‘যতীন ওকে এনেছে ডাক্তার দেখাতে, মাঝে মাঝে ব্যথা হয়, অতীন যাতে ব্যবস্থা করে দেয় সেজন্যই এখানে আসা।’
টুনির এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য সবার কাছে আড়াল করে রাখতে পারলেও টুনি তো একসময় জেনে যাবেই। জানিয়ে দেওয়াটা অর্থাৎ প্রেমপ্রকাশের সঙ্গে তার বিয়ে কোনোভাবেই হতে পারে না এই কথাটা টুনিকে কীভাবে বলবেন? নগেন্দ্র চিন্তায় পড়ে গেলেন।
দুপুরে খাওয়ার টেবলে অতীন জানাল, ‘আজই ডাক্তার দস্তিদারকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইব, বেলভিউতে নয়তো ওর বাড়িতে গিয়ে দেখিয়ে আসব।’
বিকেলে অতীন ফোন করল। ডাক্তার দস্তিদারের সঙ্গে কথা বলে সে জানাল, ‘কাল সকালে ওর সাদার্ন অ্যাভেন্যুর বাড়িতে সকাল সাড়ে সাতটায় যেতে বললেন, টুনি তুমি রেডি থেকো।’
অতীন বেরিয়ে যেতেই নগেন্দ্র রেবাকে বললেন, ‘আজ আমি কিন্তু একটু বেরোব। অনেকদিন হাঁটাচলা করা হয়নি।’
‘দাদু আমি যদি যাই আপনার সঙ্গে অসুবিধে হবে?’ টুনি বলল।
‘অসুবিধে?’ নগেন্দ্র যেন ফাঁপড়ে পড়লেন।’ ‘অসুবিধে আর কী, ভালোই তো। নতুন জায়গা দেখতে তোমার ভালোই লাগবে। বউমা আমার সঙ্গে তা হলে ও চলুক।’
‘পূর্ণ সরকার রোডের দিকে যাবেন না। ওদিকে মানুষের ভিড় আর গাড়ি, রাস্তাও ভাঙাচোরা বরং হীরকনগরের দিকে যান।’ রেবা বেড়াবার রাস্তা বাতলে দিল টুনির কথা ভেবে। এটা নগেন্দ্র ও টুনির বুঝতে অসুবিধা হল না।
‘কাকিমা এর থেকেও ভিড় আর গাড়ির রাস্তা দিয়ে আমি রোজ হাঁটি।’
সালোয়ার-কামিজ বদলে টুনি শাড়ি পরে নিল। রাস্তায় বেরিয়ে তারা উত্তরে হীরকনগরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। নগেন্দ্র লক্ষ করলেন রাস্তার লোকেরা টুনির দিকে কীরকম করুণামিশ্রিত চোখে তাকাচ্ছে। স্বাভাবিকই। একটা সুশ্রী মেয়েকে এত অল্পবয়সেই দুমড়ে মুচড়ে যেতে দেখলে, তার নষ্ট হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ জীবনের ছবি পলকের জন্য চোখে ভেসে উঠলে কার না মনে করুণা জেগে উঠবে!
‘টুনি এই যে জায়গাটা দেখছ এর নাম রাজা গার্ডেন। এখানকার সব জমি একসময় আমার ছিল।’
‘আপনার ছিল!’ অবাক হয়ে যাওয়া টুনি থমকে দাঁড়াল, তার সঙ্গে নগেন্দ্রও। টুনি এধার-ওধার তাকিয়ে তার বিস্ময়কে আরও বাড়িতে তুলল।
‘হ্যাঁ আমার ছিল, আমার মানে তোমার ঠাকুরদার ছিল। বাবার কাছে শোননি রাজা গার্ডেনের কথা? যতীন তো জন্ম থেকে এখানেই আঠাশ বছর কাটিয়েছে। তোমার দাদামশাই পটনার বড়ো উকিল ছিলেন তিনিই জামাইকে ওখানে নিয়ে যান। ওঁর দুটি ছেলের একটি অল্পবয়সেই কলেরায় মারা যায়, অন্যটি, তোমার বড়োমামা কলকাতায় গোয়াবাগানের বাড়িতে থেকে কলেজে পড়ে শেষে রামকৃষ্ণ মিশনে এখন স্বামীজি।’
নগেন্দ্র এই পর্যন্ত বলে হাঁটার জন্য পা বাড়ালেন। সিরসির করা ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। লক্ষ করলেন, টুনির গায়ে ফুলহাতা পাতলা কার্ডিগান। নিজের আলোয়ানটা গা থেকে খুলে টুনির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘শীতটা এখন আমার দরকার। বউমার জন্যই এটা গায়ে জড়াতে হয় নইলে কথা শুনতে হবে। আচ্ছা পঁচাত্তরটা কি একটা খুব বেশি বয়স? তুমি কী বলো?’
