টুনি যতীনের বড়ো মেয়ে, বছর কুড়ি বয়স। এই বছরে পাটনা কলেজে বি এ ফার্স্ট ইয়ারের ইতিহাস অনার্স নিয়ে ভরতি হয়েছে। নগেন্দ্র দু-বছর আগে ওকে দেখেছেন যখন যতীন সপরিবারে পিতৃদর্শনে এসেছিল। নাতনিটিকে তার খুব ভালো লেগেছিল। ছিপছিপে শ্যামলা লম্বাটে মুখ, কথা বলে ধীর এবং অল্পবাক, সুরেলা মিষ্টি গলা, দুটি অতুলপ্রসাদের গান গেয়ে শুনিয়েছিল। প্রথম গানটি গাওয়া শেষ হতেই কীর্তি ছুটে গিয়ে তার টেপ রেকর্ডটারটা নিয়ে আসে। ওর কাছে নতুন টেপ ছিল না, একটা ইংরিজি রক গান টেপ থেকে মুছে দিয়ে কীর্তি তার উপর তুলে নেয় তার টুনিদিদির গাওয়া ‘পাগলা মনটাকে তুই বাঁধ।’
‘শুধু টুনি! আর সবাই আসেনি?’
একটু ইতস্তত করে যতীন বলল, ‘না আসেনি, কাল সকালে গিয়ে সব বলব।’
‘তোর ভাড়াটে পয়লা আসছে তো?’
‘না আসবে না। ভদ্রলাকের কলকাতায় বদলি হওয়াটা ক্যানসেল হয়ে গেছে তার বদলে যাচ্ছেন কটকে।’
‘আর একটা কথা। টুনিকে এখন কিছুদিন তোমার ওখানে রাখতে চাই। অসুবিধে হবে না তো?’
‘অসুবিধে আর কী হবে।’ নগেন্দ্র একটু অবাক হলেন, শ্বশুরবাড়ি থাকতে যতীন টুনিকে এখানে রাখতে চায় কেন, ওর যত ঘনিষ্ঠতা তো গোয়াবাগানের সঙ্গে।
‘বউমা আর অতীনের যদি অসুবিধে হয় তাই বললুম।’
নগেন্দ্র এবার স্বর গম্ভীর করে বললেন, ‘আমি বলছি তুই টুনিকে আমার কাছে রেখে যা।’
‘তা হলে কাল যাচ্ছি।’
রেবা কাছেই দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শুনছিল। নগেন্দ্রর শেষ কথাটির খেই ধরে বলল, ‘ভাসুরঠাকুর টুনিকে এখানে রাখতে চাইছেন, কেন?’
নগেন্দ্র পুত্রবধূর ভ্রূ ও গলার স্বরের কুঁচকে যাওয়া লক্ষ করে অপ্রসন্ন হলেন। তিনি জানেন রেবা পছন্দ করে না নমিতাকে এবং এটাও জানেন যতীনের মতো তার স্ত্রীও স্বার্থপর, কৃপণ ও পরশ্রীকাতর। কিন্তু ওদের ছেলেমেয়েরা কেউই বাবা-মার মতো হয়নি। টুনির এখানে এসে থাকাটা রেবা মন থেকে চাইবে না এটা অনুমান করতে নগেন্দ্রর অসুবিধা হল না।
‘কেন এখানে রাখতে চাইছে সেটা কাল যতীন এলে জানা যাবে। তোমার কি খুব অসুবিধে হবে? বলল কিছুদিন রাখতে চায়।’
‘টুনি তো ওর মামার বাড়িতেই থাকতে পারে।’
‘ঠাকুরদার বাড়ি থাকতে মামার বাড়িতে থাকবে কেন?’ নগেন্দ্রর স্বরে বিরক্তি স্পষ্ট হল।
তর্কের সুরে রেবা বলল, ‘এতকাল তো ওরা মামার বাড়িতেই এসে উঠেছে থেকেছে। এখন কী এমন দরকার পড়ল এখানে এসে থাকার? তা ছাড়া টুনি বড়ো হয়েছে, থাকার জন্য ওর তো আলাদা একটা ঘর চাই।’
