নগেন্দ্র রাতের খাওয়া, তিনটি রুটি ডাল ও তরকারি, শেষ করলেন যখন ঘড়িতে তখন ন-টা বাজতে পাঁচ। কীর্তি তার নিজের ঘরে, অতীন টিভি দেখছে। রেবা খাওয়ার টেবলে শ্বশুরকে সঙ্গ দিচ্ছে এবং সোয়েটার বুনছে। এই পরিবারে দশটার আগে রাতের খাওয়ার চল নেই, এগারোটার পর কেউ জেগে থাকে না শুধু কীর্তি ছাড়া। নিজের ঘরে সে বেশি রাত পর্যন্ত পড়াশুনো করে।
‘কাল থেকে আপনাকে ব্লাড প্রেশারের ওষুধ খেতে হবে। আপনার ছেলে লিখে দিয়েছে, দুটো করে বড়ি।’
নগেন্দ্র হাত ধুয়ে তোয়ালেতে মুখ মুছছিলেন। একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘প্রেশার খুব বেশি কি?’
‘একটু বেশি। পাতে কাঁচা নুন একদম বন্ধ, মুড়ি খাওয়াও। এবার থেকে রান্নাতেও নুন কম দেওয়া হবে।’
‘সেটা কি আমার জন্যই?’
হাতের বোনা থামিয়ে রেবা শ্বশুরের দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল, ‘সকলের জন্যই। ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন থেকেই সাবধান হওয়া উচিত। ওনারও প্রেশারটা মাঝে মাঝে বেড়ে যায়। এটা বোধ হয় আপনাদের বংশের ধাত।’
নগেন্দ্র বাবাকে দেখেছেন, বংশ বলতে যদি ঠাকুরদা, জ্যাঠা, কাকা বোঝায় তাহলে কাউকেই দেখেননি। তার কাছে বংশটা বাবাতেই শুরু, বংশধর বলতে তিনি নিজে এবং সতাতো ভাইয়েরা। বাবার রক্তচাপের সমস্যা ছিল কি না সেটা জানেন না, তাকে কখনো ওষুধ খেতে দেখেননি। তবে শেষ জীবনে মোটা হয়ে পড়েছিলেন। মারা যান হঠাৎ হার্টফেল করে। নগেন্দ্র মোটা হননি। অতীনেরও রক্তচাপ বেড়ে যায় শুনে তিনি উচাটন হলেন।
‘তা হলে কাল থেকেই রান্নাবান্নায় নুন কম দিতে বোলো শোভাকে।’
আজ তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লেন নগেন্দ্র কিন্তু ঘুম আসছে না। অন্ধকার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বাতাস নেই তাই শীত করছে না। একটা জমাট ঠান্ডা চেপে বসল শরীরে। এটা তার ভালোই লাগল। রাস্তার দু-দিকে তাকালেন ঘুটঘুটে কালো। বহুদূরে রাস্তার ইলেকট্রিক পোস্টে একটা নিওন আলো জ্বলছে। এ পাড়ায় সবকটা রাস্তার আলো কখনো তিনি একসঙ্গে জ্বলতে দেখেননি। অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ এলাকাটা। কিছুক্ষণ আগেও টিভি চলার শব্দ পেয়েছেন।
নগেন্দ্র বারান্দায় ঝুঁকে রমেনের দোকানের দিকে তাকালেন। ঠিক কোনখানটায় বেঞ্চে বসেছিলেন সেই জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করে ঠাওর করতে পারলেন না। সবাই বলছে খুব বেঁচে গেছি,কীর্তি দাদুর পুনর্জন্ম সেলিব্রেট করতে চাইল। ভাগ্য মানতে এখন আর আপত্তি করার প্রশ্ন ওঠে না। বাইরে সদ্য মৃত্যু ঘটেছে একজনের আর একজন মরোমরো ঠিক তখনই তার ব্লাডপ্রেশার মাপছে ছেলে। তিনি মরেননি কিন্তু মরণ কতটা এগিয়ে এসেছে সেটা মাপা হল। আপাতত তার মৃত্যু হচ্ছে না। দুপুরেই ম্যাগাজিনে এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের লেখায় পড়েছেন-অহেতুক উদাসীনতায় প্রেশার আর সুগারের রোগীরা যেচেই নিজেদের জীবনে বিপদ ডেকে আনেন। আজ যারা ডায়ালিসিস বা ট্রান্সপ্লান্টের জোরে বেঁচে আছেন তাদের বেশিরভাগই হয় সুগারের নয়তো হাই প্রেশারের রোগী ছিলেন।
