‘সকালে চিউইংগাম কেনার সময় যদি বোমাটা মারত! আমি আর রমেনদা তো মুখোমুখি তখন।’ কীর্তি হঠাৎ তেঁতুল খেয়ে ফেলার মতো শিউরে উঠল, ‘উ উ উ উ ভাবা যায় না।’
ধমকে উঠে রেবা বলল,’এটা ঠাট্টা করার মতো ব্যাপার নয় কীতু। যা নিজের ঘরে জামাপ্যান্ট বদলা।’
তক্ষুনি কীর্তি সোয়েটার খুলে জামাটাও খুলল। ভিতরে গোল গলা সাদা গেঞ্জি। তারপর গায়ের স্নিকার খুলে প্যান্টটা খুলল,ভিতরে কালো শর্টস। এটা তার টেবল টেনিস খেলার পোশাক। এইসব খোলাখুলির সঙ্গে সঙ্গে সে কথা বলে যাচ্ছিল, ‘রোববারে দাদুর পুনর্জন্মটা সেলিব্রেট করতে হবে না, একটা দারুণ খাওয়ার ব্যবস্থা করো। আমি বাজার যাব।’
নগেন্দ্রর মনে পড়ে গেল কীর্তি ক্লাসের একটা মেয়েকে বাড়িতে খাওয়াতে চায় এবং সেই মেয়েটি সকালে ফোন করেছিল কীর্তি কলেজে বেরিয়ে যাবার একটু পরেই।
‘কীর্তি, তোর মা বলল, একটি মেয়েকে তুই বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে চেয়েছিস? বোধ হয় সেই মেয়েটিই সকালে তোকে ফোন করেছিল, নামটা কী বউমা?’
‘ক্ষণপ্রভা।’
‘নামটার মানে জানিস?’ নগেন্দ্র বললেন।
‘বিদ্যুৎ।’ ব্যস্তভাবে বলেই সে জানতে চাইল ‘ক্ষণা কি কিছু বলেছে? তিনদিন কলেজে আসেনি।’
ছেলের মুখ লক্ষ করে রেবা বলল, ‘তোকে ফোন করতে বলেছে।’
নগেন্দ্র বললেন, ‘তোর মা যদি রোববারে আমাদের খাওয়ায় তা হলে ওকেও বলে দিস।’
কীর্তি জুতো জামাপ্যান্ট আর স্যাচেল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘বলব।’
তিনতলার ছাদে যাবার সিঁড়ির মাঝামাঝি এগারো ধাপ উঠলে কীর্তির নিজস্ব ঘর। খাট টেবল চেয়ার আলনা, পাখা আর বই রাখার ছোট্ট একটা র্যাক। এই আসবাবগুলি ছাড়া ঘরে আর আছে রেডিয়ো-কাম-ক্যাসেট প্লেয়ার। ঘরে দুটি ছোটো জানলা।
কীর্তি ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর নগেন্দ্র বললেন, ‘রমেনের খবরটা নিলে ভালো হয়, বাঁচবে কি না কে জানে? কোন হাসপাতালে নিয়ে গেল তাও তো জানি না।’
‘জেনে আর এখন কী হবে, যে অবস্থায় নিয়ে গেল তাতে তো বাঁচার কথা নয়। আপনি কিন্তু দু-দিন বাড়ি থেকে বেরোবেন না। আপনার ছেলে বলল বাবাকে ওষুধ খেতে হবে আর ব্লাডসুগারটাও টেস্ট করাতে হবে।’
‘সুগার? আমি তো দিব্যিই আছি!’
‘মনে হয় দিব্যি আছেন, টেস্ট করলে দেখা যাবে দিব্যি নেই। কালকেই করিয়ে ফেলুন। উনি এক্ষুনি ফোন করে দিচ্ছেন কাল লোক এসে ব্লাড নিয়ে যাবে।’
রেবা নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখল অতীন বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে। ট্রানজিস্টারে পুরুষকণ্ঠে বাউল গান হচ্ছে নীচু স্বরে।
‘বাবার সুগার টেস্ট কালই করিয়ে দাও। তুমি বোস প্যাথোলজিতে এক্ষুনি ফোন করে বলে দাও কাল সকাল ন-টায় ব্লাড নিতে যেন লোক পাঠায়।’ রেবা খাটে বসল অতীনের গা ঘেঁষে। দরজার দিকে তাকিয়ে উঠে গিয়ে পর্দাটা ভালো করে টেনে দিয়ে ফিরে এসে আগের মতো বসল। ‘আজ দুপুরে বাবা অদ্ভুত একটা কথা বললেন।’
অতীন পাশ ফিরে ডান হাত রেবার ঊরুর উপর রেখে বলল, ‘কী কথা?’
