নগেন্দ্রর ক্রোধ আরও বেড়ে যায় যখন গাছ কাটতে আসা এক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানতে পারেন এখানে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিঘা পনেরো দিন আগে বিক্রি হওয়া জমিতে সে গাছ কেটেছে। নগেন্দ্রর এবারের রাগটায় প্রচণ্ড ঘৃণা মিশে গেল এবং সেটা পুষে রাখলেন দেবেন নস্করের জন্য।
টাকা দেবার জন্য দেবেনের সঙ্গে এসেছিল এক উকিল, মিহির ঘোষ। ইউনাইটেড ডেভেলপমেন্টের আইন বিভাগে কাজ করে। জমিটা আসলে বেনামিতে কিনছে এরা দু-জন, ইউনাইটেড নয়। দেবেন হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘মাড়োয়ারির অনেক সেবা করেছি, অনেক টাকা লাভ করিয়ে দিয়েছি। আমি আর মিহিরবাবু তাই ঠিক করলুম এবার নিজেরাই ব্যবসায় নামব মেড়োকে কাঁচকলা দেখিয়ে।’ দেবেন গলা খুলে হেসে উঠেছিল। নগেন্দ্র চমকে ওঠেন, গলাটা ভীষণভাবে পুরুষের মতো।
তিন
নগেন্দ্র গেট খুলে বেরিয়ে এসে গেট বন্ধ করলেন। রোজ বিকেলে তিনি ঘণ্টাখানেক হাঁটেন। চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হলে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলেন। আজ দুপুর থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। গেঞ্জির ওপর সোয়েটার তার উপর পাঞ্জাবি তার উপর জড়িয়েছেন আলোয়ান। রেবা বলেছিল মাথায় উলের টুপিটা পরতে। ওটা পরলে বুড়ো-বুড়ো দেখায়। পঁচাত্তর পেরিয়ে ছিয়াত্তর হল এখনও চান ছোকরা থাকতে। নগেন্দ্র নিজের এই দুর্বলতাটা বোঝেন, মাঝে মাঝে ভাবেন এটা কাটিয়ে ওঠা দরকার। একদা ব্যায়াম করা শরীরটাকে একটু কুঁজো করে, পদক্ষেপ ছোটো করে কয়েকদিন হাঁটেন, তার পর ভুলে যান। আবার মেরুদণ্ড খাড়া হয়ে যায়, বিয়াল্লিশ ইঞ্চি ছাতিটা সামনে ঠেলে ওঠে, পদক্ষেপের মাপ বেড়ে যায়।
রাস্তাটা চওড়া তিরিশ ফুট। মাঝের ষোলো ফুট পিচের। তার দু-ধারে মাটির তারপর খোলা ড্রেন। প্রত্যেক বাড়ির গেটের সামনে ড্রেনের উপর কংক্রিটের চৌকো খণ্ড বসানো। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপরে রমেনের দোকানের দিকে তাকালেন নগেন্দ্র। একতলা পাকাঘর। সামনে ছোটো একটা চৌকিতে বসে পান সেজে বিক্রি করে রমেন, সবাই ডাকে রমু কিন্তু নগেন্দ্র বলেন রমেন। পানের নানান মশলা, জর্দার কৌটো, সুপুরি খয়েরগোলা, চুনের বাটি ইত্যাদি সাজানো। চৌকিতে একটা কাচের বাক্স তার দুটো তলা। একতলায় থাকে ভিজে কাপড়ে ঢাকা গোটা পান। দোতলায় দেশলাই, মোমবাতি, সিগারেটের প্যাকেট, অ্যাসপিরিন, জেলুসিল ইত্যাদি। বাক্সের উপর বসানো তিনটি বড়ো স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বোয়েমে চকোলেট, টফি, চিউইংগাম, লজেন্স আর কাগজে মোড়া কেক। চৌকির পাশে থাক দিয়ে বসানো তিনটে সফট ড্রিঙ্কসের ক্রেট। দড়িতে চাঁদমালার মতো ঝুলছে পানপরাগের পাউচ, একটা নাইলনের ঝুড়ি তার মধ্যে নুডলসের পাউচ। চৌকির ধার দিয়ে সরু একটা ফাঁকা জায়গা পথের মতো তার পরে একটা কয়লার উনুন। ওই ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে ভিতরে যেতে হয়, সেখানে তিনটি কাঠের টেবল। সিমেন্টের একটা রকের একধারে উনুনটা তৈরি করা। রকের উপর তারের ঝুড়িতে ডিম, ডেকচিতে ঘুগনি, পাউরুটি, কাপ, গেলাস, মাটির ভাঁড়।
দোকানের সামনে একটা বেঞ্চ, বাইরে যারা চা খেতে চায় তারা বেঞ্চে বসে খায়। শীতের দুপুরে রমেন লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বেঞ্চে চিৎ হয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ে। নগেন্দ্র বারান্দা থেকে দেখে একদিন রেবাকে বলেছিলেন, ‘ছেলেটার স্বাস্থ্যটা ভালো, গেঞ্জিটা পরলে ওকে মানায়, আমিও একসময় স্যান্ডো গেঞ্জি পরতাম।’
রেবা উঠে গিয়ে বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রমেনকে দেখে এসে বলল, ‘ওই বগলকাটা গেঞ্জিকে স্যান্ডো গেঞ্জি বলে?’
