রেবা কথার উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরোল। কীর্তি ফোনে কথা বলছে দেখে দ্রুত পায়ে তার কাছে গিয়ে বলল, ‘অনেকক্ষণ ফোন আটকে রেখেছিস, বাবা জরুরি কথা বলবে এবার ছাড়।’
কীর্তি রিসিভার রাখার আগে বলল, ‘রাখছি ক্ষণা বাকিটা পরে বলব, বাবা এখন জরুরি একটা কল করবে, গুডনাইট বাই-ই।’
দাদুর ঘরে ঢুকে কীর্তি দেখল নগেন্দ্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দাদুর পিছনে গিয়ে সে দাঁড়াল। অন্ধকার দোকানের সামনে জটলা। পথচলতি মানুষ জটলা দেখে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, প্রশ্ন করছে তারপর দোকানের কাছে এগিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করে চলে যাচ্ছে। নগেন্দ্র অনুমান করতে চেষ্টা করছেন ওরা কতটা ভয় পেয়েছে, বাঁচা-মরার ব্যাপারটা দৈবের হাতে তুলে দেবার কথা ভাবছে কতটা? শান্ত পুকুরের মতো রাজা গার্ডেনের স্থির জলে একটা থান ইট পড়ল, একটা আলোড়ন তো উঠবেই। কয়েকদিন জলটা কাঁপবে তারপর স্থির হয়ে যাবে। নিত্য কত লোককে তো পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে, ক-জন মৃতদের কথা মনে রেখে দিয়েছে, যারা পিটিয়ে ছিল তারা তো সেই হাত দিয়েই ভাত খাচ্ছে, খাবার সময় হাতটার দিকে তাকিয়ে কি মনে পড়ে কাঁচা রক্তে আর স্যাঁতলানো মাংস হাতটা মাখামাখি হয়েছিল? কুড়ি তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে একটা মানুষের শরীর তৈরি হয়ে বেড়ে উঠল, হতে পারে সে ডাকাত খুনি গুন্ডা কিন্তু তারও তো একটা প্রাণ আছে, আর পাঁচটা মানুষের মতো তারও তো জীবন ভোগ করার বাসনা আছে! সেই প্রাণটাকে তার বাসনাগুলোকে খুঁচিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে শেষ করে দিচ্ছে যারা তাদেরও তো একই রকমের প্রাণ আর বাসনা আছে! মানুষ পারে কী করে? এইরকম বোধহীন কাজ তো জানোয়ারে করে, তবে কি জানোয়ার দেখলুম আজ অটোরিকশায়? ছেলেটার মুখের আদল ছিল কীর্তির মতো।
নগেন্দ্রর বুকের মধ্যেটা হিম হয়ে গেল। মনে মনে বললেন, না কখনোই কীর্তির মতো আদলের মুখটা ছিল না। আমি ভুল দেখেছি একশো ভাগ ভুল দেখেছি। অস্থির হয়ে তিনি ঘরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখলেন কীর্তিকে। ভয় পাওয়া চোখে কীর্তির মুখটা দেখতে দেখতে অস্ফুটে বললেন, ‘দাদু, তুই মানুষ মারতে পারবি?’
প্রশ্নটা অদ্ভুত লাগল কীর্তির কাছে, বলল, ‘হঠাৎ এমন কথা। ডেফিনিটলি মারতে পারব। রমেনদাকে যখন মারতে এল তখন যদি আমি ওখানে থাকতুম আর আমার কাছে যদি রিভলভার থাকত তা হলে কী ছেড়ে কথা বলতুম? যে প্রাণ নিতে আসবে তার প্রাণও আমি নোব। যুদ্ধে সোলজাররা যা করে তাই করব।’
নাতির মুখ উত্তেজিত হয়ে রং বদলে গেছে। প্রসঙ্গটা বদলাবার জন্য বললেন, ‘মেয়েটিকে ফোন করলি?’
