রমেন গলা লম্বা করে তুলে তীক্ষ্ন চোখে বাইকটার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে অস্ফুটে বলল, ‘নতুন দেখছি!’
‘রমেন ঠিকই বলেছ, টাটকা।’ আঙুল থেকে সুজির গুঁড়ো ঝাড়তে ঝাড়তে নগেন্দ্র বললেন।
‘আর একটা দি?’
‘দাও। আর ঠোঙায় গোটা দশেক দাও বাড়িতে খাওয়াব, ছোটোবেলায় রোজ খেতুম, বাড়ির সামনেই একটা দোকান ছিল, সন্তাোষ বিস্কুট কোম্পানির সাইকেল ভ্যান এসে দিয়ে যেত। তবে তখনকার বিস্কুটের দু-ধারে পলকাটা নকশা থাকত।’
রমেনের হাত থেকে দ্বিতীয় বিস্কুটটা নিয়ে তিনি মুখ ফিরিয়ে দোতলার বারান্দাটা দেখে নিলেন। বউমা বা শোভা কাউকে দেখতে পেলেন না। রাস্তার ধারে পাতা বেঞ্চটায় বসলেন। রমেন বিস্কুটের ঠোঙা নিয়ে এল।
‘কত হল, বারো টাকা?’
‘হ্যাঁ, জল খাবেন?’
পূর্ণ সরকার রোডের দিক থেকে একটা অটো রিকশা আসছে। রাজা গার্ডেনের এই দিকটায় বাইরের যানবাহন বেশি আসে না, যখন আসে স্থানীয় লোক কৌতূহলে একবার তাকায়। নগেন্দ্র বিস্কুটের ঠোঙাটা পাঞ্জাবির পকেটে ভরতে ভরতে তাকালেন অটোর দিকে। রমেনও তাকিয়ে দেখে দোকানের মধ্যে ঢুকে গেল। খাবার জলের ড্রাম থেকে রমেন মগে জল তুলতেই যে লোকটি টেবলে বসে ঘুগনি খাচ্ছিল বলে উঠল, ‘আমাকেও একগ্লাস দেবেন।’
অটোরিকশাটা দোকানের সামনে গতি মন্থর করল। নগেন্দ্র তখন অন্য পকেটে হাত ঢুকিয়ে টাকা বার করছেন। তখন অটো থেকে একটা মুখ ঝুঁকে বেরোতেই নগেন্দ্র-র সঙ্গে চোখাচোখি হল। এরপরই তার কানের দু-হাত দূর দিয়ে নারকেলের মাপের গোলাকার একটা বস্তু দোকানের মধ্যে উড়ে গেল। একটা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ হল কমলা রঙের ঝলক দিয়ে। ঝাঁকুনি দিয়ে গতি বাড়িয়ে অটোরিকশাটি হীরকনগরের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে চলে গেল। দোকানের ভিতরটা ধোঁয়ায় অন্ধকার, গন্ধকের কটু গন্ধে ভরপুর চারদিক। দোকানের মধ্য থেকে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এল রমেন দু-হাত বাড়িয়ে। তার হাওয়াই শার্ট পুড়ে গেছে, কালো ছোপ ধরা তার একটা টুকরো কাঁধ থেকে ঝুলছে, দুই হাঁটু থেকে প্যান্টের নীচের অংশ নেই। মাথা নাক আর মুখ থেকে রক্ত ঝরে পড়েছে। হাতে পায়ে ঝলসানোর চিহ্ন। সারা মুখে কালি মাখা। দোকানের বাইরে ছুটে এসেই লুটিয়ে পড়ল নগেন্দ্রর পায়ের কাছে। মুখ তুলে ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, ‘মেসোমশাই।’ এরপরই কপালটা মাটিতে ঠুকে পড়ে যায়।
নগেন্দ্র পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে। চেতনা বলে তার এখন কিছু নেই। কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, শুনতেও না। থরথরিয়ে কাঁপছে দুটো পা। বুকের মধ্য থেকে ক্ষীণ একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু আটকে যাচ্ছে গলার কাছে। মাথা নামিয়ে তাকিয়ে রইলেন। একটা মানুষ শুয়ে আছে দেখে চেনার চেষ্টা করে অবশেষে চিনতে পেরে ধীরে ধীরে বেঞ্চে বসে পড়লেন।