ম্যাগাজিনে এই জায়গাটা পড়েই তার খটকা লেগেছিল, অহেতুক উদাসীনতা বলতে কী বোঝায়? অনুভূতি তখন থেকে কাজ করতে শুরু করে দেয়, বোধ হয় তার রক্তে কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে নয়তো অতীন ঘরে ঢুকেই কীরকম চাউনি নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলবে কেন, শরীর কেমন লাগছে। যখন জানা গেল প্রেশার রয়েছে স্বাভাবিকের অনেক উপরে তখন ভয় পেয়ে মুহূর্তে সবাই ভুলে গেল একটু আগে বাড়ির সামনেই অস্বাভাবিক একটা ঘটনায় মানুষ মারা গেছে। বাড়ির সবাই প্রতিদিন দেখত যে রমেনকে তারা সঙ্গে সঙ্গে মন থেকে তাকে খারিজ করে দিল। রেবার কাছে বড়ো হয়ে উঠল শ্বশুর যেন কীর্তির সঙ্গে মুখের আদলের মিলের কথাটা না বলে ফেলে।
কীর্তি এসেই জানাল সে ফরচুনেট আর পুনর্জন্ম হয়েছে, দুটো শব্দকে আঁকড়ে ধরে তারা পেল তৃতীয় শব্দ সেলিব্রেট। তখনই চোখ থেকে সরে গেল রমেনের দু-হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে ছুটে এসে তার পায়ের কাছে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা। নগেন্দ্রনারায়ণ চোখ বন্ধ করে মাথা নীচু করলেন, কানের পিছন গরম হয়ে উঠল।
স্যান্ডো গেঞ্জিপরা রমেনের বুক কাঁধ বাহুর তারিফ করতেন মনে মনে, প্রতিদিনই কিছু একটা কিনতেন আর কিছুক্ষণ কথা বলতেন। ওর স্পষ্টাস্পষ্টি কথাগুলো তার ভালো লাগত,ছেলেটার মধ্যে ভান ছিল না। ওর মধ্যে তার পুরোনো পাড়ার হাবভাব চলনবলন দেখতে পেতেন। রমেন এখনও বারোটা টাকা তার কাছ থেকে পাবে। ওকে মন থেকে সরিয়ে তিনি কী করে গলদা আর ভেটকি পাবেন কি না বেলা করে বাজারে গেলে এই ভাবনাটা মাথায় আনতে পারলেন! পাষাণ ভারের মতো একটা প্রবল চাপ তার বুকের মধ্যে চেপে বসল। এটা না নামাতে পারলে দমবন্ধ হয়ে বোধ হয় মরে যাবেন বলে তার মনে হতে লাগল।
অন্ধকার ঘুটঘুটে কিন্তু ঘরে বাইরে চলাফেরার পথ তার মুখস্থ। সন্তর্পণে ছিটকিনি খুলে খালি পায়ে নগেন্দ্র সিঁড়িতে বেরিয়ে এলেন। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলেন কীর্তির ঘরের দরজা ইঞ্চি ছয়েক ফাঁক। দরজা ভেজিয়ে রাখলে একটা পাল্লা খানিকটা খুলে যায়। ঘরে আলো জ্বলছে, দেওয়ালে সিলিং ফ্যানের ছায়া। কীর্তি পড়ছে এখনও। দেওয়ালে হাত দিয়ে নগেন্দ্র এক-পা এক-পা করে একতলায় নেমে দরজার খিল ও ছিটকিনি খুলে বেরোলেন। ডানদিকে গ্যারেজ বাঁদিকে গেট। গেটের মাথায় পরানো হুক আর পেটের কাছে আটকানো বোল্ট খুলে অন্ধকার রাস্তা পার হয়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এখন তার শীত করছে।
