‘তোমার বিয়ের জন্য যতীন চেষ্টা করেছিল নাকি?’ নগেন্দ্র না জানার ভান করে মনে করলেন এইভাবেই এগোতে হবে।
‘হ্যাঁ, অ্যাকসিডেন্টের আগে।’ এইটুকু বলে টুনি চুপ করে থেকে বুঝিয়ে দিল এই প্রসঙ্গে তার আর কিছু বলার নেই।
ওরা দু-জনে মুখার্জিদের বাড়ির সামনে পৌঁছেছে। গেটের কাছে কয়েক বর্গ গজ জমিতে বাগান করার একটা ক্ষীণ চেষ্টায় কয়েকটা গোলাপ আর একটা বাচ্চচা দেবদারু গাছ। নগেন্দ্র যতবারই আসেন প্রশংসা করেন গৌরী মুখার্জির এই প্রকৃতি প্রেমকে। আট মাসের নাতিকে দু-হাত ধরে হাঁটাবার চেষ্টা করছিলেন, গৌরী, গেটের সামনে নগেন্দ্র এবং একটি মেয়েকে দেখে বলে উঠলেন, ‘ওমমা আপনি!’
‘হ্যাঁ, আমি, মরে গিয়ে ভূত হয়ে এসেছি।’
‘কী আজেবাজে কথা বলেন, শুনে যে কী ভয় করেছিল। একজন বলল বোমায় নাকি আপনার একটা হাত উড়ে গেছে, আর একজন বলল স্ট্রোক হয়ে হাসপাতালে গেছেন।’
‘গুজব কী জিনিস এবার বুঝতে পারছেন, এই দেখুন।’ নগেন্দ্র দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘দুটোই আস্ত রয়েছে।’
‘এই মেয়েটিকে তো চিনলুম না।’
‘আমার বড়ো নাতনি, পটনায় থাকে। নাম টুনি, শমিতা। ওর পায়ে চোট তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছে। মুখুজ্যেমশাই এখন কেমন আছেন?’
‘ভালোই আছেন। যাচ্ছেন কোথায়?’
‘নাতনিকে জায়গাটা একটু ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি। আচ্ছা আসি।’
দু-জনে আবার হাঁটতে শুরু করল। নগেন্দ্র ভেবেছিলেন টুনির নিশ্চয় কষ্ট হচ্ছে এতটা হেঁটে আসার জন্য তাই মুখার্জিদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে কথা বলেন যাতে টুনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিতে পারে পা দুটোকে।
‘দাদু কীরকম লেগেছিল তখন?’
প্রশ্নটা খাপছাড়া। নগেন্দ্র জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
‘মানে?’
‘মানে যখন বুঝতে পারলেন আপনি বেঁচে আছেন, সেই সময় আপনার মনে কোন জিনিসটা প্রথমেই এল?’ টুনি মাথা নামিয়ে রাস্তা দেখে চলতে চলতে বলল, মুখের ভাবটা বয়স্কদের মতো।
মুশকিলে পড়ে গেলেন তিনি। প্রথমে তো তার মনে কিছুই ছিল না। একেবারে সাদা কাগজের মতো। তারপর ধীরে ধীরে একটা অনুভূতি, শরীর কাঁপছে আর কঁকানির মতো একটা আওয়াজ বিনা চেষ্টাতেই গলা দিয়ে উঠে আসতে চাইছে। তখনও তাঁর চেতনায় সাড় ফিরে আসেনি, সেটা এল যখন মাথা নীচু করে দেখলেন পায়ের কাছে একটা মানুষের মতো কী যেন শুয়ে রয়েছে। মানুষটকে যখন চিনতে পারলেন তখন প্রথমেই-‘টুনি আমি ভয় পেয়ে গেছলুম আর মনে হয়েছিল, আমি মরিনি আমার আশপাশ সব আমি দেখতে পাচ্ছি, শব্দটাও শুনতে পাচ্ছি দু-মিনিট আগেও যেমন ছিলুম তেমনিই রয়েছি, একটা দারুণ ফিলিং আমি পেয়েছিলুম, বুঝলুম আমি বেঁচে গেছি।’
বাঁচাটা বোঝাতে নগেন্দ্র অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন টুনির দিকে। তারপর চোখ তুলে আকাশ, গাছপালা, বাড়িগুলোর উপর দিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে আবার চোখ রাখলেন টুনির মুখে। ‘আচ্ছা টুনি তোমার যখন অ্যাকসিডেন্ট হল, মানে যখন বাসের চাকাটা যে মুহূর্তে পায়ের উপর উঠেছে সেই মুহূর্তে কীরকম মনে হয়েছিল?’
