‘ভালোই তো, ছেলেটা করে কী?’
‘করে বলতে,’ যতীন আর একটু সরে এল বাবার কাছে, গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘একটা চিনে খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে আর টুনি যে বাঙালি ভদ্রলোকের কাছে গান শেখে সেখানে তবলা বাজায়, হাতটা খুব ভালো। কিন্তু মুশকিলটা হল, ওর মা বাইজি ছিল আর ছেলেটা বিহারি, স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি।’
নগেন্দ্র বিস্ফারিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না না না, এখানে বিয়ে হতে পারে না। তুই বলছিস কী, বাইজির ছেলে!’
‘ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো, দেখতে ফিল্মের হিরোর মতো, খুব নম্র ভদ্র, কথাবার্তা মার্জিত, সুন্দর বাংলা বলে, যেকোনো বাবা-মায়ের জামাই করতে ইচ্ছে হবে। পটনা আর গয়ায় দুটো বাড়ি আছে, ভাড়া পায়। রেস্টুরেন্টও খুব চালু, একটা টু হুইলার আছে টুনিকে পিছনে বসিয়ে নিয়ে যায় পৌঁছে দেয়।’
‘তাতো বুঝলুম কিন্তু বাইজির ছেলেকে জামাই করলে লোকের সামনে মুখ দেখাবি কী করে, টুনি এটা জানে?’
‘জানে নিশ্চয় তবে আমাদের কিছু বলেনি আর আমরাও ওকে বলিনি যে জেনেছি। হাইকোর্টের এক উকিল প্রথম আমায় জানায়, বার লাইব্রেরিতে আলাদা ডেকে নিয়ে বলল, চৌধুরী সাব আপনার মেয়েকে দু-দিন দেখলাম মোটরবাইকে কদমকুঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। যে ছেলেটি চালাচ্ছিল তাকে আমি জানি আমার মহল্লাতেই থাকে, কিশোরী বাইজির ছেলে প্রেমপ্রকাশ। বাবা বলে একজনকে পরিচয় দেয় বটে কিন্তু লোকটা ওর আসল বাবা নয়। আপনার মেয়েকে মানা করে দেবেন বেশি মেলামেশা না করে। শুনে তো আমি থ।’
‘আমিও তো অবাক হচ্ছি। টুনি দেখতে শুনতে খুবই ভালো কিন্তু ছেলেটা অমন একটা পঙ্গু মেয়েকে কেন বিয়ে করতে চায় জিজ্ঞেস করেছিস?’
‘করেছি। বলল হ্যান্ডিক্যাপড বলেই বিয়ে করতে চায়।’
‘তার মানে দয়া দেখাতে চায়।’
‘তাতো বটেই।’
‘টুনি কী বলছে?’
‘ওকে এখনও বলিনি তবে প্রেম নিশ্চয় ওকে না জানিয়ে আমাকে বিয়ের কথা বলেনি। টুনি কিন্তু হাবেভাবে আগের মতোই রয়েছে, এমনিতেই খুব চাপা মেয়ে এখন আরও চাপা হয়ে গেছে।’
‘ওকে এখানে আনলি কেন?’
‘আমরা বোঝাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তুমি এবার একটু ওকে বুঝিয়ে বলো।’ মিনতি ভরা স্বরে বলে যতীন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
নগেন্দ্র বিব্রত বোধ করলেন। এমন সমস্যায় জীবনে পড়েননি। নিজের নাতনি বংশের মুখে চুনকালি মাখাতে যাচ্ছে সেটা ঠেকাতে হবে। মেয়েটিকে তিনি প্রায় জানেনই না, তিন-চারবার এই বাড়িতে এসে কাটিয়েছে একবেলা। চুপচাপ থেকেছে গান শুনিয়েছে। দু-বছরের ছোটো কীর্তির সঙ্গেই যা কিছু কথা বলেছে।
‘টুনিকে কী বলে এখানে এনেছিস?’
