নগেন্দ্র দেখেছেন ফলে মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে, লজ্জাও বোধ করেছেন। প্রসঙ্গটা বদলাতে বললেন, ‘গানও তো একটা রাস্তা হতে পারে।’
‘তা পারে। একজন বলেছেন, ভালো করে শিখে নিয়ে গানের স্কুল করো, সাহায্য করবেন।’
‘বাহ খুব ভালো কথা, লোকটি কে?’
‘যেখানে গান শিখি সেখানে উনি তবলা বাজান।’
নগেন্দ্রর মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে আসছিল, প্রেমপ্রকাশ? সামলে নিয়ে বললেন, ‘তা হলে তো খুবই ভালো, তবলচি খুবই দরকারি লোক। গানবাজনার ব্যাপারটা এরা খুব ভালো বোঝে।’
‘উনি ছোটোবেলা থেকে গানবাজনার মধ্যে বড়ো হয়েছেন।’
নগেন্দ্র আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘তাই নাকি! বাড়িতে নিশ্চয় গানবাজনার চল আছে।’
টুনির মুখে হাসি ফুটল, বলল, ‘ওনার মা পটনার একজন নামকরা বাইজি, বলেছেন আমাকে গান শেখাবেন।’
নগেন্দ্র থমকে দাঁড়ালেন, এই তথ্যটাতো যতীন তাকে দেয়নি। কিশোরী বাইজি বলেছে ওকে গান শেখাবে তার মানে টুনির সঙ্গে কথা হয়েছে। ‘বাইজির সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওর বাড়িতে গেছলে?’
‘হ্যাঁ।’ টুনি উৎসাহ নিয়ে কথা বলছিল, এবার নগেন্দ্রর গলা কর্কশ হয়ে উঠতেই তার চোখে সন্দেহের ছায়া পড়ল। ‘কেন দোষের কিছু হয়েছে নাকি?’
‘আমাদের বংশের মেয়ে বাইজি বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়েছে, ভাবতে পারছি না!’
‘ভাবতেই পারছেন না!’ টুনির কপাল কুঁচকে গেল। ‘আমি ওঁকে প্রণামও করেছি, মা বলেছি, গানও শুনিয়েছি। তাই শুনে রাজি হয়েছেন তালিম দিতে।’
উপেক্ষা ঔদ্ধত্য স্পষ্ট টের পেলেন নগেন্দ্র টুনির বলার ভঙ্গিতে। তিনি আহত বোধ করলেন, একটু রাগও হল।
‘তুমি জান না বোধ হয় কত মানী নামি লোক আমাদের রায়চৌধুরী বংশে জন্মেছে। বারোভুঁইয়াদের এক ভুঁইয়া ছিল আমাদের পূর্বপুরুষ। আইসিএস, স্যার রায়বাহাদুর থেকে শুরু করে এমএলএ, বড়ো বড়ো কোম্পানির ডিরেক্টর, কলেজ প্রিন্সিপাল, হাইকোর্ট জজ, সমাজের বড়ো বড়ো মাথাওলা লোক প্রচুর পাবে আমাদের বংশে।’
নগেন্দ্র তালিকা বাড়াবার জন্য কৃতীদের সন্ধানে কয়েক সেকেন্ড থামতেই সেই ফাঁকে টুনি বলল, ‘দাদু আমাদের বংশে কলেজে পড়া অবিবাহিত খোঁড়া মেয়ে ক-জন ছিল?’
