রেবা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল, বলল, ‘এ বাড়িতে মিষ্টির কোনো জিনিস আর ঢুকবে না।’
‘তার মানে এবার থেকে তোমরা বাইরে মিষ্টি খাবে। ভালো কথা অতীন, কাল যতীন আসবে ওর বড়োমেয়ে টুনিকে সঙ্গে করে। কিছুদিন টুনি আমাদের এখানে থাকবে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝলুম না, মেয়েটাকে হঠাৎ এখানে রাখতে চাইল কেন। বলল এখানে এসে বলবে।’
পরদিন সকালে অতীন যখন গাড়ি বের করার জন্য গ্যারেজের দরজার পাল্লা খুলেছিল তখন অটোরিকশা থেকে যতীন ও টুনি নামল। টুনির পরনে খয়েরি রঙের ফুল ছাপ দেওয়া হলুদ সালোয়ার-কামিজ, খয়েরি ওড়না, হাতে একটা ছোটো সুটকেস। যতীনের মাথায় টাক, কানের উপরের চুল আধপাকা, পুরু গোঁফ, চকচকে কামানো গাল, বাবার মতো লম্বা এবং চওড়া বেল্ট দিয়ে প্যান্টটি ভুঁড়িতে আটকে রাখা। সুটকেসটি সে টুনির হাত থেকে নিয়ে গেট দিয়ে ঢুকল। টুনি হাঁটতেই বোঝা গেল সে খোঁড়া।
অতীন শুনেছিল দু-বছর আগে বাসের ধাক্কা লাগায় টুনি আর নমিতা সাইকেল রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে, তারপর টুনিকে হাসপাতালে থাকতে হয় দশদিন। এর বেশি পটনা থেকে আর কিছু জানানো হয়নি, রাজা গার্ডেনও জানার জন্য ব্যস্ততা দেখায়নি শুধু নগেন্দ্র একবার বলেছিলেন, ‘বউমা মেয়েটার একবার খবর নিয়ো, দশদিন হাসপাতালে ছিল!’ রেবা বলেছিল ‘গুরুতর তেমন কিছু হলে নিশ্চয় ওরা জানাত, তা যখন জানায়নি তখন বুঝতে হবে ভালোই আছে।’
অবাক হয়ে অতীন ভাইঝির দিকে তাকিয়ে রইল। দু-বছর আগেও যাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখেছে তার হাঁটা যে এমন করুণা জাগানো বিস্ময়ের কারণ হবে এটা তার কাছে অপ্রত্যাশিত। বাঁ পা ফেলার সময় টুনির শরীর এমনভাবে বাঁদিকে ঝুঁকল যে পড়ে যাবে কিন্তু পড়ল না। ডান পা বাড়াতেই শরীর সিধে হল। বাঁদিক ডানদিক করে দুলে দুলে টুনি এগিয়ে এসে কাকাকে প্রণাম করল।
ফ্যাল ফ্যাল চোখে অতীন তাকিয়ে রইল দাদার দিকে। স্বাভাবিক মুখ করে যতীন বলল, ‘বাসের চাকায় গোড়ালিটা গুঁড়িয়ে গেছল। পটনার টপ সার্জন ডাক্তার শিবেন পাণ্ডে অপারেশন করে পা-টা বাঁচিয়েছেন, বাদ দিতে হয়নি।’
বাদ না যাওয়ার কৃতিত্বটা যেন তারই এমন মুখ করে যতীন বলল, ‘তুই ফিরবি কখন, দুপুরে? আয়, তখন কথা বলব।’
সুটকেস হাতে নিয়ে যতীন সিঁড়ির দিকে এগোল, তার পিছনে টুনি। অতীন ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি তার দুটো কাঁধ ধরল।
‘কাকাবাবু আমি নিজেই যেতে পারব।’ নরম লাজুক স্বরে টুনি বলল।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ও নিজেই দোতলায় উঠতে পারবে।’ যতীন মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘কলেজ টলেজ তো একাই যায়। হাঁটাচলায় এখন আর কোনো অসুবিধে হয় না।’
‘না হোক অসুবিধে, চলো দোতলা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি।’
দোতলায় সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল রেবা। সে কয়েকধাপ নেমে এসে টুনির হাত ধরল, ‘আয়।’
নগেন্দ্র কীর্তি এমনকী শোভাও কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে টুনির পা নিয়ে একটি কথাও বলল না, সহানুভূতি জানাবার চেষ্টা তো নয়ই। সবাই কথাবার্তায় এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন দু-বছর আগের স্বচ্ছন্দে হাঁটাচলা করা টুনির সঙ্গেই তারা কথা বলছে। একসময় নগেন্দ্র বড়ো ছেলেকে বললেন, ‘মুশকিলে পড়েছিস বললি কাল টেলিফোনে, কী ব্যাপার?’
