রমেন হাসতে হাসতে বলেছিল। ‘সিগারেট খেলেও তো ক্যানসার হয়, আজ সকাল থেকে এগারো প্যাকেট বেচেছি। আমাকেও তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে। মেসোমশাই, মরুক মরুক, দেশে এত লোক বেড়ে গেছে যে হাঁপ ধরে যায়, দম ফেলতে কষ্ট হয়, এবার লোক একটু কমুক।’
‘লোক কমলে তো তোমারও রোজগার কমবে। এখন দিনে যা হাতে থাকে সেটা কত?’
রমেন ইতস্তত না করেই বলেছিল, ‘সব মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক টাকা তো আমার থাকে।’
‘বিয়ে করেছ?’
‘নাঃ।’
‘করে ফ্যালো।’
‘মেসোমশাই, এত কম টাকায় দুটো লোকের চলে না, দুটো থেকে তো তিনটে-চারটে হবে, খাওয়াব কী? একটু ভদ্রভাবে বাঁচতে হলে এই রোজগারে বিয়ে করা চলবে না।’
একদিন নগেন্দ্র দেখলেন রমেনকে একটা বোতল থেকে জল খেতে। বোতলের গায়ে সাঁটা লেবেলটা দেখে বললেন, ‘রমেন এটা তো মদের বোতল, তুমি খাও নাকি?’
‘বিশ্বাস করুন মেসোমশাই আমি খাই না। বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসে, এখানে বসে খায়। আমি সোডা আর গেলাস দিই। আমার কোনো কিছুর নেশা নেই, মাঝেমধ্যে এক-আধটা পান খাই, ব্যস।’
অল্প গরম দুধ নগেন্দ্র এক চুমুকে শেষ করলেন আর তখনই দরজায় বেজে উঠল সুরেলা হারমোনিকা। শ্বশুরের মুখের দিকে তাকিয়ে রেবা দরজা খুলতে গেল। নগেন্দ্র আলতোভাবে খাটে গড়িয়ে আলোয়ানটা গায়ে বিছিয়ে নিলেন। বাইরে কথা বলার শব্দ হচ্ছে। ঘরে এল রেবা, তার পিছনে উর্দি পরা পুলিশ অফিসারটি, তাকে দেখে নগেন্দ্রর মনে হল অল্পদিনই থানায় এসেছে। মনে হওয়ার কারণ, ছেলেটির ভুঁড়ি নেই। সঙ্গে রয়েছে পোড়খাওয়া মুখের সাধারণ পোশাকের একজন পুলিশ।
‘বাবা ইনি আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান। আমি বলেছি আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, প্রেশার বেড়ে গেছে।’
‘বাড়াটা স্বাভাবিক।’ তরুণ অফিসার সহৃদয় নম্র গলায় বলল, ‘দু-মিনিট আপনাকে বিরক্ত করব। ঘটনার সময় আপনিই একমাত্র স্পটে ছিলেন। ঠিক কী কী ঘটল সেটা বলুন। দোকানে কখন আসেন?’
‘বোমাটা ফাটার মিনিট পাঁচ-ছয় আগে। একটা বিস্কুট খেলুম। রমেন আর একটা দিল সেটা খাচ্ছি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, তখন রমেন বলল জল খাবেন? বললুম দাও। ও দোকানের ভেতর ঢুকল জল আনতে। ঠিক তখনই একটা অটোরিকশা এল।’
‘কোনদিক থেকে এল?’
‘পূর্ণ সরকার রোডের দিক থেকে। ওরকম কতই তো অটো যায় আসে, আমি আর তাকাইনি। রমেন জল আনতে ভেতরে গেছে, ওই দিকেই তাকিয়ে রয়েছি, আর তখনই আমার কানের পাশ দিয়ে কী যেন একটা উড়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল, তারপরই প্রচণ্ড শব্দ।’
‘অটোয় ক-জন ছিল বলে মনে হয় আপনার?’
‘বলতে পারব না।’
‘কারোর মুখ কি দেখতে পেয়েছেন?’