‘এই কিডনির অসুখের কথা। ম্যাগাজিনে পড়ছিলেন। বললেন, কিডনি যখন আর কোনোমতে কাজ করে না তখন মরা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। আমি কেন ডায়ালিসিস করে বাঁচব। তাতে উনি যা হিসেব দিলেন খরচ হবে বছরে প্রায় দু লাখ টাকা। বললেন আমার ওই রোগ হলে বড়োজোর তিন বছর পর্যন্ত ডায়ালিসিস চালাতে পারব জমি বাড়ি বিক্রি করে ব্যাঙ্কের টাকা তুলে। এজন্য কারোর কাছ থেকে উনি টাকা চাইবেন না।’
রেবা কথা থামাল। নীরবতাটা যখন অর্থবহ হয়ে উঠল তখন বলল, ‘শুনে আমার খুব খারাপ লাগল। বললুম তা হলে কী করবেন? বললেন, তা হলে পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাব।’
‘সে কী!’ অতীন ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
‘বললুম আপনি কি সুইসাইড করবেন? তাইতে হেসে বললেন, আগে কিডনিটা অকর্মণ্য হোক তারপর তো ডায়ালিসিসের প্রশ্ন আসবে। কেমন যেন ভয় ভয় করল বাবার কথা শুনে। তুমি বাপু কালই ওঁর সুগার টেস্ট করাও। ব্লাড প্রেশার হাই, এরপর যদি সুগারও হাই ধরা পড়ে? কিডনি অকর্মণ্য হবার জন্য বসে থাকলে চলবে না। কারোর কাছ থেকে টাকা চাইবেন না মানে তোমার কাছ থেকে নেবেন না। এটা কি আত্মসম্মানবোধ? কোনো মানে হয় এইরকম কথা বলার! বাবার জন্য ছেলে বছরে দু-লাখ টাকা কি খরচ করতে পারে না, বললুম ওঁকে সে কথা, তাইতে বললেন অতীন অনেক কষ্ট আর পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করে সেজন্যই কষ্টের টাকা উনি নেবেন না।’
‘অদ্ভুত কথা তো!’ অতীন আহত চোখে বউয়ের দিকে তাকাল। ‘কারোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাঁচতে চান না, ছেলের টাকাও নেবেন না। পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে চান! দ্যাখো রেবা, ওর মুখ দেখে আমার মনে হল যেন কিডনির গোলযোগ শুরু হতে পারে, কেন মনে হল জানি না তবে হাই প্রেশারটা খুবই মারাত্মক কিডনির পক্ষে। তখন বাবাকে বললুম বটে ডায়াস্টোলিক একশোর কাছাকাছি, আসলে ছিল একশো পনেরো, থাকা উচিত আশি। সিস্টোলিক দেখলুম একশো ষাট, থাকা উচিত একশো কুড়ি।’
অতীন বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগোল, পর্দা সরিয়ে বসার ঘরে তাকিয়ে পর্দা নামিয়ে ফিরে এল।
‘কী হল?’ রেবা বলল।
‘কীতু ফোন করছে। সকাল ন-টায় তা হলে আসতে বলব, বাবাকে বারো ঘণ্টা কিছু না খেয়ে থাকতে হবে, রাত ন-টায় যেন খেয়ে নেয়। তারপর পি.পি.-টার জন্যও ব্লাড দেবে ভাত খাওয়ার দু-ঘণ্টা পর।’ অতীন আবার পর্দা সরিয়ে দেখে বিরক্ত স্বরে বলল, ‘কাকে এতক্ষণ ধরে ফোন করছে বলো তো?’
