‘ভেতরে তখন একটা লোক খাচ্ছিল। তার কী হল কে জানে। পুলিশ দেখলে?’
‘না। এরমধ্যেই কী আসবে! আর এখন এসে করবেই বা কী? একে তাকে বাঁধা গতে জিজ্ঞাসা করবে, কেউ তো দেখেইনি এক আপনি ছাড়া।’
‘আমাকে জিজ্ঞাসা করবে!’ নগেন্দ্র অবাক হয়ে রেবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী জিজ্ঞাসা করবে?’
নিরুৎসুক স্বরে রেবা বলল, ‘কী আবার করবে, তখন আপনি কোথায় ছিলেন, রমেন কী করছিল, বোমা যে ছুড়ল তাকে দেখেছেন কি না-।’
‘হ্যাঁ একটুখানি অবশ্য মুখটা দেখেছি।’
‘অ্যাঁ দেখেছেন! চেনেন তাকে?’ রেবার স্বর সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।
‘চিনব কী করে, আগে তো কখনো দেখিইনি।’
‘আবার দেখলে কি চিনতে পারবেন?’ একটু ঝুঁকে রেবা বলল।
‘বোধ হয় পারব, মুখটায় অনেকটা কীর্তির আদল আছে।’
রেবার মুখ দপ করে অপ্রতিভ হয়েই গম্ভীর হয়ে গেল। ‘এসব কথা পুলিশকে কখনো বলতে যাবেন না। বলবেন, কে ছুড়ল জানি না, তাকে চোখেও দেখিনি। চিনতে পারব বললেই আপনাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করবে পুলিশ আর গুন্ডারাও তখন আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না।’
নগেন্দ্র লক্ষ করলেন নীচু গলায় বলতে বলতে রেবার স্বর ধমকের মতো কর্কশ হয়ে উঠল। বুঝতে পারলেন কীর্তি শব্দটা তার উচ্চচারণ করা উচিত হয়নি। কিন্তু মুখটা ছিল অল্পবয়সি ছেলের আর সব অল্পবয়সিদের মুখেই কীরকম একটা যেন বেপরোয়া ভাবের ছাপ থাকে, কীর্তিরও আছে তাই ওর নামটাই মুখ থেকে বেরিয়ে এল। লজ্জিত হয়ে পড়লেন নগেন্দ্র, অন্য কারোর নাম মুখে এল না কেন?
‘অনেকটা আদল আছে বললে কী আর সত্যিসত্যিই মুখটা হুবহু হয়ে যায়? দেখেছি তো মোটে তিন কী চার সেকেন্ড।’ নগেন্দ্র আশ্বস্ত করার চেষ্টায় রেবাকে বললেন। রেবার মুখের অন্ধকার তাইতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল না।
কাচের গ্লাসে গরম দুধ নিয়ে এল শোভা। উঠে বসে হাত বাড়ালেন নগেন্দ্র, দেখলেন তার আঙুলগুলো কাঁপছে। ‘বড্ড গরম, জলের বাটিতে বসিয়ে ঠান্ডা করে আন। বউমা প্রেশারটা বোধ হয় বেড়েছে।’
গ্লাস এগিয়ে দিতেই রেবা সেটা নগেন্দ্রর হাত থেকে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বলল, ‘ওকে একটা ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলি।’
‘শোভা বারান্দায় গিয়ে দ্যাখ তো পুলিশ-টুলিশ এল কিনা।’
শোভা বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ পর ঘরে ফিরে এসে বলল, ‘মেলা লোক মেসোমশাই, পুলিশের জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে। দারোগা মতন একটা লোক কথা বলছে সামনের বাড়ির চারতলার নস্করবাবুর সঙ্গে। এখনও কী গন্ধ রয়েছে। সারা পাড়া ঝেঁটিয়ে লোক জড়ো হয়েছে। আচ্ছা মেসোমশাই বোমাটা মারল কেন বলুন তো?’