থতমত হলেন নগেন্দ্র। আঁচ করতে পারেননি এমন একটা প্রশ্ন আতে পারে।
নিশ্চিত গলায় টুনি বলল, ‘যতদূর জানি একজনও ছিল না। আমার সমস্যাটা শুধু আমারই ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে, এটা আমার বাঁচারও সমস্যা। বুঝি না এর সঙ্গে বংশমর্যাদা বা কলঙ্কের কী সম্পর্ক? তা হলে বলি ওই বাইজির ছেলে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছেন।’
‘তুমি তাতে রাজি হবে?’ চোখ বিস্ফারিত করে নগেন্দ্র তাকালেন।
‘কেন হব না! আমারও তো আশ্রয় চাই। ভবিষ্যতের সিকিউরিটি চাই। এই চাওয়ার অন্যায় কোথায়? মানুষটাকে আমি অনেকদিন ধরে দেখেছি। সৎ ভদ্র আর সবথেকে বড়ো কথা বিশ্বাস করা যায়। সেই সুপাত্রটি তো আমার হাঁটা দেখেই সটকান দিলেন।’
টুনির মুখের ক্ষীণ হাসিটি নগেন্দ্রকে জানিয়ে দিল এই মেয়ের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। বংশের কথা তুলে ওকে ঘায়েল করা যাবে না, আত্মীয় সমাজে মুখ দেখানো যাবে না বলেও ওকে থামানো যাবে না, আবেদন-নিবেদনেও টলবে না।
‘আচ্ছা দাদু আপনি বোধ হয় এই রাজা গার্ডেনের বাইরে বিশেষ যাননি।’
নগেন্দ্র বুঝলেন টুনি কী বলতে চাইছে। বললেন, ‘লেখাপড়া আমার বিশেষ হয়নি, কোনোক্রমে ম্যাট্রিক পাশ, তোমার থেকে কম শিক্ষিত।’
অপ্রতিভ হয়ে টুনি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না না আমি ওভাবে বলিনি, আমি বলছি কলকাতার বাইরে কখনো গেছেন কি না।’
‘গেছি খুব ছোটোবেলায় বাবা-মার সঙ্গে পুরী আর কাশী। এখন কিছুই মনে নেই। স্কুলে পড়ার সময় গেছি দার্জিলিং। ব্যস।’
‘চলুন না আমার সঙ্গে পাটনা। দিনকতক থেকে আসবেন।’
নগেন্দ্র অনুভব করলেন টুনির স্বরের আন্তরিকতা। একটু বিচলিত হলেন। এত বছর হয়ে গেল যতীন বা নমিতা কখনো তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলেনি।
‘গিয়ে থাকব যতীনের বাড়িতে? যেকোনোদিন আমাকে যেতে বলেনি! না দিদি তা পারব না।’
‘আপনি প্রেমের বাড়িতে থাকবেন, ওহো বলতে ভুলে গেছি, প্রেম হচ্ছে প্রেমপ্রকাশ শর্মা, যে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। ওদের বাড়িতে চমৎকার গেস্টরুম আছে, একেবারে আলাদা।’
‘এটাও পারব না। কারণটা নিশ্চয় বুঝতেই পারছ। শ্মশানের দিকে একপা বাড়িয়েই আছি। এখন আর সংস্কার ধ্যানধারণা বদলাতে পারব না। তুমিও বোধহয় সিদ্ধান্ত বদলাবে না।’
টুনি জবাব না দিয়ে শুধু হাসল।
পাঁচ
বাড়ি ফিরে টুনি দোতলায় উঠে গেল। একতলা ঘরের দরজা খোলা দেখে নগেন্দ্র ঢুকলেন। তক্তাপোশে তোষক পেতে বিছানা করা। শোভা ঝাঁট দিয়ে মুছে ঘর পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। বাইরে অন্ধকার নামছে, আলো জ্বলছে ঘরে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে যতীন খবরের কাগজ পড়ছিল। বাবাকে দেখে সে কাগজ রেখে উঠে বসল।
‘দু-তিনটে জরুরি মামলা ফেলে রেখে এসেছি। পরশু একটার হিয়ারিং আছে। কালকে সকালেই পূর্বা এক্সপ্রেসে ফিরব। ডাক্তার কী বললেন সেটা আর জানা হবে না। টেলিফোন করে জেনে নোব। যদি বলেন অপারেশন করলে পা ইমপ্রুভ করবে তা হলে ও থেকে যাবে। তুমি ইতিমধ্যে ওই ব্যাপারটা নিয়ে ওকে বুঝিয়ে বলো।’
‘বলেছি।’
‘অ্যাঁ! কখন বললে?’
‘একটু আগে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে।’