‘ওকে বলে দিলুম রোববার দুপুরে আমাদের বাড়িতে খাবে আর খাওয়ার উপলক্ষ্যটাও বললুম।’
‘তোর মাকে জানিয়ে রাখ, একটা মেয়ে, কী নাম? ক্ষণা, রোববারে খাবে। আমি ওকে নেমন্তন্ন করতে বলেছি, তোর মা কিন্তু বলেনি।’
‘না বললেই বা! তুমি তো বলেছ।’
নগেন্দ্র মনের গভীরে সুখবোধ করলেন। ছেলের মেয়ে বন্ধু থাকাটা রেবার পছন্দ নাও হতে পারে।
‘আমাদের সময়ে ভাবাই যেত না কোনো মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে। আমি তো কোনোদিন কলেজেই পড়লুম না। তখন আমাদের ওদিকে শুধু স্কটিশচার্চ কলেজেই ছেলেমেয়ে একসঙ্গে পড়ত। এখন তো প্রায় সব কলেজেই কো-এডুকেশন।’
‘তোমার মন খারাপ হচ্ছে?’
‘তা একটু একটু তো হচ্ছে।’ নগেন্দ্র জোরে হেসে উঠতে গিয়ে চুপ করে গেলেন, ঘরে রেবা ঢুকেছে।
‘বাবা আপনার কিন্তু শুয়ে থাকার কথা। কাল সকাল ন-টায় ব্লাড নিতে আসবে, রাত ন-টার মধ্যে আপনাকে খেয়ে নিতে হবে।’
‘বউমা কীর্তি ওর বন্ধুকে রোববারে খেতে বলেছে, এমন রান্না করো যাতে মেয়েটা সারা কলেজে রটিয়ে বেড়ায়, খেলুম বটে কীর্তিনারায়ণের মায়ের হাতের রান্না, দ্রৌপদীও শিখে আসতে পারে!’
রেবা ঠোঁট টিপে হাসল। শ্বশুর ভালোমন্দ খেতে ভালোবাসেন এটা সে জানে। যত বয়স বাড়ছে ততই ওনার খাওয়ার ইচ্ছেটা বাড়ছে। একটা-না-একটা ছুতো তৈরি করেই শোভাকে নিয়ে বাজারে মাছ মাংস কিনতে ছুটবেন। টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনালে উঠল নাতি অমনি সাড়ে তিনশো টাকা দিয়ে একটা এক বিঘৎ চওড়া পেটির ইলিশ এনে বললেন, ‘এই গাঁটটা পেরোলেই ফাইনাল আর ফাইনালে পাশ করলেই খাওয়াব আমার পুরোনো পাড়ার শর্মার রাবড়ি।’ কীর্তির আর গাঁট পেরোনো হয়নি, রাবড়িও আসেনি। নগেন্দ্র খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন, রেবার ধারণা সেটা নাতির হেরে যাওয়ার জন্য নয়।
এবারের ছুতোটা দাদুর বেঁচে যাওয়া সেলিব্রেট করার জন্য কীর্তির আবিষ্কার। রেবা এটাকে অবশ্য ছুতো বলে মনে করে না। এটা তো উৎসব করার মতোই একটা ঘটনা। এভাবে অবধারিত মরণের হাত থেকে ক-জন বাঁচে? বাড়িতে সত্যনারায়ণ বা কালীঘাটে গিয়ে পুজোও দেওয়া যায়।
‘দ্রৌপদীকে আর আমার কাছে শেখার জন্য পাঠাবেন না বাবা, ঝোলভাত যা পারব রেঁধে দোব।’
‘না মা না।’ কীর্তি নাকিসুরে আদুরে গলায় বলে উঠল, ‘ঝোলভাত নয়। তা হলে আমি ক্ষণাকে আসতে বারণ করে দোব।’
নগেন্দ্র বুঝে গেছেন রেবার ‘ঝোলভাত’ মানে জমকালো কিছু। বললেন, ‘অতীনকে বলে রেখো তো বউমা রোববার খুব সকালে আমাকে যেন গড়িয়াহাট বাজারে নিয়ে যায়, একটু বেলা হলেই গলদা কী ভেটকির আর দেখা পাওয়া যাবে না।’