‘প্রায়ই বলে পায়ে একটা ব্যথা করে। তাই বলেছি কলকাতায় চল বড়ো ডাক্তার দেখাব যদি অপারেশন করে ঠিক করে দিতে পারে, তোর কাকার চেনাশোনা অনেক স্পেশালিস্ট আছে। একটা কথা বাবা, তুমি কিন্তু অতীন বা বউমাকে এই ব্যাপারটা সম্পর্কে একদম কিছু বলবে না।’
নগেন্দ্র শুকনো হেসে মাথাটা সামান্য ঝোঁকালেন। ‘অনেকক্ষণ বাইরে আছি, ভেতরে চল।’
বসার ঘরে টুনি আর কীর্তি কথা বলছে, রেবা রান্নাঘরে। সেখান থেকেই সে চেঁচিয়ে বলল, ‘টুনি আলুভাজা খাবি।’
টুনি জবাব দেবার আগেই কীর্তি বলে উঠল, ‘মা আমিও খাব।’
সোফায় বসে নগেন্দ্র বললেন, ‘যতীন তোর সঙ্গে নীচের ঘরের চাবি আছে?’
‘আছে।’
‘তা হলে খুলে দে। একটা তক্তাপোশ তো রাখা আছে রাতে আমি গিয়ে শোব, টুনি শোবে আমার ঘরে। তুই কোথায় থাকবি? এখানে না গোয়াবাগানে?’
‘আমি ওখানেই থাকব।’
‘তুমি নীচে শোবে কেন! আমি গিয়ে শোব।’ কীর্তি বলল।
‘না।’ নগেন্দ্র প্রায় ধমকে উঠলেন। ‘রাতে তোকে পড়তে হয়, পরীক্ষা এসে গেছে, বইপত্তর হাতের কাছে না থাকলে অসুবিধে হয়। আমি তো শুধু রাতটুকু থাকব।’
প্লেটে আলুভাজা নিয়ে রেবা এল।
‘কাকিমা আমি কিন্তু খাব না।’ ক্ষীণ গলায় টুনি বলল।
‘খাবি না কেন! মোটা হয়ে যাবার ভয়ে?’ রেবা ঠাট্টার সুরে বলল, ‘টিভি-তে মডেলদের যা চেহারা দেখি মনে হয় যেন দুর্ভিক্ষের দেশের মেয়ে, তুই যেন অমন চেহারা করিসনি। গায়ে একটু চর্বি না থাকলে মেয়েদের লাবণ্য হয় না, নে খা।’ রেবা প্লেটটা টুনির সামনে ধরল। হাত বাড়িয়ে কীর্তি দুটো টুকরো তুলে মুখে দিয়ে বলল, ‘টুনিদি যদি না খায় তা হলে আমিই সবটা খেয়ে নোব।’
‘কী হল, খাবি না?’ রেবা হালকা ধমকের সুরে বলল। টুনি একটা টুকরো তুলে নিয়ে বলল, ‘আলু আমার ভালো লাগে না।’
যতীন নীচে নেমে গেল। নগেন্দ্র রেবাকে বললেন, ‘রাতে টুনি আমার ঘরে শোবে, আমি শোব নীচের ঘরে।’
রেবা শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে শুধু ভ্রূ কোঁচকাল, কিছু বলল না।
‘শোভাকে বলো ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দিতে। কীর্তি সুটকেসটা আমার ঘরে রেখে আয়।’
কীর্তি সুটকেস হাতে নিয়ে টুনিকে বলল, ‘এসো আমার সঙ্গে, একটা জিনিস দেখাব।’
টুনি উঠে নগেন্দ্রর ঘরে দিকে যাচ্ছে, রেবা তাকিয়ে দেখছে। ‘কষ্ট হয় দেখলে, দু- বছর আগে দেখেছি কী সুন্দর হাঁটত।’ আপন মনে রেবা বলল।
নগেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে তার ঘরের মধ্য দিয়ে বারান্দা দেখতে পেলেন। কীর্তি আঙুল দিয়ে কিছু একটা টুনিকে দেখাচ্ছে। তিনি বুঝলেন রমেনের দোকান আর সেদিনের ঘটনাকীর্তির কথা বলার বিষয়।