নগেন্দ্রর চোখ রেবার মুখের দিকে সরে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে নিথর হয়ে আছে মুখ, শুধু ওঠানামা করল গলার নলিটা।
‘দেখা সম্ভব ছিল না, আমি তাকিয়ে ছিলুম দোকানের দিকে, অটোটা ছিল আমার পিছনে।’
‘অটোটা তারপর ফুলস্পিডে পালাল, কেমন?’
‘হ্যাঁ’, হীরকনগরের দিকে।’
‘আর কিছু দেখেছেন কি অটো আসার আগে? কোনো অপরিচিত লোকজনকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন দোকানের সামনে?’
‘না, কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখিনি।’
সাধারণ পোশাকের পুলিশটি জিজ্ঞাসা করল, ‘অটোর নাম্বারটা দেখেছেন কি, মানে প্রথম দিকের অন্তত গোটা দুয়েক নাম্বার চোখে পড়ে মনে থেকে যেতে পারে তো।’
‘তখন কিছু দেখার মতো অবস্থা আমার ছিল না।’ নগেন্দ্রর স্বরে ক্লান্তি ফুটে উঠল। ‘আচ্ছা তখন একটা লোক ভেতরে বসে খাচ্ছিল, সে কি বেঁচে আছে?’
‘স্পট ডেড। রমেনও দেখে মনে হল বাঁচবে কি না বলতে পারছি না।’
পুলিশ দু-জন চলে যেতেই নগেন্দ্র পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। রেবা চোখের পাতা নামিয়ে আবার তুলল, উজ্জ্বল চোখের মণি।
‘কী বুঝলে? প্রশ্নের ধরন দেখে মনে তো হল না ওরা খুব গুরুত্ব দিচ্ছে ঘটনাটায়, হামেশাই তো এসব ঘটছে।’
‘ভয় করছিল, এই বুঝি বলে বসেন কীতুর সঙ্গে মিল আছে মুখের আদলের।’
‘বললে কী হত? ওরা কি বিশ্বাস করত অটোয় কীর্তি ছিল?’
‘পুলিশকে বিশ্বাস নেই। ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে তো আগে পুরে দিত, তারপর তদন্তটদন্ত, মারধোর করে সাতঘাটের জল খাইয়ে ছাড়ত।’
‘তুমি কী করে ভাবলে আমার বুদ্ধিটা মোটা, নিজের নাতিকে বিপদে ফেলে দিতে পারি!’
রেবা বলল, ‘বুদ্ধি মোটার কথা উঠছে কেন, দরকারের থেকে বেশি কথা তো আপনি বলেনই।’
নগেন্দ্র গম্ভীর হয়ে গেলেন। এর আগেও তিনি রেবাকে বলতে শুনেছেন, বুড়ো হলে মানুষ একটু বেশি বকে। ইদানীং তার মনে হয় সংসারের এক নম্বর জায়গাটা থেকে রেবা একটু-একটু করে তাকে হটিয়ে দিচ্ছে। অনেক কিছুই রেবা এখন আর তাকে জানায় না যেমন, সামনের বাড়ির কল্যাণীর সঙ্গে আলাপ হওয়া, তার কাছ থেকে অরুণ নস্কর সম্পর্কে যেসব কথা শুনেছে প্রথমে তা জানায়নি, পরে কথায় কথায় একদিন বলে ফেলে। নগেন্দ্র তখন বলেন, ‘এগুলো আমাকে তুমি আগে জানাওনি?’ রেবা বলেছিল, ‘আগে জেনে আপনার কী লাভ হত?’ ওর গলার স্বরে হালকা তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষা মিশে এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে যাতে নগেন্দ্রর নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হয়, পরে ভেবে দেখেন রেবা ঠিকই তো বলেছে, জেনে আমি কী করতুম? একটা লোক কাঁধে গুলি খেয়ে যদি পুলিশকে তা না জানায় সেটা তার ব্যাপার, আমার তাই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?
