেও চেঁচিয়ে বলেছিল, আর একখানা শুনতে চাই আর একখানা। গৌরী আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছিল। একটি ছোটো ছেলে বক্তৃতা মঞ্চের কিনারে বসে। তারকের পিছনে একজন বলে উঠল, ‘বোধ হয় পরিমলের ছেলে।’
আর একজন বলল, ‘না। আমি দেখেছি একবার যাদবপুরে কবি সম্মেলনে, বাপের মতোই রোগা।’
‘তাহলে এ কে?’
তারক ছেলেটিকে লক্ষ করতে লাগল। মনে হয় ছেলেটির যাবতীয় কৌতূহল মিটে গেছে। এখন ঘাড় গুঁজে জুতোর ফিতে টানাটানি ছাড়া আর কিছু করার নেই। মাঝে মাঝে যখন তাকাচ্ছে চোখ দেখে মনে হয় বিরক্ত। ঘরের এইকটা লোকের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে। একটা লোককে নিয়েই সবাই কথা বলছে, একই কথা কতক্ষণই বা শুনতে পারে! তারকের মনে হল ছেলেটিকে ছেড়ে দেওয়া উচিত, বাইরে গোলদিঘিতে গিয়ে ও চোর চোর খেলুক, নয়তো সাঁতার কাটা দেখুক। হয়তো ওর বাবা পরিমলের বন্ধু। ছেলেকে বেড়াতে আনা আর বন্ধুর শোকসভায় যোগ দেওয়া একই সঙ্গে সেরে নিচ্ছে।
