‘কী বলল টুনি?’
নগেন্দ্র খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন, দেখলেন রমেনের দোকানটা একই অবস্থায় রয়েছে। উদগ্রীব যতীনের চোখ মুখের ওপর। বিছানায় বসে শুকনো হেসে তিনি মাথা নাড়লেন, ‘ওকে বোঝানো যাবে না। ও ভবিষ্যতের জন্য আশ্রয় চায় সিকিউরিটি চায়। এবার কী বোঝাবে?’
‘কেন আমার আশ্রয়টা কি আশ্রয় নয়? আমি কি সিকিউরিটি দিতে পারি না? আমার বাড়িতে ওর অংশ থাকবে। আজীবন বসবাসের উইল করে দোব এই মাসেই। বিয়ের জন্য যে টাকা খরচ হত তার দ্বিগুণ টাকার কিষাণ বিকাশপত্র ওর নামে কিনে দোব। আশ্রয় আর সিকিউরিটি এর থেকে বেশি আর কী চাই?’
‘থাকার জায়গা আর টাকার ব্যবস্থা থাকলেই কি মেয়েদের আর কোনো সমস্যা থাকবে না?’ নগেন্দ্র আরও বলতেন তাদের আবেগের সমস্যা, জননী হবার ইচ্ছা, স্বাধীনভাবে ঘর বাঁধার বাসনা, কিন্তু এসব কথা ছেলের কাছে তুললেন না। যতীনের কথা শুনে তার মনে হচ্ছে এগুলো ওর মাথায় ঢুকবে না। সাক্ষ্য প্রমাণ আর আইন দিয়ে ঘেরা জীবনে কোনো ছিদ্র রাখেনি যার মধ্য দিয়ে মানবিক যুক্তিগুলো ঢুকতে পারে।
বিছানায় বাবার পাশে বসে দু-হাতে মুখ ঢেকে যতীন বসে রইল। নগেন্দ্র বিষণ্ণ চোখে দেওয়াল দেখতে লাগলেন। উই ধরেছে, বাসাটা প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা। খবরের কাগজটা নিয়ে তিনি উঠে গেলেন বাসাটা ভাঙতে।
‘তোমাদের আর কী, দাঁত বার করে লোকের হাসি তো তোমাদের দেখতে হবে না। রাস্তায় দোকানে বাজারে কোর্টে, ছেলেমেয়েদের স্কুলে, ঝি-চাকররা পর্যন্ত আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ফিসফাস করবে। এতগুলো লোকের মুখে চুনকালি মাখাবে শুধু নিজের সুখের জন্য?’
নগেন্দ্র খবরের কাগজে উইয়ের ভাঙা বাসা সংগ্রহ করে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলতে যাবার সময় যতীনের মুখটা দেখলেন। লাল হয়ে ওঠা দুটো চোখ কোটর থেকে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। সারা মুখ ফুলে উঠেছে। ঘাম গড়াচ্ছে গাল বেয়ে। নগেন্দ্রের মনে হল যতীন উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে, মুখের চামড়া ফেটে রক্ত ছিটকে বেরোবে।
‘যতীন তুই শুয়ে পড়।’ নগেন্দ্র ভীতস্বরে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘তুই উত্তেজিত হোসনি, শান্ত হ।’
‘কীসের শান্ত হওয়া। মেয়ে তোমার নয়, আমার। ওর হাড়মাস আলাদা করব।’ বলতে বলতে যতীন ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হতভম্ব নগেন্দ্র সিঁড়িতে যতীনের পায়ের আওয়াজ থেকে বুঝলেন সে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠেছে।
বসার ঘরে সোফায় বসে টিভি দেখছিল টুনি, বাংলা সিরিয়াল হচ্ছে।
দেওয়ালের ধারে খাবার টেবিলে বিছানার চাদর পেতে রেবা কীর্তির প্যান্ট ইস্ত্রি করছিল। শোভা টিভি সেটের সামনে মেঝেয় বসে আটা মাখছিল। যতীন ক্ষ্যাপার মতো ছুটে এসে ঘরে ঢুকল, টুনির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত চেপে বলল, ‘কী বলেছিস দাদুকে, আশ্রয় চাই, সিকিউরিটি চাই? কেন, ওগুলো কি তোকে দিইনি না দিতে পারব না?’