বসার ঘরে তারা কথাবার্তা বলছিল। যতীন ইতস্তত করে বলল, ‘চলো বারান্দায় যাই।’
দু-জনে বারান্দায় এল। নগেন্দ্রর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল রমেনের দোকানে। একইভাবে রয়েছে কাঠের পাল্লা বোধ হয় কোনোদিন আর খুলবে না। অরুণ নস্কর বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, বাতে পঙ্গু দেবেন একা বাড়িতে। রোজই একবার চাকরের হাত ধরে বারান্দায় এসে গ্রিল ধরে চেয়ারে বসে বাইরের পৃথিবী দেখে। নগেন্দ্রকে দেখে হাতটা একবার তোলে।
দোকান থেকে দেবেনের বারান্দা, সেখান থেকে চোখ সরিয়ে তিনি ছেলের মুখের উপর রাখলেন ‘বল।’
‘টুনির একটা বিয়ে ঠিক করেছিলুম, তখন ওর পায়ের এই ব্যাপারটা ঘটেনি। রাইটস অ্যান্ড করবেট ওষুধ কোম্পানিতে ছেলেটি অ্যাসিন্ট্যান্ট মার্কেটিং ম্যানেজার, বেশ ভালো দেখতে শুনতে আঠাশ বছর বয়স, বাড়ি দমদমে, পটনাতে ঘর ভাড়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকে। মাইনে পায় সাত হাজারের মতো, দমদমে নাগেরবাজারে নিজেদের বাড়ি, বাবা নেই, মা আর এক ভাই এক বোন। টুনির গান শুনতে অনেকবার আমাদের বাড়িতে এসেছে,ওর মা-ও এসেছে। টুনিও গেছে মাঝে মাঝে ওদের বাড়িতে। বিয়ের প্রস্তাবটা প্রথমে দেয় ওর মা। আমরা রাজি হই। শুধু একটা জায়গায় একটু খচখচানি ছিল আমরা দক্ষিণ রাঢ়ি ওরা বঙ্গজ। যাকগে ওসব, ছেলেটা তো ভালো, পাকা চাকরি, উন্নতির পথও খোলা, অনেকদূর উঠতে পারবে, সংসারটাও ছোটো। এইসব দেখেই তোমার বউমা বলল, হ্যাঁ বলে দাও। ওদের মেলামেশায় আমরা আর আপত্তি করিনি। ওদের দাবিদাওয়া কিছুই ছিল না কিন্তু আমার বড়োমেয়েকে আমি তো কিছু দোব!’ টানা কথাগুলো বলে যতীন দম ছাড়ল।
‘হ্যাঁ তাতো দিবিই। বলে সবাই দাবিদাওয়া নেই কিন্তু মনে মনে অনেক কিছুই আশা করে, না পেলে বউকে গঞ্জনা দেয়। তুই কত খরচ করবি ঠিক করেছিলি।’
‘বিয়ের খরচ-খরচা বাদে এক লাখ টাকা। যাই হোক, তারপরই টুনির অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটে গেল। ব্যস তারপর ওদের মত বদলে গেল। খোঁড়া মেয়েকে ছেলের বউ করবে না, ছেলেও মায়ের কথায় সায় দিল। সব শুনেটুনে টুনিও বলল, এখানে বিয়ে করবে না, পড়াশুনো চালিয়ে যাবে। আমরাও ভেবে দেখলুম এখন ওকে বিয়ের কথা না বলাই ভালো। কিন্তু যে মুশকিলের কথা তোমায় বলেছিলুম ফোনে সেটা হল এখন একটি ছেলে ওকে বিয়ে করতে চাইছে।’