‘তা আমি কী করে বলব! নিশ্চয় কোনো কারণ আছে, শুধু শুধু কী আর এমন কাজ করে কেউ? দ্যাখ দুধটা ঠান্ডা হল কি না।’
শোভা বেরিয়ে যেতেই নগেন্দ্র বারান্দার দরজার কাছে এসে বাইরে উঁকি দিয়ে তাকালেন। একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল। স্ট্রেচার নিয়ে দুটো লোক দোকানের ভিতর ঢুকল। উর্দি পরা কোমরে পিস্তল এক ছোকরা অফিসার দোকানের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল অরুণ নস্করকে সঙ্গে নিয়ে। রাইফেল হাতে দু-জন পুলিশ জিপের পিছনে বসে, ওদের কিছু করার নেই। স্ট্রেচারে একটা নিথর মানুষকে বহন করে এনে তাকে অ্যাম্বুলেন্সের গাড়িতে তুলে দিল। নগেন্দ্রর মুখচেনা পাড়ার একটি কিশোর অফিসারকে কিছু একটা বলল, অফিসার মুখ তুলে বারান্দার দিকে তাকাল।
‘বাবা আপনাকে এখন শুয়ে থাকতে বলল আপনার ছেলে।’ হাতে দুধের গ্লাস নিয়ে রেবা তখনই ঘরে ঢুকে বলল।
‘বউমা পুলিশ বোধ হয় জিজ্ঞেস করতে আসছে।’ গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললেন নগেন্দ্র।
শীতকালের বিকেল তাড়াতাড়ি শেষ হয়। বাইরে আবছা একটা ভাব জানিয়ে দিচ্ছে সন্ধ্যা এবার নামতে আসছে। রমেনের দোকানের সামনে কঅন্তত জনা ত্রিশেক নানা বয়সি লোকের ভিড়, তার মধ্যে কিছু স্ত্রীলোক। পথচলতি লোকেরা কৌতূহলে দাঁড়িয়ে গিয়ে ব্যাপার কী জানার চেষ্টা করছে। প্রত্যেকেরই মুখে বিস্ময়: ‘রমেনকে বোমা মারল কেন! এতদিন দোকান চালাচ্ছে, কারোর সঙ্গে সামান্য একটা কথা কাটাকাটি হয়েছে বলেও কেউ জানে না। পয়সা কম পড়ে গেলে বলত, ঠিক আছে পরে দিয়ে যাবেন। আর এমন লোককে কি না-!’
দগ্ধ রমেনকে যাঁরা দেখেছে তাঁদেরই ঘিরে আগ্রহটা বেশি। বিশেষ করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যে বর্ণনা দিচ্ছে তার কাছেই শ্রোতার সংখ্যা বেশি। কীভাবে চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, মুখের মাংস গলে হাড় বেরিয়ে পড়েছে, হাতের দুটো কবজি থেকে তালু নিশ্চিহ্ন, মাথার চুল পুড়ে গিয়ে খামচা খামচা টাক, পিঠে দগদগে ফোস্কা ইত্যাদির ছবি শ্রোতাদের স্মৃতিপটে নানান রংয়ের শব্দে আঁকা হয়ে গেল। এতসবের পরেও একটা প্রশ্নের উত্তর তারা পেল না-এমন নির্বিরোধী লোককে মারার জন্য কারা এবং কেন বোমা ছুড়ল?’
উত্তরটা কল্যাণী মারফত রেবা এবং তার কাছ থেকে নগেন্দ্র কিছুদিন আগে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। এরপর রমেন সম্পর্কে তিনি কৌতূহলবোধ করতে থাকেন। রোজই বেড়াতে যাবার আগে কিছু একটা কেনার ছলে রমেনের সঙ্গে গল্প ফাঁদার চেষ্টা করেছেন।
পরশুদিনই তিনি বলেছিলেন, ‘রমেন পানপরাগ খুব খারাপ জিনিস, খেলে মুখের ক্যানসার হয়, বিক্রি করো কেন?’
‘লোকে খেতে চায় তাই বেচি। তারা যদি ক্যানসার চায় আমি কী করব!’
