রেবা রহস্যে ঘিরে ফেলল ঠোঁট দুটো, দশ সেকেন্ড পর নিজেই ‘কেন’র জবাব দিল, ‘খুন হওয়ার ভয়ে। অরুণের পার্টনার ছিল শামিম নামে আর একজন স্মাগলার। তাকে খুন করিয়ে ও একাই কারবারটা দখল করে। শামিমের লোকেরা কী ওকে ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? চার মাস আগে বউবাজারে ওকে খুনের অ্যাটেম্পট করেছিল। ফুটপাথের ধারে গাড়িতে বসেছিল তখন দুটো ছেলে হঠাৎ এসে জানালা দিয়ে তিনটে গুলি চালায়, দুটো লাগে গাড়ির সিটে আর একটা কাঁধে, খুব বেঁচে যায়। লোকটা এখন বাড়ি থেকে বেরোয়ই না।’
নগেন্দ্রর মনে হল রোজ খবরের কাগজে যা তিনি পড়েন রেবা যেন তাই পড়ে যাচ্ছে। ‘এত কাণ্ড হয়ে গেল সামনের বাড়ির লোকের অথচ কিছুই আমি জানি না!’
‘জানবেন কী করে। ওরা তো পুলিশকে জানায়নি, খবরের কাগজেও বেরোয়নি। ড্রাইভার সোজা নিয়ে যায় ওদের চেনা নার্সিংহোমে, সেটার অর্ধেক মালিক ওই অরুণ নস্কর। অপারেশন করিয়েই বাড়ি চলে আসে। কাকপক্ষীতেও জানে না এতবড়ো একটা ব্যাপার ঘটে গেল।’
‘আর জানল শুধু তোমার ওই কল্যাণী!’ নগেন্দ্রর গলায় ছিল পরিহাসের সুর।
‘আমিও প্রথমে এইরকমই ভেবেছিলুম, যা এমন করে গোপনে রাখা হল তা ও জানল কী করে? কল্যাণীকে সেটা বললুমও, তখন ও বলল পার্ক সার্কাসে নার্সিংহোমটার বাকি অর্ধেকের মালিক ওর স্বামী। বুঝলুম, এ লোকটাও সুবিধের নয়, নস্করের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্যাবসা করে তার মানে দু-নম্বরী। এক রাত্তিরে ঘরে মদ খেতে খেতে বউয়ের কাছে গলগল করে সব বলে ফেলে।’
নগেন্দ্র এই সময় বলে ওঠেন, ‘অতীন ঘরে বসে ওসব খায়টায় না তো?’
রেবা ভ্রূ কুঁচকে কঠিন চোখে তাকায় শ্বশুরের দিকে। ঠোঁট মুচড়ে বলে, ‘আমি বেঁচে থাকতে।’
আশ্বস্ত হয়ে নগেন্দ্র বললেন, ‘সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, রিল্যাক্স করার জন্য খেতে তো পারেই। কল্যাণী মেয়েটি কেমন?’
‘খুব সাদাসিধে সরল, বি এসসি পাশ। ছেলেপুলে নেই, কথা বলার লোক নেই। ওপরের এরাও কারোর সঙ্গে মেশে না। মেয়েটা বোরড হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে আলাপ হল পূর্ণ সরকার রোডে ব্লাউজ পিস কেনার সময়। যেচে আলাপ করল, বলল রোজ বারান্দা থেকে আমাদের দেখে।’
বারান্দা থেকে নগেন্দ্রও দেখেন তবে তিনতলা নয়, চারতলা। বাড়ির নাম ‘অরুণোদয়’। প্রতি তলায় দুটি করে তিনতলা পর্যন্ত ছ-টি ফ্ল্যাট। চারতলার পুরোটাই নস্করদের। দু-হাতে গ্রিল আঁকড়ে বিরাশি বছরের দেবেন নস্কর মাঝে মাঝে বিকেলে দাঁড়িয়ে থাকে বারান্দায়। হাঁপানি আর বাত ওর চলৎশক্তির ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। নগেন্দ্র ওকে দেখলেই মনে মনে বলেন, ঠিক হয়েছে, দীর্ঘজীবী হোক। যতই বাঁচবে বদমাইশটা ততই এই যন্ত্রণা ভোগ করবে।
দেবেন তাকে দেখে হাত নেড়ে প্রথম দিন চেঁচিয়ে কী যেন বলেছিল, বোধ হয়, ‘কেমন আছেন?’ নগেন্দ্র মুখ ফিরিয়ে রাস্তায় দুটো কুকুরের ঝগড়া করা দেখায় মন দেন। দেবেনের উপর রাগ আর ঘৃণাটা শরীর থেকে আজও তিনি বার করে দিতে পারেননি। দেবেন তার দিকে আর কখনো হাত নাড়েনি।
‘কল্যাণী কি আমাদের বাড়ি কখনো এসেছে?’
