তারক একতলায় নেমে আসতেই ব্যগ্রকণ্ঠে সলিল বলল, ‘গেছলেন?’
‘কোথায়?’
‘ডাক্তারের কাছে।’
‘বলছি, বাইরে চল।’
আর কথা না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু-জন পার্কে এসে বসল।
‘বিয়ে করবে না কেন?’ তারক অসম্ভব গম্ভীর হয়ে বিষয়টিতে গুরুত্ব আরোপ করল। সলিলের মুখে দেখে সে স্পষ্টই বুঝল প্রশ্নটা আশা করেনি। ‘কালকেই চল ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে।’
সলিল এতক্ষণে নিজেকে আয়ত্ত করে ফেলেছে। অনুত্তেজিত স্বরে বলল, ‘হয় না। ও এখনও মাইনর, কুড়ি বছর বয়স হয়নি।’
তারকের মাথা গরম হতে শুরু করল সলিলের হিসেব-কষা উত্তরে। বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, মাইনরের বিয়ে হয় না সে খবরটাতো জানো দেখছি, মাইনর কুমারীর পেট করতে নেই সেটা বুঝি জানো না! এই সব ছেলেকে চাবকে সিধে করতে হয়।
‘তা নিয়ে ভাবতে হবে না। টাকা ঢাললেই মাইনরকে মেজর করে দেওয়া যায়।’
‘অনীতা বুঝি সকালে এসেছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘দুপুরে গেছল আমার কাছে, কান্নাকাটি করল খানিকক্ষণ। ও আগে বিয়ে করতে চায়।’
‘সেটাই তো স্বাভাবিক। তা ছাড়া ব্যাপার যা করেছ, তাতে ওর নার্ভাস হয়ে পড়াটাও অন্যায় নয়। হাজার হোক মেয়ে তো। করে ফেল। বিয়ে তুমি তো করবেই, নয় আগেই করলে।’
সলিল মুখ ফিরিয়ে পার্কের মধ্যে লোকেদের শোয়া-বসা-চলা কিংবা বাইরের রাস্তায় মোটরের যাতায়াত দেখতে লাগল। কথা গায়েই মাখল না। তারক লক্ষ করতে লাগল ওর চোখে কী ধরনের ভাব ফোটে। মনে হল প্রণবের-‘পরিমল মারা গেছে জানিস,’ বা নিখিল চাটুজ্যের-‘থার্টিটুতে প্রথম মিছিলে যোগ দিই,’ বলার সময় চোখ দুটোর যে অবস্থা ওরা করেছিল অনেকটা সেইরকম ভাব ফুটে উঠল। কিন্তু গুহর রগের কাছটা হঠাৎ দপদপাল কেন? ভদ্র, মার্জিত এবং সদা স্তিমিত গুহর মুখে চাষাড়ে রাগও অপ্রত্যাশিত!
‘কিছু যদি মনে না করো, একটা কথা বলব গুহ?’
‘বলুন।’
‘তোমার কি অনীতাকে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই?’
‘ও কথা বলছেন কেন?’
‘কেমন যেন মনে হচ্ছে।’
সলিল আবার শোয়া-বসা-চলা বা যাতায়াত দেখার জন্য মুখ ফেরাতেই তারক বলল, ‘তাহলে অনীতার এই সর্বনাশ করলে কেন?’
‘আমি করিনি।’
‘সে কি! কে করল!’
সলিল ইতস্তত করে বলল, ‘আপনি বয়সে বড়ো, কী করে যে ব্যাপারটা বোঝাব ভেবে পাচ্ছি না। অনীতার যা ঘটেছে সেটা আমার দ্বারাই তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ও এটা চেয়েছিল।’ সিধে হয়ে বসে সলিল তার রগের দপদপানিটা গলায় এনে বলল, ‘অনীতা নিশ্চয় পারত ব্যাপারটা না ঘটাতে। কিন্তু সেই সময় ও আমাকে বাধা দেয়নি। আমার কাছে ব্যাপারটা একদমই নতুন, সিনহাদা আপনি তো বিবাহিত, নিশ্চয়ই বুঝবেন কীরকম উত্তেজনা হয় তখন। বুঝলেন, আমি সামলাতে পারলুম না নিজেকে। ও বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছিল আমাকে ফাঁদে ফেলতে, তিল তিল করে দুর্বল করে দিচ্ছে বুঝতে পারছিলুম, কিন্তু কত পারব বলুন। আমি তো একটা মানুষ, কত সামলাব?’
