মিনিট পনেরোর মধ্যেই অতীন বাড়িতে এসে গেল। এসেই বাবার ঘরে ঢুকল, হাতে একটা অ্যাটাচি কেস। সেটা বিছানায় রেখে স্থির চোখে দশ-বারো সেকেন্ড নগেন্দ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘শরীর কেমন লাগছে?’
নগেন্দ্র মনে মনে বললেন, বিধান রায় হতে চাস তো তুই-ই বলে দে কেমন আছি, অতক্ষণ তো মুখটা দেখলি। অতীন অ্যাটাচি থেকে ব্লাডপ্রেশার মাপার যন্ত্রটা বার করে বলল, ‘শুয়ে পড়ো।’
পাঞ্জাবির ডান হাতটা গুটোতে গুটোতে নগেন্দ্র তাকালেন অ্যাটাচি কেসটার দিকে। একবার অতীনকে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁরে তুই আপিস যাচ্ছিস না রুগি দেখতে যাচ্ছিস? আমাদের ছোটোবেলায় ডাক্তার চিনতুম হাতের ব্যাগ দেখে।’ শুনে অতীন হেসেছিল, জবাব দেয়নি।
যন্ত্রের দিকে ভ্রূকুটি করে অতীন প্রেশার মাপছে আর নগেন্দ্র তখন ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিলেন সে কতটা উদবিগ্ন বাবার সুস্থতা সম্পর্কে। অতীনের চোখের ভাব দেখে বুঝলেন গুরুতর নয়। প্রফুল্ল কণ্ঠে জানতে চাইলেন, ‘নীচেরটা কত?’
‘বেশি। একশোর কাছাকাছি।’ যন্ত্রটা গুছিয়ে রাখতে রাখতে অতীন বলল।
পাশে দাঁড়ানো রেবা বলল, ‘নর্ম্যালের অনেক উপরে!’
নগেন্দ্র আবার জানতে চাইলেন, ‘ওপরেরটা?’
‘ওটাও বেশি। এখন শুয়ে থাকো। কাল সকালে আবার দেখব।’
অ্যাটাচি কেসটা তুলে নিয়ে অতীন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সঙ্গে রেবা। এখন অতীন যা কিছু ঘটেছে খুঁটে খুঁটে সবিস্তারে শুনবে বউয়ের কাছ থেকে। আজ ওর অর্ধেক রোজগার নষ্ট হল। কীর্তিটা এখনও কিছুই জানে না। কলেজ থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যায় প্রাইভেট টিউটরের বাড়ি। কেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া এক প্রাক্তন অধ্যাপকের কাছে ও পড়ে এবং ওর মতো আরও আটজন, সপ্তাহে দু-দিন। পড়ার পর কীর্তি নিউ আলিপুরে একটা ক্লাবে যায় টেবল টেনিস খেলতে। এই বছরই তিনটে টুর্নামেন্টের দুটোয় সে সেমিফাইনালে উঠে হেরেছে বাংলার তিন ও চার নম্বরের কাছে। নগেন্দ্রর ধারণা প্রতিভা বিচারে পড়াশুনো আর টেবিল টেনিস দুটোতেই তার নাতি সমান সমান।
একটু পরেই কীর্তি বাড়ি ফিরল। পিঠে একটা কালো বস্তার মতো স্যাচেল। তাতে বইখাতাপত্তর, টেবল টেনিস ব্যাট, জলের বোতল আর খাবারের বাক্স। দরজা থেকে ভিতরে পা দিয়েই চেঁচিয়ে উঠল, ‘দাদু নাকি মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছে, টেরিফিক! কোথায় দাদু?’