‘হ্যাঁ, স্যান্ডো সাহেব খুব নামকরা বডি বিল্ডার ছিলেন, বোধ হয় হাঙ্গেরিয়ান, ওইরকম গেঞ্জি পরতেন বলে ওর নামেই এটা চলেছে। ছেলেটার মাসল দেখে মনে হয় একসারসাইজ করত।’
‘শুনেছি গুন্ডামি ছিনতাই করত, কেষ্ট না বিষ্টু কার দলে যেন ছিল। তারপর ওই অরুণ নস্কর ওকে এনে দোকানে বসায়। আসলে ও নাকি নস্করের বডি গার্ড, বাড়ির দরজায় দোকানদার সেজে নজর রাখে।
নগেন্দ্র অবাক হয়ে বলেন, ‘কার বডিগার্ড, অরুণের?’
‘হ্যাঁ। অরুণ শুনেছি একসময় খুনটুন করেছে, এখন নাকি একটা তোলাবাজ গুন্ডাদের দল চালায়, লোকটা যেকোনো সময় খুন হতে পারে। আপনি দেখেননি রমুর চায়ের দোকানে মাঝে মাঝে কারা ঢোকে? চেহারা দেখলেই বোঝা যায় অ্যান্টিসোশ্যাল। আচ্ছা আপনার কি একবারও মনে হয়নি এখানে এত সুন্দর সুন্দর বাড়ির আর সাজানো ঝকঝকে দোকানের মাঝে অমন কুচ্ছিত একটা চা-ওমলেট আর পান বিড়ির দোকান হল কেন?’
‘কিন্তু দোকানটা তো বেশ চলে। অনেক দরকারি জিনিস তো পাওয়া যায়। এই তো সেদিন হঠাৎ লোডশেডিং হতেই বাড়িতে মোমবাতি মোমবাতি করে খোঁজাখুজি শুরু হল, পাওয়া গেল না, শেষে রমেনের দোকান থেকে কিনে আনা হল। পান ফুরিয়ে গেলে তুমিই তো ওর দোকান থেকে পান কিনে আনিয়েছ। আমি তো ঘড়ির ব্যাটারি কিনলুম ওর কাছ থেকেই। দেখলুম সুজির বিস্কুট রয়েছে দুটো কিনে খেয়ে নিলুম। কুচ্ছিত ঠিকই তবে দরকারিও। আচ্ছা বউমা এসব কথা তুমি শুনলে কার কাছে?’
রেবা সামনের চারতলা বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে গলা নামিয়ে বলে, ‘তিনতলার সামনের ফ্ল্যাটের কল্যাণী আমাকে বলেছে। অরুণ নস্কর সোনা স্মাগেল করে, ওর ফ্ল্যাটে কিলো কিলো সোনা আর লাখ লাখ টাকার নোটের বান্ডিল লুকোনো আছে। সিঁড়িতে কোলাপসিবল গেট চব্বিশ ঘণ্টা তালা দেওয়া থাকে, একটা ডোবারম্যান কুকুর সিঁড়িতে বাঁধা থাকে। দেখেছেন তো চারতলার বারান্দা গ্রিল দিয়ে ঘেরা। ফ্ল্যাটটা একেবারে দুর্গ বানিয়ে রেখেছে, কেন?’
