দোকানের ভিতরের দিকে বোমাটা ফেটেছিল। সামনের দিকের মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। বিমূঢ় অবস্থাতেও নগেন্দ্র দেখেছিলেন পানপরাগের ঝুলন্ত মালা তখনও ঝুলছে, কাচের বাক্সটা উলটে পড়ে গেছে মাটিতে। স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অন্ধকারের সঙ্গে চোখ সইয়ে তিনি বুঝলেন বাক্সটা নেই, সামনের কাঠের পাটাতনগুলো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। দোকানের আসল মালিক অরুণ নস্কর বোধ হয় কাউকে দিয়ে চুরি বন্ধের জন্য এটা করিয়েছে।
নগেন্দ্র অনুমান করতে চেষ্টা করলেন তখন তিনি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, রমেন কোনখানে এসে উপুড় হয়ে মুখ তুলে ‘মেসোমশাই’ বলেছিল। একটা জায়গা আন্দাজ করে ধীরে ধীরে উবু হয়ে বসে মাটিতে হাত রেখে দু-ধারে তাকালেন। মনে হল অটোরিকশার ইঞ্জিনের শব্দ যেন শুনতে পেলেন। পূর্ণ সরকার রোডের দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘ওঠো রমেন পালাও ওরা আবার আসছে।’ চোখ বন্ধ করে তিনি সিঁটিয়ে অপেক্ষায় রইলেন বিস্ফোরণের শব্দের জন্য। অনেকক্ষণ পর চোখ খুললেন। কপালে ঘাম ফুটে উঠেছে। ডায়মন্ডহারবার রোড দিয়ে ভারী ট্রাক যাবার ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল তা ছাড়া রাজাগার্ডেন আগের মতোই নিস্তব্ধ। নগেন্দ্র মুখ নীচু করে বললেন, ‘বারো টাকা তুমি পাবে কিন্তু কোনোদিনই শোধ করতে পারব না, এ কী ঝঞ্ঝাটে আমাকে ফেলে গেলে রমেন। এই দেনা আজীবন টেনে যেতে হবে, আমাকে কোথায় রেখে গেলে রমেন।’ নগেন্দ্র ফুঁপিয়ে উঠলেন।
অরুণোদয়ের বন্ধ গ্যারেজে আলো জ্বলে উঠল। দরজার পাল্লার তলা দিয়ে আলো বেরিয়ে এসেছে। নগেন্দ্র অবাক হয়ে গেলেন, এত রাতে কার দরকার হল গাড়ি চড়ার? ভিতর থেকে গ্যারেজে ঢোকার দরজা আছে, কেউ ঢুকে আলো জ্বেলেছে। নগেন্দ্র অপেক্ষায় রইলেন। ভিতর থেকেই দরজাটা হাট করে খুলল অরুণ নস্করের ড্রাইভার। বাইরে বার করে এনে গ্যারেজের দরজা বন্ধ করতে নামল। নগেন্দ্রর মনে হল পিছনের সিটে বসে একটা লোক।
হেডলাইট জ্বেলে গাড়িটা হীরকনগরের দিকে এগিয়ে গেল। নগেন্দ্র দু-ধারের বাড়িগুলোকে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসেই অন্ধকারে ফিরে যেতে দেখলেন। রাস্তা পার হয়ে তিনি ফিরে এলেন বাড়ির গেটে।
‘দাদু।’
নগেন্দ্র চমকে গেলেন। গেটের পিছনে কীর্তি ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে। নিশ্চয় তার পিছু নিয়ে নেমে এসে অপেক্ষা করছিল।
‘তোর নামার কী দরকার ছিল?’
‘তুমিই বা এত রাতে এই ঠান্ডায় বেরিয়েছ কেন?’