দাঁড়িয়ে পড়ল টুনি। সরল হেসে বলল, ‘আমি জানিই না তখন আমার কী হয়েছে। বাসটা রিকশায় ধাক্কা মারতে ছিটকে রাস্তায় পড়েই অজ্ঞান হয়ে যাই, জ্ঞান ফেরে হাসপাতালে। তখন খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল, ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। পরে শুনেছিলাম, চাকাটা এক ইঞ্চি বাঁদিকে থাকলে আমার পায়ের পাতাটা নাকি কেটে বাদ দিতে হত। এটা শুনে অবশ্য স্বস্তি পেয়েছিলাম। তখনও অবশ্য জানতাম না আমি খোঁড়া হয়ে যাব, জানলে নিশ্চয়ই কাঁদতাম। এভাবে বেঁচে থাকাটা দাদু খুব কষ্টের।’
নগেন্দ্র হাঁটার জন্য পা বাড়ালেন। টুনির মুখের দিকে আর তিনি তাকালেন না। দু-জনে কথা না বলে মিনিট দুয়েক হাঁটার পর নগেন্দ্র ডানদিকের রাস্তা নেবার সময় বললেন, ‘এই জায়গাটায় আমার একটা গোয়াল ছিল।’
‘গোয়াল!’ টুনি ভ্রূ তুলল অবাক হয়ে। ‘গোয়াল কেন? দুধের ব্যাবসা করতেন?’
‘হ্যাঁ। আর ঘি তৈরি করতুম, ব্যাবসাটা ভালোই চলছিল। ওই যে একতলা সাদা বাড়িটা দেখছ ওখানেই ছিল। একরাত্রে আগুন লাগল, কী করে যে লাগল আজও তা জানি না। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যতীন আর অতীনকে নিয়ে দেখলুম গোয়ালটা পুড়ে গেল। ওরা তখন খুব ছোটো। গোরুমোষগুলো অবশ্য বেঁচে যায়।’ নগেন্দ্র পিছন ফিরে দূরে বাড়ির বারান্দার দিকে তাকালেন।’
‘তারপর আর ব্যাবসা শুরু করেননি?’
‘নাহ। আর উৎসাহ পাইনি।’
নগেন্দ্র নিঃশব্দে কিছুটা চলার পর বললেন, ‘তখন এই জায়গাটা ছিল গ্রামের মতো, সন্ধ্যার পর রাস্তা দিয়ে চলতে গা ছমছম করত, শেয়াল ডাকত। খুব মন খারাপ লাগত, ভাবতুম কলকাতায় ফিরে যাই। মনে হয়েছিল জায়গাটা অপয়া।’
‘আপনি এসব মানেন? পয়া-অপয়া!’
‘মানি।’ আড়চোখে টুনির মুখ দেখে বুঝলেন উত্তরটা তার পছন্দ হয়নি। ‘তুমি বোধ হয় মানো না।’
টুনি উত্তর দিল না। হঠাৎই আনমনা হয়ে চলার গতি মন্থর করে কী যেন ভাবতে শুরু করেছে।
‘কী করবে ঠিক করেছ?’
‘কী করব মানে?’
‘মানে ভবিষ্যতে কী করবে?’
‘ওহহ, ভবিষ্যৎ?’ টুনি হাসল। ‘দেখা যাক।’
‘ভালো করে পড়াশুনো করো, এখন নানারকমের চাকরির রাস্তা খোলা আছে।’
‘এই খোঁড়া পায়ে রাস্তা দিয়ে চলা খুব শক্ত। দেখছেন তো লোকেরা কীরকমভাবে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যাচ্ছে।’