বিস্ফোরণের পনেরো সেকেন্ড পর আশেপাশের বারান্দা ও জানলায় লোক জমতে শুরু করে। রাস্তায় যারা ছিল তারা প্রথমে ভয়ে ছুটে পালাতে যায়। যখন দেখল এক বৃদ্ধ একা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তখন কৌতূহল চাপতে না পেরে এগিয়ে এল, ততক্ষণে অটো রিকশাটা অদৃশ্য হয়ে গেছে।
রেবা আর শোভা বারান্দা থেকে দোকানের দিকে তাকিয়ে আলোয়ান গায়ে জড়ানো নগেন্দ্র এবং তার সামনে উপুড় হয়ে থাকা রমেনকে দেখেই দু-জনে চিৎকার করে উঠে একসঙ্গেই সিঁড়ির দিকে ছুটল। গেট থেকে দু-জনে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে দু-পাশ থেকে নগেন্দ্রকে ধরে বেঞ্চ থেকে তুলল।
‘বাবা লাগেনি তো?’ রেবার দৃষ্টি শ্বশুরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ওঠানামা করল। আশ্বস্ত হয়ে বলল, ‘আর এখানে নয় বাড়ি চলুন। শোভা ওই হাতটা ধরো বাবা কাঁপছেন।’
তারা দুই বাহু ধরে তাকে ধীরে ধীরে দোতলায় তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে প্রথমেই বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে বাইরের ঘটনা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিল। শীতকাল কিন্তু নগেন্দ্র ঘামছেন।
‘বাবা পাখা চালাব?’
‘হুঁ’। নগেন্দ্র চোখ বুজে বললেন।
পাখা চালিয়ে দিয়ে শোভা বলল, ‘মেসোমশাইকে দুধ গরম করে দোব বউদি?’
নগেন্দ্র পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠোঙাটা বার করলেন। সেটা রেবার হাতে দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সবার জন্য কিনেছিলুম, কীর্তি বলেছিল সে কখনো খায়নি।’
ঠোঙার মুখ খুলে ভিতরটা দেখে রেবা বলল, ‘অনেকগুলো ভেঙে গেছে। গরম দুধ খেলে শরীরে জোর পাবেন, খাবেন?’
‘বলছ? দাও। খুব বাঁচান বেঁচে গেলুম। আলোটা জ্বালো ঘরটা অন্ধকার লাগছে।’
শোভা আলো জ্বেলে বেরিয়ে গেল দুধ গরম করে আনতে। রেবা লক্ষ করল নগেন্দ্রর হাতের আঙুল এখনও কাঁপছে। আলোয়ানটা গা থেকে সরিয়ে দিয়ে সে শ্বশুরের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
‘বাইরে নিশ্চয় খুব হইহই হচ্ছে।’
‘হবেই তো। বাইশ বছর হল এখানে আছি এমন ব্যাপার আগে কখনো দেখিনি। বোমাটা যদি আপনার গায়ে লাগত!’
‘তাই ভাবছি, ছেলেটা বেশ এক্সপার্ট, হাতের টিপটাও ভালো।’ নগেন্দ্রর গলায় প্রাণরক্ষা পাওয়ার জন্য ছেলেটির প্রতি কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল। ‘যদি হাতটা কেঁপে একটু এধার-ওধার হয়ে যেত, ভাবো তো! ঠিক টিপ করে আমার কানের পাশ দিয়ে ছুড়ে দিল, টার্গেট ছিল রমেন। ভালো কথা রমেনটা বেঁচে আছে কি না একটু দেখো তো। যেভাবে বেরিয়ে এল, দেখে তো ভয় লেগে গেছল।’
রেবা বারান্দায় গিয়ে দেখে এসে বলল, ‘রমেনকে তো দেখতে পেলুম না, বোধ হয় হাসপাতালে নিয়ে গেছে। খুব ভিড় জমেছে।’