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নগেন্দ্র নাতির পিঠে হাত রেখে বললেন ‘ওপরে চল।’
কথা না বলে তারা দোতলায় উঠে এল। নগেন্দ্রর ঘরে এসে কীর্তি আলো জ্বালল। খাটে বসে তিনি নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রশ্নের অপেক্ষায়। প্রশ্ন না করে কীর্তিও তাকিয়ে রইল। নগেন্দ্র এই প্রথম লক্ষ করলেন ওর ঠোঁটের উপর হালকা গোঁফের রেখা, থুতনির লোমগুলো বড়ো হয়ে গেছে।
‘কীর্তি আমরা দু-জনেই কিন্তু রমেনকে মনে রেখে দোব, আমার দেনা আর তোর পাওনার জন্য।’
‘তোমার মনে থাকবে কিন্তু আমার থাকবে না।’
‘থাকবে না কেন?’
‘মনে রাখার মতো অনেক ভালো জিনিস আমার আছে, এইভাবে মরাটা খুব গৌরবের মৃত্যু নয়।’
‘আমি যদি রোগে ভুগে মরি সেটা তো গৌরবের মৃত্যু হবে না, তুই তা হলে আমাকে মনে রাখবি না?’ নগেন্দ্র উদবিগ্ন চোখে তাকালেন।
‘রোগটা জীবনের একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আচ্ছা দাদু তোমার বাবা তো শুনেছি হার্টের ডিজিজে মারা যান, স্বাভাবিক মৃত্যু, তাকে কতটা মনে রেখেছ?’
চট করে উত্তর দিতে পারলেন না নগেন্দ্র। তার ক্ষীণ বিশ্বাস, কিডনির অসুখে তিনি আক্রান্ত হবেন তার পর ডায়ালিসিস করে বাঁচার চেষ্টা, যে জন্য বছরে খরচ হবে প্রায় দু-লাখ টাকা। টাকাটা অবশ্য অতীন দিতে পারবে তবে যতীন দেবে না, দিলেও কিছু একটা ছুতোয় সামান্য কিছু ঠেকাবে। দিতে পারলেও অতীন ক-বছর এতগুলো টাকা দেবে?
উত্তরের জন্য কীর্তি তাকিয়ে আছে দেখে তিনি হেসে ফেললেন, ‘খুব জবরদস্ত একটা প্রশ্ন করলি বটে, সত্যি কথা বলতে বাবাকে এখন একদমই মনে পড়ে না, এটাও কিন্তু স্বাভাবিক ব্যাপার। আসলে মনে পড়ার মতো কিছু বাবা করেনি বরং আমার সৎ মা করেছে, আমার পালোয়ান হওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছিল। যাক অনেক রাত হল এবার শুতে যা।’
চার
দু-বার নগেন্দ্রর রক্ত নিয়ে গেল বোস প্যাথলজির লোক, খালি পেটে আর ভাত খাবার দু-ঘণ্টা পর। রাত্রে অতীন রিপোর্ট নিয়ে বাড়ি ফিরবে। সন্ধ্যাবেলায় যখন তিনি টিভি-তে খবর শুনছিলেন তখন ফোন বেজে উঠল। রেবা ফোন ধরল। নগেন্দ্র রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে টিভি-র গলা নামিয়ে দিলেন।
‘বাবা, ভাসুরঠাকুর ফোন করছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ রেবার গলায় বিস্ময়।
নগেন্দ্রও বিস্মিত। হঠাৎ যতীন পাটনা থেকে ফোন করছে, ব্যাপার কী?
‘কে যতীন, বাবা বলছি, কী ব্যাপার?’
‘বাবা আমি গোয়াবাগান থেকে কথা বলছি। একটু মুশকিলে পড়ে গেছি। তোমার সঙ্গে তাই কথা বলতে চাই।’
যতীনের স্বর চাপা এবং অস্থিরতা মেশানো। সেটা লক্ষ করে নগেন্দ্র বুঝলেন উকিল যখন কথা বলতে চায় তখন মুশকিলটা হালকা ধরনের নয়।
‘তুই কলকাতায় কবে এলি?’
‘দুপুরে এসেছি।’
‘বউমা, ছেলেমেয়েরা।’
‘ওরা পাটনাতেই রয়েছে শুধু টুনি আমাদের সঙ্গে এসেছে।’