নগেন্দ্র টুনির থাকার জন্য এই সমস্যাটা খেয়াল রাখেননি। রেবার যদি টুনির বয়সি মেয়ে থাকত তা হলে কোথায় রাত্রে শুত? বড়ো ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা ঘর চাই। দোতলায় দুটি শোবার ও একটি বসার ঘর। আড়াই তলার ছোটো ঘরটা কীর্তির। একসময় কীর্তির বিয়ে হবে তখন বউ নিয়ে ওই ছোটো ঘরটায় থাকা ওদের পক্ষে সম্ভব হবে না। অবশ্য বিয়ে অন্তত বছর দশেকের আগে হচ্ছে না আর ততদিনে তিনি মারা গিয়ে ঘরটা খালি করে দেবেন। এই নিয়ে তিনি ভেবেছেন এবং ঠিক করে রেখেছেন বাড়ির লাগোয়া খালি জমি থেকে অতীনকে চার কাঠা দেবেন। এখানে বাড়ি করার ইচ্ছা ওর আছে কি না সেটা এখনও তিনি জানেন না।
‘দোতলায় শোবার আর ঘর নেই তো কী হয়েছে! যতীনকে বলব নীচে ওর একটা ঘর খুলে দিক আমি গিয়ে থাকব।’ নগেন্দ্র চোখ দুটো কড়া করে তাকিয়ে রইলেন নিজের অনমনীয় মনোভাব জানাতে।
রেবা গলা নরম করে বলল, ‘টুনি আপনার নাতনি ওকে যেভাবে রাখতে চান রাখবেন তাতে আমি বলার কে?’ মুখ ভার করে রেবা শোবার ঘরে চলে গেল।
রাত্রে অতীন ফিরল ব্লাড রিপোর্ট সঙ্গে নিয়ে।
‘ওষুধ একেবারে কিনেই এনেছি।’ রিপোর্টের খামটা বাবার হাতে দিয়ে অতীন বলল, ‘কাল থেকে খেতে শুরু করো। পিপি নর্মালের থেকে একশো বেশি, ফাস্টিংও নর্মালের ডাবল। তুমি কি জানতে সুগার বেশ ভালোমতোই তোমার হয়েছে?’ অতীনের কথা বলার ধরনে যথেষ্ট উদবেগ।
নগেন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, ‘কিচ্ছু জানতুম না।’
‘আর নেগলেক্ট করা নয়, কাল থেকেই রেস্ট্রিক্টেড। খাওয়াদাওয়া, নিয়মিত সকালে একঘণ্টা হাঁটা, চিনির জিনিস একদম বন্ধ। মনে রেখো এই সুগার থেকেই হার্ট ব্রেইন কিডনি, লিভার, প্রেশার সবরকমের খানদানি রোগের সূত্রপাত হয়। ডায়বিটিস কখনো সারে না, একে শুধু কন্ট্রোলে রাখতে হয়।’ অতীন আর কিছু বলল না। তার ধারণা বললে কিছু বুঝবেও না। বাবা এখন যে বয়সে তাতে বেশি বুঝতে গেলে সব গুলিয়ে ফেলবে। আসলে কে ওঁকে চালনা করবে, ওঁকে প্রতিদিনের নিয়ম পালনে বাধ্য করবে তাকে অর্থাৎ রেবাকেই বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। ‘আমি রেবাকে বলে দিচ্ছি, কী কী খাবে না, বেড়ানো ঘুমোনো সব দিকে যাতে নজর রাখে। একটা কথা, যদি ভালোভাবে বাঁচতে চাও তো এখন থেকে যা বলব তাই করবে।’
কথা বলার ধরনটা ঠিক ডাক্তারের মতো নয়, নগেন্দ্রর মনে হল বাবাকে বাঁচাবার জন্য ছেলের উৎকণ্ঠাই যেন বেরিয়ে এল অতীনের গলা দিয়ে। নিজেকে তার ছেলেমানুষ মনে হচ্ছে। তবে রেবা এবার থেকে তার উপর কর্তৃত্ব করবে এটা ভেবেই তিনি অস্বস্তি বোধ করলেন।
‘নুন খাওয়া বন্ধ করলি এবার চিনিও, তা হলে খাবটা কী?’
‘দেদার ভালোমন্দ খেয়ে এসেছ ছোটোবেলায়, এখন ঠ্যালা সামলাতে কষ্ট তো করতে হবেই।’