হাতের কাজ থামিয়ে রেবা আর শোভা মূর্তির মতো জড়ো হয়ে গেল। টুনি যেন চোখের সামনে বাজ পড়তে দেখল এমনভাবে তাকাল বাবার দিকে।
‘বল! চুপ করে আছিস কেন, বল?’
‘বাবা!’ টুনির গলা দিয়ে কোনোক্রমে বেরিয়ে এল শব্দটা।
‘তোকে আঁতুড়েই মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল।’
সাড় ফিরেছে রেবার। সে যন্ত্রের মতো বলল, ‘কী হয়েছে বটঠাকুর, আপনি অমন করে বলছেন কেন?’
‘সাধে কী আর বলছি। বাইজির তবলচি ছেলের সঙ্গে প্রেম করেছে,এখন তাকে বিয়ে করার জন্য নেচে উঠেছে। নাচা বার করছি। দেখি পা-টা দেখি।’
টুনির সামনে এসে দাঁড়াল যতীন, মেয়ের বাঁপায়ে ফুটবলে শট নেওয়ার মতো একটা লাথি মারল। কাতরে উঠল টুনি।
‘বাবা।’ কইমাছের মতো লাফিয়ে উঠল সে যন্ত্রণায়।
‘বাবা বলা বার করছি।’ যতীন আর একবার পায়ে লাথি মারল।
‘বটঠাকুর এ কী করছেন।’ গরম ইস্ত্রিটা প্যান্টের উপর রেখে রেবা এগিয়ে এসে যতীনের হাত ধরে টানল। প্রতিরোধ পেয়ে যতীন আরও খেপে উঠল। ঝটকা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে টুনির চুল মুঠোয় ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে সোফা থেকে তাকে মেঝেয় ফেলে দিল।
বসার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নগেন্দ্র। গম্ভীর স্বরে হাঁক দিলেন, ‘যতীন, যথেষ্ট হয়েছে।’
‘না যথেষ্ট হয়নি।’ কথাটা বলে যতীন তার ভারী শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল টুনির ডান পায়ের গোছের উপর।
যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে টুনি আর্তনাদ শুরু করল। শোভা হাতের গামলাটা ছুড়ে ফেলে যতীনের পা জড়িয়ে ধরল। পা ছুড়ে নিজেকে শোভার কবল থেকে মুক্ত করে সে গোড়ালি দিয়ে দুরমুস করার মতো আঘাত করে চলল টুনির পায়ের পাতার উপর।
শোভা যতীনের প্যান্ট হাঁটুর কাছে আঁকড়ে ধরে টানাটানি করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল, ‘একটা আস্ত কুমির। ও মেসোমশাই দাঁড়িয়ে কেন, মেয়েটাকে বাঁচান।’
নগেন্দ্রর সংবিৎ ফিরে এল। দ্রুত টেবলের কাছে গিয়ে গরম ইস্ত্রিটা তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন যতীন সামনে ঝুঁকে দু-পায়ে মাড়াচ্ছে টুনির দুটো পায়ের পাতা। মুখ দিয়ে কাঠচেরাইয়ের মতো শব্দ বেরোচ্ছে। জ্ঞান হারিয়ে টুনি মেঝেয় দলা পাকিয়ে পড়ে।
‘হারামজাদা।’ চিৎকার করে নগেন্দ্র ছুটে গিয়ে ইস্ত্রিটা দিয়ে যতীনের মাথার পিছনে আঘাত করলেন একবার, দু-বার। যতীন ‘বাবা’ বলেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল টুনির দেহের পাশে।
সারা ঘর নিস্তব্ধ। কীর্তির প্যান্ট পুড়ে গেছে। পোড়া গন্ধে রেবারই প্রথম হুঁশ ফিরল। নগেন্দ্রর হাত থেকে ইস্ত্রিটা তুলে নিয়ে টেবলে রেখে দিল।