‘অনেকবার। দেখবেন কী করে! বিকেলে তো আপনি তখন বেড়াতে বেরিয়েছেন আর ওর স্বামীও তখন বেরোয় নার্সিং হোমে। ওর স্বামী পছন্দ করে না বউ বাইরে বেরোক।’
‘কেন, বউ বুঝি খুব সুন্দরী?’
‘সুন্দরী তেমন নয় তবে সুশ্রী, ফিগারটা ভালো, ছেলেপুলে হয়নি তো।’
বন্ধ গেট পিছনে রেখে নগেন্দ্র রাস্তা পার হয়ে রমেনের দোকানে এলেন। অরুণোদয়ের সীমানা ও পাঁচিল ঘেঁষে দোকানটা নস্করদের জমিতেই। দোকানের অন্য পাশে দোতলা বাড়ি উকিল মিহির ঘোষের। লোকটি মারা গেছে। তার ছেলে টিভি সেট, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদির দোকান দিয়েছে তারাতলায় ডায়মন্ডহারবার রোডে। দুটি সুদৃশ্য বাড়ির মাঝখানে এমন একটা দোকান সত্যিই বেমানান, নগেন্দ্র তা এখন মনে মনে স্বীকার করলেন। কয়েকটা তিন কাঠার প্লটে এখনও বাড়ি ওঠেনি। শুনেছেন জমির দর এখন নাকি কাঠাপিছু দেড় লাখ টাকা। আরও নাকি বাড়বে। পঞ্চাশ বিঘা বিক্রি করে যা পেয়েছেন তাতে তিনি এখন ‘রাজা গার্ডেনে’ এক কাঠা জমিও কিনতে পারবেন না। নামটা কে দিয়েছে, দেবেন না মিহির? যেই দিক নামটা রাজা নামের উপযুক্তই হয়ে উঠেছে।
দোকানের ভিতরে টেবলে বসে একটি লোক ঘুগনি খাচ্ছে। বাচ্চচা ছেলেটা চা ভরতি কেটলি আর হাতের আঙুলে কাপ ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল কাছেই মোজাইক টালি তৈরির কারখানার উদ্দেশ্যে। রমেন চা খাচ্ছিল গেলাসে, লম্বা একটা চুমুক দিয়ে তলানিটা রাস্তায় ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘আসুন মেসোমশাই এই একটু আগেই সুজির বিস্কুট দিয়ে গেল, আজকের তৈরি, টাটকা।’
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই রমেন প্লাস্টিকের জারটা নামিয়ে ঢাকনা খুলল, ‘ক-টা দোব?’
‘আগে একটা খেয়ে দেখি।’
রমেন একটু পুরু অমসৃণ সাবানের আকারের একটা বিস্কুট নগেন্দ্রর হাতে দিল। তিনি কামড় দিয়েই বুঝলেন রমেনের কথাই ঠিক। শক্ত মচমচে, জিভে জড়াচ্ছে না।
উৎকট শব্দ তুলে একটা মোটর বাইক দোকানের সামনে দিয়ে পূর্ণ সরকার রোডের দিকে চলে গেল। নগেন্দ্র বিরক্ত চোখে মুখ ঘুরিয়ে একবার দেখলেন। বাইক চালকের লাল-কালো ডোরাকাটা জামার পিঠ আর মাথায় কাপড়ের হলুদ ক্যাপটা দেখে বললেন, ‘কী বিশ্রী আওয়াজ করে যে যায়!’