টুনি ইতস্তত করছে দেখে বললেন, ‘কাগজে দেখি পঁয়তাল্লিশ বছরের এক প্রৌঢ়া গাড়ি চাপা পড়েছে, পঞ্চান্ন বছরের এক বৃদ্ধ গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে, পড়ে রাগ হয়। পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছরকে প্রৌঢ়া-বৃদ্ধ বলা হয়, এসব কী? যারা এসব লেখে তারা কি ভালো করে মানুষজন দেখে না? একসময় বলতুম রাস্তাঘাট, গাড়ি-ঘোড়া, আরে ঘাট বলে এখন কিছু আছে? ঘোড়া তো তুমি চোখে দেখতে পাবে না, তবুও আমরা বলি, লিখিও।’
‘দাদু পুরোনো অভ্যাস চট করে যায় না, সময় লাগে।’
নগেন্দ্র দেখলেন টুনি হাসল, সারাদিনে এই প্রথম, বললেন, ‘কতদিনে পুরোনো অভ্যাস যায়?’
‘অনেকদিন লাগে, একপুরুষ, দু-পুরুষ।’
‘বরাবর চিৎপুর বলেছি এখনও বলি, অতীন বলে রবীন্দ্র সরণি। এটা অবশ্য এক পুরুষেই ধাতস্থ হবার মতো ব্যাপার কিন্তু সামাজিক মানসিক অনেক ধারণা, প্রথা যা বদ্ধমূল হয়ে মনে গেঁথে আছে, তাকে দু-এক পুরুষে উপড়ে ফেলা যায় না।
‘কেন যাবে না?’
নগেন্দ্র আড়চোখে তাকালেন নাতনির মুখের দিকে। চ্যালেঞ্জ জানানোর কোনো ইচ্ছা মুখে দেখতে পেলেন না। শান্ত প্রত্যয় মুখে লেগে রয়েছে।
‘আমাদের বংশে নাকি বঙ্গজদের সঙ্গে বিয়ে হয় না। একটা লোক আমাকে বিয়ে করতে চাইল, সে বঙ্গজ। বাবা-মা কিন্তু রাজি হয়ে গেল, কেন? কারণ লোকটির পরিবার, চাকরি, মাইনে, ডিগ্রি, চেহারা এইসব বিবেচনা করে তারা স্থির করলেন, লোকটি সুপাত্র, অতএব বংশের প্রথা ভেঙে ফেলা যায়।’
টুনির কথা শুনে নগেন্দ্রর মনে পড়ে গেল আজই যতীন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘যাকগে ওসব, ছেলেটা তো ভালো, পাকা চাকরি, অনেকদূর উঠতে পারবে, সংসারটাও ছোটো।’ তখন কিন্তু তিনিও আপত্তি জানিয়ে যতীনকে কিছু বলতে পারেননি।
‘এটা এমন কোনো গুরুতর প্রথা নয় যা ভাঙলে বংশে কলঙ্ক লাগবে। পাত্রের বংশটা তো সৎ, তা হলে জাত গোত্র নিয়ে মাথা ঘামাবার কী আছে?’
নগেন্দ্র ইচ্ছে করেই ‘কলঙ্ক’ ‘সৎ’ শব্দ দুটো ব্যবহার করলেন। প্রেমপ্রকাশ নিয়ে কথা বলার জন্য একটা ভূমিকা দরকার ছিল। তার মনে হচ্ছে সেটা বোধ হয় তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এবার আসল সমস্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া-তবে মেয়েটি বুদ্ধিমতী, কথার প্যাঁচে ওকে জড়ানো সহজ হবে না।