বলতে বলতে ঘরে ঢুকল কীর্তি। পৌনে ছ-ফুট লম্বা, চওড়া কপালের উপর নেমে এসেছে ঝুরো চুল। আয়ত চোখ, কোমরের থেকে কাঁধ চওড়া, গায়ের রং তো বটেই মুখের আদলটিও মায়ের মতো, গায়ে ফুলহাতা নীল সোয়েটার। কীর্তির উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে নগেন্দ্রর মনে হল, আমি তো বলতে পারতুম, বউমা অটোয় যে মুখটা দেখেছিলুম তার আদল অনেকটা তোমার মতো।
‘রাস্তায় কান্তু বলল, তোর দাদু আজ মরে যেত, সত্যি? দেখলুম রমেনদার দোকানের ভেতরটা চুরমার, বোমাটা খুব পাওয়ারফুল ছিল। আজই চিউইংগাম কিনলুম কলেজ যাওয়ার সময়, আমার দরকার ছিল বাস ভাড়ার জন্য খুচরোর তাই দশ টাকার নোট দিলুম। চারটে টাকা ফেরত দিয়ে রমেনদা বলল, বাকিটা পরে নিয়ো।’ পিঠ থেকে স্যাচেলটা নামিয়ে সে টেবলের উপর রেখে বলল, ‘আর নেওয়া, কোনোদিনই বাকিটা আর পাব না।’
নগেন্দ্রর এতক্ষণে মনে পড়ল বিস্কুটের জন্য বারোটা টাকা রমেনকে দেওয়া হয়নি। ‘জানিস কীর্তি বারোটা বিস্কুট কিনেছি রমেনের কাছ থেকে, দাম দোবো বলে পকেটে হাত ঢুকিয়েছি টাকা বার করছি আর ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দটা হল। টাকাটা আর রমেনকে দেওয়া হল না। আর কোনোদিনই দেওয়া হবে না। একে তুই কী বলবি?’
আঠারো বছরের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র কীর্তিনারায়ণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলব মানে? সিম্পল ব্যাপার, শোধবোধ হয়ে গেল! দু-টাকার চিউংগাম কিনেছি আমি ফেরত পেতুম আট টাকা দিয়েছে চার টাকা তার মানে এখনও আমি পাব চার টাকা আর তোমার কাছ থেকে রমেনদা পাবে বারো টাকা। ওহ দাদু, এখনও রমেনদার কাছে আট টাকা ধার রয়ে গেল আমাদের।’
নগেন্দ্র লক্ষ করলেন তার টিনএজার নাতির মুখে দেনার দায়টা লজ্জার ছাপ এঁকে দিয়েছে। এই ছাপটা তার বা তার ছেলের বউয়ের মুখে পড়বে কি? তিনি নিশ্চিত নন। আটটা টাকা কেনো ব্যাপারই নয় কিন্তু দেনাটা?
নগেন্দ্র বললেন, ‘দাদু ভাগ্য মানিস?’
ইতস্তত করে কীর্তি বলল, ‘একটু একটু।’
‘আমি কিন্তু মানি। জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে যা তোর ধারণা বা বিশ্বাসকে টলিয়ে দিয়ে যাবে। এইসব ঘটনার ওপর তোর কোনো হাত নেই, কন্ট্রোল নেই। তোর ঠাকুমার মৃত্যু, আমার ভাইয়ের মৃত্যু, গোশালায় আগুন লাগা পরপর এইসব ঘটনা আমাকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আজকের এই ব্যাপারটাকে যদি ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া মনে করি তা হলে তো ভাগ্যকেই আমি আঁকড়ে ধরব, ঠিক ভেবেছি?’
‘অফকোর্স! তোমার তো মরে যাওয়ারই কথা অথচ স্টিল বেঁচে আছ! আই অ্যাম রিয়্যালি ফরচুনেট।’
নগেন্দ্র অবাক হয়ে বললেন, ‘ফরচুনেট বললি কেন?’
ঘরে ঢুকল রেবা। শেষের কথাটা সে শুনেছে,বলল, ‘ফরচুনেটই তো, বাবা আপনার তো বেঁচে যাওয়ার কথাই নয়।’
কীর্তি মায়ের ভুল ধরাতে বলল, ‘দাদু ফরচুনেট বলিনি, বললুম আমি ফরচুনেট।’
‘কেন তুই ফরচুনেট!’ রেবা ধাঁধায় পড়ে যাওয়ার মতো করে তাকাল।