সলিলের উত্তেজনা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, তারকের ইচ্ছে করছে ওর গায়ে হাত রাখতে। তার মনে হল ছেলেটা নির্দোষই। এরকম ক্ষেত্রে যে-কেউই ওর মতো হয়ে যেত।
‘সত্যি বলতে কী, এখন মনে হচ্ছে ওকে মোটেই ভালোবাসি না।’
সলিল একমুঠো ঘাস ধরে ছেঁড়ার জন্যে টানতে থাকল। এই সময় রাস্তায় মোটরের ব্রেক কসার শব্দ হল। হইহই করে কিছু লোক ছুটে গেল। কেউ চাপা পড়েছে কিনা দেখার জন্য তারক ঘাড় ফিরিয়ে গলা লম্বা করে দেখল একটা ভিড় জমেছে। সলিল মুখ নীচু করে ঘাসই ছিঁড়ছে।
‘তাহলে তুমি ওর সঙ্গে এতদিন মেলামেশা করলে কেন?’
‘কী করব!’
অসহায়ভাবে সলিল তাকাল। তারক দেখল একটা লোককে নিয়ে টানাটানি করছে সবাই। বোধ হয় মোটর ড্রাইভার। তাহলে চাপা পড়েছে, সে ভাবল, এবার কি মোটরটায় আগুন ধরবে?
‘আমার বয়স মোটে চব্বিশ। অনীতা যেমনই দেখতে হোক, একটা মেয়ে তো। আমি কী করতে পারি?’
‘তাহলেও এখন তো তুমি ওকে ত্যাগ করতে পারো না, সেটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, হৃদয়হীনের মতো কাজ হবে।’
‘জানি, হয়তো ওকেই শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে হবে।’
‘এত মনমরা হচ্ছ কেন।’ তারক দেখল একটা অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি আসছে। ‘মানিয়ে নিয়ে চললে দেখবে আর অসুখী লাগবে না। সংসার, সন্তান হলে পরই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সলিল একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। দুটো লোককে ভিড় থেকে ফিরতে দেখে তারকের ইচ্ছে করল জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? মনে হয়, সঙ্গে সঙ্গে মরার মতো অ্যাক্সিডেন্ট নয়।
‘বাড়িতে আপত্তি করে অনীতার সঙ্গে কথা বললে। ওরা তো জানেই না, এখন কী অবস্থায় ব্যাপারটা পৌঁছেছে। জাতের মিল নেই তো বটেই, দেখতে-শুনতে বা ওদের বাড়ির যা অর্থনৈতিক অবস্থা তাতে কাউকেই রাজি করাতে পারব না। মা তো একদিন স্পষ্টই অনীতাকে বলে দেয়, এত ঘনঘন আসো কেন? আমার জন্যে মেয়েও দেখতে শুরু করেছে। এখন যদি জানতে পারে ওরা-‘ সলিল ছটফট করে একমুঠো ঘাস চেপে ধরল। ‘কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না। বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে কোথাও বাসা করে বিয়ে করব, না দূরে কোথাও পালিয়ে যাব, ভেবে পাচ্ছি না, আপনি কী বলেন? তারকদা আপনার যদি এমন হত?’
তারক হেসে উঠল। ‘ওঠো এবার।’
দু-জনের আর কথা হল না। পার্ক থেকে বেরিয়ে তারক দেখল জায়গাটা ফাঁকা। একটা লোকের কাছে সে জানতে চাইল শেষ পর্যন্ত কী হল। লোকটা জানাল, বাস ধরার জন্য সে এইমাত্র এসে পৌঁছেছে, কিছুই জানে না।
